১৭ আগস্ট ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিমত ॥ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রকাশ করুন

  • মোঃ বদিউল আলম সরকার

মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর তা স্থগিত করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টে মনে হয় বিষয়টি এখানেই শেষ। কিন্তু এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া স্থগিত হওয়ার পর একদল ছাত্র কোটা প্রথা বাতিলের আন্দোলন শুরু করে। আমি নিজেও কোটা প্রথাবিরোধী। কিন্তু ঢালাওভাবে কোটা প্রথা বাতিল কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে আন্দোলনকারীদের প্রধান টার্গেট ছিল মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল। কিন্তু কেন? এই আন্দোলনের প্রায় মাসখানেক আগে একটি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন প্রশ্ন তুলে ছিল মুক্তিযোদ্ধারা আর কত সুযোগ সুবিধা চায়। এর মাস দুই আগে বীর মুক্তিযোদ্ধা বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তমও একই পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন লিখেছিলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের ৫০ হাজার টাকা মাসিক ভাতা দিলেও কম দেয়া হবে। কারণ মুক্তিযোদ্ধারা ভাতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেনি। ছেলেমেয়েদের শিক্ষা চাকরির সুযোগের জন্য নয়। তারা জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছে দেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তির জন্য হানাদারদের হাত থেকে দেশের প্রতি ইঞ্চি ভূমি উদ্ধার করার জন্য। সে দিন তার কোন লোভ ছিল না। প্রাপ্তির প্রত্যাশা ছিল না। সর্বোপরি বেঁচে-গাজী হয়ে পিতা-মাতার কোলে ফিরে আসতে পারবে তারই কোন নিশ্চয়তা ছিল না। আজ অনেকেই বড় বড় কথা বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের কটাক্ষ করে উদ্ভট মন্তব্য করেন। সেই মুক্তিযোদ্ধারা জীবিত অবস্থায় দেখলেন তাদেরও ভবিষ্যত প্রজন্ম তাদের সম্পর্কে কি ধারণা পোষণ করলেন। শিক্ষার্থীরা কেন মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে অশালীন মন্তব্য করলেন তা চুলচেরা বিশ্লেষণ করা দরকার। সংস্থাপন বিভাগ বার বার পরিষ্কার করেছে যে, কোন কোটার যদি যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না যায় তবে সাধারণ প্রতিযোগীদের থেকে ওই সব কোটা পূরণ করা হবে। তাছাড়া সরকারও বেশ কয়েক বছর ধরে কোটা প্রথা সংস্কারের কথা বলে আসছিল। যে কারণে সংস্থাপন সচিবালয় থেকে বার বার বলা হচ্ছিল, অনেক কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় আমরা সাধারণ প্রতিযোগীদের থেকে ওই সব শূন্য স্থান পূরণ করে নিচ্ছি।

আমরা কুমিল্লা সাংবাদিক ফোরাম ঢাকা, বিভাগ বাস্তবায়ন পরিষদ, যুব কল্যাণ সমিতির বিভিন্ন সভায় পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল, রেলমন্ত্রী মজিবুল হক এর কাছে কোটা প্রথা সরলীকরণের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। এই দুই প্রভাবশালী মন্ত্রী বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদ সভায় উত্থাপনের আশ্বাস দিয়েছিলেন। সরকার ইচ্ছা করলেই হুট করে কোন বিষয় আলোচনা আনতে পারে না। এ জন্য দীর্ঘ মেয়াদী প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। আর এ সুযোগ কোটাবিরোধী আন্দোলনের নামে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে তারাও বিব্রত হয়েছেন। দেশের মুক্তিযোদ্ধারাও অবাক হয়েছে। আসলে এ ঘটনার আগের ঘটনাটি বিচার বিশ্লেষণ করে দেখা যায় পত্রিকায় বিরূপ মন্তব্য কলাম লিখে একজন প্রতিবেদক মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াটিকে বিতর্কিত করতে সমর্থ হয়েছিল। যার ফলে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়টি মন্ত্রী মহোদয় কোন পূর্বাপর বিচার-বিবেচনা করেই প্রক্রিয়া স্থগিত করে। এতে সরকার নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে আর কিছু ছাত্রছাত্রীর নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিকে সরকার মোকাবেলা করতে বাধ্য হয়। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নিজেও সংসদে কোটা প্রথা বাতিলের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন। অপরদিকে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী মহোদয় বুঝতেই পারলেন না এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া স্থগিত করে তিনি কতটা দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছেন। জানা যায়, সাবেক একজন আইনমন্ত্রী ও সুপ্রিম কোটের একজন ডেপুটি এ্যাটর্নি জেনারেলসহ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারগণ, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা নেতৃবৃন্দ, সংসদ সদস্যর উপস্থিতিতে যাচাই-বাছাই অনুষ্ঠিত হয়। জনতা এক বাক্যে যার নামে সাক্ষ্য প্রদান করেছে তাকেই বাছাইয়ে নির্বাচিত করেছে।

আমি মেজর জেনারেল সুবিদ আলী ভূইয়ার ‘মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস’ বইটি অনুলিখন করতে গিয়ে দেখেছি যে তিনি দশ বছরের এক বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে সিলেট অঞ্চলে পাকহানাদার ক্যাম্পে রেকি করতে গিয়েছিলেন। যখন শত্রুপক্ষের নজরে পড়লেন তখন ওই ছেলেটিকে কোন মতে তাকে সেখান থেকে বের করে এনেছিল। মুক্তিযুদ্ধের পর জেনারেল ভূঁইয়া সার্টিফিকেট দেয়ার জন্য আর ছেলেটিকে পাননি। এমন হাজারও ঘটনার মধ্যে দিয়েই বহু মুক্তিযোদ্ধা হারিয়ে গেছে। তারাই আজ স্বীকৃতি চায় মুক্তিযোদ্ধার।

অতীতে জিয়াউর রহমান ২০ হাজার মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়েছে, এরশাদের আমলে দলীয়ভাবে ৪০ হাজার, এরপর বিএনপি, আহাদ চৌধুরীর উদ্যোগে অনেকে তালিকাভুক্ত হন। এবার মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী দল আওয়ামী লীগ উদ্যোগ নিয়েছে। এবার অন্তত সত্যিকার কিছু মুক্তিযোদ্ধা তাদের স্বীকৃতি পাবে এমন আশাবাদী ছিলাম। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী গেজেট প্রক্রিয়া স্থগিত করেছেন। এখন উপজেলা পর্যায়ে কয়েক দফা প্রক্রিয়ার মধ্য টিকে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেট বাস্তবায়ন দীর্ঘ দিনের প্রক্রিয়ার অবসান চায় মুক্তিযোদ্ধারা।

আমরা জানি, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কোন প্রকার আপোস করবেন না। সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন এই সরকারের দ্বারাই করা সম্ভব। প্রয়োজনে উপজেলা থেকে কোন মুক্তিযোদ্ধাকে কিভাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে তার একটা ব্যাখ্যা দেয়া হতে পারে।

বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধচলাকালীন সময়ে কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিদেরকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। এলাকার প্রবীণ নাগরিকও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করতে পারেন। এসব দিক বিবেচনা করে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয় তালিকাভুক্ত ২৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধার নামে গেজেট নোটিফিকেশন করে মুক্তিযোদ্ধার অবস্থাকে আরও সুদূর করবেন আশা করছি। অন্যথায় অপশক্তি নানা সুযোগ খুঁজবে।