২২ জুন ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সমাজ ভাবান - বিষয় ॥ টাইগারদের ছন্দপতন

খেলায় হারজিত ॥ দেওয়ান সামছুর রহমান

দুনিয়ার নিয়মেই চিরদিন কারো সমান যায় না। ভালোয় মন্দে, হাসি কান্নায়, সুখে দুখে, উত্থান পতনে, হারজিতের মাধ্যমেই জীবনকে টেনে নিতে হয়। খেলাধুলার জীবনও এর বাইরের কিছু নয়। আর ক্রিকেটতো এক গৌরবময় অনিশ্চিয়তার খেলা। এখানে অকল্পনীয়, অসম্ভব অনেক কিছু থাকতেই পারে। টাইগারদের বর্তমান যে ইমেজ, ধারাবাহিক যে সাফল্য তাতে আফগানিস্তানের সাথে হোয়াইট ওয়াশ হয়তো প্রত্যাশিত ছিল না। তবে এ সিরিজে বাংলাদেশের কিছুটা পুরনো চেহারা ফিরে এসেছিল। একটা সময় যেমন বাংলাদেশ খেলার আগেই হেরে যেত, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকতো, এ সিরিজে বাংলাদেশ আফগানিস্তান ভীতি নিয়েই সম্ভবত সেখানে গিয়েছিল।

যেহেতু টি টুয়েন্টি র‌্যাংকিং তাদের থেকে পিছিয়ে, পাশাপাশি খেলা তাদেও পছন্দের মাটিতে আর মিডিয়া কিংবা সমালোচকরাও কিছু আশংকার বাণী শোনাচ্ছিল; ফলে সব মিলিয়ে বাংলাদেশ অনেকটা মানসিকভাবে পিছিয়ে ছিল। তারপরও রাতের শেষে দিন, অন্ধকারের পরে আলো ফুটবেই।

সেই গানের ভাষায় কথা বললে- ‘হারজিৎ চিরদিন থাকবেই, তবুও এগিয়ে যেতে হবে, বাধা বিঘœ না পেরিয়ে বড় হয়েছে কে কবে?’ ক্রিকেটে তালি যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে গালিও। ভালো খেললে, দল বিজয়ী হলে সকলেই হাত তালি দেবে, বাহবা দিবে। খারাপ করলে সমালোচনার ঝড় উঠবে এটাই স্বাভাবিক। দেশের ভালোর জন্য, দলের ভালোর জন্য সমালোচনা হওয়া উচিৎ গঠনমূলক। এ দেশের ক্রিকেট পাগল জনগণ সব সময়ই চাইবে দেশ ভালো করুক, ভালো খেলুক সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাশরাফিরা।

ভাগ্য সব সময়ই সুপ্রসন্ন হয় না। আমরা আছি সব সময় ক্রিকেটের পাশে, ক্রিকেটারদের পাশে। এমন অবস্থা সব সময় থাকবে না। অবশ্যই অতিক্রান্ত হবে এ সময়। বাংলাদেশের ক্রিকেটেও সুদিন আসবে। আমাদের কেবল ধৈর্য ধারণ করে সঠিক পথে এগিয়ে যেতে হবে। একদিন বাংলাদেশও বিশ^ ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ান হবে। আমরা সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় থাকলাম।

সোনারগাঁ, নারায়ণগঞ্জ থেকে

.

ছন্দপতন অস্বাভাবিক নয় ॥ এম. এইচ. রহমান

ছন্দে থাকা এবং মাঝে মধ্যে তার পতনটাও স্বাভাবিক। বাস্তবতা হলো আমাদের ক্রিকেট দল বহুবার বিভিন্ন শক্তিশালী দলকে পরাজিত করেছে এবং আমরা আনন্দে ভেসেছি, প্রশংসা করেছি, বাহবা দিয়েছি, কখনও কখনও আসমানে তুলতেও দ্বিধা করিনি। আমরা যখন শক্তিশালী দলকে হারিয়েছি এবং তারা আমাদের কাছে বাজেভাবে সিরিজ হেরেছে, তখন ঐসব দেশের মানুষও তাদের ক্রিকেট সম্পর্কে, বোধ করি, এমনটাই ভেবেছে। অন্যদের ছন্দপতন হয়েছে বলে আমাদের আনন্দের উপলক্ষ তৈরি হয়েছে। আজ বিশ^ ক্রিকেটে আমাদের যে অবস্থান তৈরি হয়েছে তা রাতারাতি হয়নি। এক্ষেত্রে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে।

আমরা এখনও স্বাগতিক হয়ে যত ভাল খেলতে পারি, সফরকারী হয়ে তা পারছি না। দেশে আমরা যে ছন্দে খেলি, বিদেশের মাটিতে সেই ছন্দে খেলতে এখনও কী আমরা শিখেছি? সাম্প্রতিক সময়ে অষ্ট্রেলিয়ার মতো ক্রিকেট পরাশক্তিকেও আমরা ছন্দ হারিয়ে বল টেম্পারিংয়ের আশ্রয় নিতে দেখেছি, জন্ম হয়েছে ক্রিকেটাঙ্গনে মহাকেলেঙ্কারী। মুলতান টেস্টে আমাদের হারাতে পাকিস্তানকে দেখেছি ছন্দ ঠিক রাখতে কত কি-ই না তারা করেছে। ছন্দপতন এবং পতন থেকে বাঁচবার এরকম শত উদাহরণ দেয়াটাও কঠিন কোন বিষয় নয়। সদ্য সমাপ্ত আফগানিস্তানের সঙ্গে দেরাদূন টি-২০ সিরিজ হারটাকে আমি বাংলাদেশ দলের ছন্দপতন হিসেবে দেখতে চাই না, বরং ক্রিকেটের স্বাভবিক গতি হিসেবেই মূল্যায়ন করতে চাই। আমি মনে করি, এ ফরম্যাটের খেলায় আমরা এখনও ছন্দেই আসতে পারিনি, সেখানে পতনের প্রশ্নই ওঠে না। আর এখানে আমাদের একটা দুর্বলতা রয়েছে। নতুন নতুন খেলোয়াড় তৈরি করে এবং বেশি বেশি এ ধরনের সিরিজ খেলে আমাদের দুর্বলতা কাটানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। হারলেই অস্বাভাবিক সমালোচনা নয়, বরং উৎসাহ দেয়াটাই কাম্য। এতে পুরো দলকে ঢেলে সাজাবার দরকার নেই এবং প্রত্যেক খেলোয়াড়কে ধারাবাহিকভাবে দলে রেখে খেলার সুযোগ দেয়া উচিত। অযাচিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা দলের ভারসাম্য নষ্ট করে ও মনোবল ভেঙে দেয়। শুধুমাত্র জয়েই পাশে না থেকে পরাজয়ও মেনে নেয়া এবং তা থেকে উত্তরণের পথ দেখানো বুদ্ধিমানের কাজ।

তাড়াশ, সিরাজগঞ্জ থেকে

.

হতাশ হওয়া চলবে না ॥ গোপাল নাথ বাবুল

বেশ কয়েক বছর আগে এক লেখায় কলামিস্ট আমাদের ক্রিকেটকে চলচ্চিত্রের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। আমাদের চলচ্চিত্রের যেমন অভিনয় ভাল হলে গল্প ভাল হয় না, গল্প ভাল হলে নায়ক-নায়িকা ভাল হয় না। ঠিক তেমনি ক্রিকেটের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। ব্যাটিং ভাল হলে বোলিং ভাল হয় না, বোলিং ভাল হলে ফিল্ডিং ভাল হয় না, ফিল্ডিং ভাল হলে ব্যাটিং ভাল হয় না। স্বার্থপরতা আমাদের চলচ্চিত্রকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে, কিন্তু ক্রিকেটকে এভাবে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাওয়া যাবে না। সুতরাং হতাশ না হয়ে ক্রিকেটের দুর্বল পয়েন্টগুলো চিহ্নিত করতে হবে এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা চালাতে হবে। প্রতিটা খেলোয়াড়ের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে। ভারতের দেরাদুনে সদ্য সমাপ্ত টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট চলাকালে আমাদের প্রতিটি খেলোয়াড়ের আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি ছিল, তা তাদের শারীরিক ভাষার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছিল। দেরাদুনে যাওয়ার আগে থেকে আমাদের পত্র-পত্রিকাগুলো যেভাবে আফগানিস্তান সেরা বলে প্রচার শুরু করেছিল, এরপর আর কোন খেলোয়াড়ের মনমানসিকতা ঠিক থাকতে পারে না। এটাও ভাবতে হবে যে, আমরাও পৃথিবীর সেরা দলগুলোকে বিভিন্ন ফরমেটে গো-হারা হারিয়েছি। এর আগে নিদাহাস ট্রফিতে শ্রীলঙ্কার মতো ক্রিকেট পরাশক্তি ও বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে দর্শক বানিয়ে ভারতের সঙ্গে ফাইনাল খেলেছি। এশিয়া কাপে আমাদের মেয়েরা ফাইনালে উঠে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। টি-টোয়েন্টিতে ৩০০ উইকেট লাভ করে মাইলফলক ছোঁয়া সাকিবসহ তামিম ইকবাল, মাহমুদুল্লাহ, মুশফিকুর রহমানের মতো ব্যাটিং জিনিয়াস ও মুস্তাফিজের মতো কাটার মাস্টার আছে। পৃথিবীর প্রত্যেক বস্তুর ছন্দপতন ঘটে। কয়েকদিন আগে ‘এ্যানিমেল প্লানেট’ চ্যানেলে দেখলাম, তিনটা সিংহকে তাড়িয়ে ৫/৬টা হায়েনা খাবার কেড়ে নিল। একেবারে অবিশ্বাস্য ঘটনা। যা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। বাংলাদেশ ক্রিকেটও পৃথিবীর একটা অংশ। ছন্দপতন হতে পারে। টিম জিতলে মাথায় তুলে নাচব, হারলে মাথা থেকে একেবারে ডাস্টবিনে ফেলে দেব, এ মনমানসিকতা আমাদের ত্যাগ করতে হবে। আফগানিস্তানের কাছে হোয়াটওয়াশ হওয়ার জন্য বিসিবিরও দুর্বলতা আছে। বিসিবি অনেক সময় পরিকল্পনা না করে দৌড়ায়। ১৯৯৯ এর বিশ্বকাপ ক্রিকেটের বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের অধিনায়ক ও দেশের পক্ষে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান আমিনুল ইসলাম বুলবুল আফগানিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশ টিমের ব্যর্থতা সম্পর্কে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন। দেরাদুনের এ সিরিজটি ওয়ান-ডে ফরমেটে হবে নাকি টি-টোয়েন্টি ফরমেটে হবে তার সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ছিল আমাদের হাতে। প্রতিপক্ষ সম্পর্কে জেনেও টি-টোয়েন্টি ফরমেট বেছে নেয়ার জন্য তিনি বিসিবির পরিচালনা বিভাগকে দায়ী করেন। তিনি ঘুণেধরা ঘরোয়া ক্রিকেট, সিনিয়র-জুনিয়রের মধ্যে অনেক পার্থক্য, সংস্করণটা ঠিক ছিল কিনা, হোমওয়ার্ক ঠিক ছিল কিনা, দেশের ক্রিকেট সংস্কৃতি কীভাবে হারিয়ে যাচ্ছে এবং বিসিবির পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এ বিশ্লেষণে তিনি যেভাবে বর্তমান ক্রিকেট সমস্যার সমাধানের কথা উল্লেখ করেছেন, সেভাবে এগিয়ে গেলে মনে হয় আমাদের ক্রিকেটের অনেক উপকার হবে এবং আমরা আমাদের জায়গাটি বেছে নিতে পারব। তাছাড়া আমাদের নতুন কোচ হিসেবে স্টিভ রোডসকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ইংল্যান্ড জাতীয় দলের সাবেক এ উইকেটরক্ষক কোচ হিসেবে ইংলিশ কাউন্টি দল উস্টারশায়ারকে ২০১৭ সালে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপের ডিভিশন ওয়ানে উন্নীত করেন।

দোহাজারী, চট্টগ্রাম থেকে

.

খেলার মান উন্নয়ন ॥ সাদিক-উর-রহিম

আফগানিস্তানের বিপক্ষে সর্বশেষ টি-টোয়েন্টি সিরিজে তিন-শূন্যতে হেরেছে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। পর পর চারটি ম্যাচ (প্রস্তুতি ম্যাচসহ) জয়ের মাধ্যমে আফগানিস্তান দেখিয়ে দিয়েছে নবীন হিসেবে টি-টোয়েন্টি তারা বাংলাদেশের চেয়ে ভালো বোঝে। তাছাড়া অনুরোধের ঢেঁকি গিলতে গিয়ে ফরম্যাট পরিবর্তন করে খেলাটাও একটা বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের হারের ধরন ভাল ছিল না। খেলোয়াড়দের টেকনিক্যাল অনেক ক্রটি দৃষ্টিকটু লেগেছে। খেলা দেখে ক্রিকেটারদের একতাবদ্ধ মনে হয়নি। বিপিএলে ভাল পারফর্ম করা ক্রিকেটাররা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভাল করার জন্য প্রস্তুত নয় বলেই মনে হয়। এজন্য সিনিয়রদের দায়িত্ব নিয়ে জুনিয়রদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে সুযোগ করে দেওয়া উচিত। আফগানিস্তানের তরুণরা যেভাবে দলকে এগিয়ে নিয়েছে সেটা দেখে বাংলাদেশী তরুণ ক্রিকেটারদের দায়িত্ব নেয়ার কথা মাথায় রাখতে হবে। প্রয়োজনের সময় সাকিব ও অন্য সিনিয়র ক্রিকেটারদের কাছে আরও দায়িত্বশীল আচরণ আশা করি। বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটারদের খেলা দেখে পুরুষ ক্রিকেটারদেরও অনেক কিছুই শেখার আছে। এমন অনেক ক্রিকেটার আছে যারা একাই ম্যাচ বের করে আনতে পারে। ক্রিকেটের উন্নয়নে এসব ক্রিকেটারকে আমাদের প্রমোট করতে হবে। তা করতে হলে বোর্ড ও খেলোয়াড়সহ সংশ্লিষ্ট সবার ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার দিকে গুরুত্বারোপ করা উচিত।

খেলায় হারের পর অজুহাত দেখিয়ে খুব বেশি লাভ হয় না। দল এখন টেস্ট খেলা দলের মর্যাদা রক্ষা করে চলতে পারবে কিনা সেটাই ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রিকেট নিয়ে বাংলাদেশীদের আবেগ অনেক বেশি। টি-টোয়েন্টিতে আমরা হয়তো অনেক বেশি প্রত্যাশা করেছিলাম তামিম-সাকিবদের কাছে। জয় বা হার নিয়ে না ভেবে খেলাটিকে খেলার মতো করেই খেলা দরকার। ভাল খেললে ফল এমনিতেই ফেভারে আসে। খেলাটাকে উপভোগ করার জন্য চেষ্টা করতে হবে। সাকিব আল হাসানদের খেলার চেয়ে অন্যান্য দিকেই মনোযোগ বেশি মনে হয়েছে। অবস্থা দেখে মনে হয় সিরিজ নিয়ে সামগ্রিক পরিকল্পনায় ঘাটতি ছিল। স্ট্রাগল করা আফগানিস্তানের ক্রিকেটাররা সেদিক থেকে অনেক ভাল খেলেছে। আফগানিস্তানের খেলা দেখে মনে হয়েছে অভিজ্ঞতাই সব নয়। খেলায় ভাল করার জন্য অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা দুটিরই প্রয়োজন রয়েছে। আফগানিস্তান দ্রুত উন্নতি করছে।

র‌্যাংকিংয়ে এগিয়ে থাকাটাও আফগানিস্তানকে আত্মবিশ্বাসী হয়ে খেলতে সাহায্য করেছে। তারা টেস্টেও বাংলাদেশকে পেছনে ফেলবে বলে মনে হচ্ছে। আফগানিস্তানের ব্যাটসম্যানদের লড়াকু মানসিকতা দেখে বাংলাদেশের শীর্ষ ব্যাটসম্যানদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। সবগুলো ম্যাচেই বাংলাদেশের রানরেট ছিল অনেক কম। প্রয়োজনীয় সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ শট খেলার জন্য ক্রিকেটারদের মনোবল আরও বাড়ানো দরকার। যারা দীর্ঘদিন ধরে খেলছে তারা দায়িত্ব নিলে কাজটা অনেকটাই সহজ হয়ে যেত।

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল ছয় মাস ধরে কোচবিহীন ছিল। নতুন কোচ স্টিভ রোডসকে তাঁর মতো করেই কাজ করার সুযোগ করে দিতে হবে। আর আমরা প্রত্যাশা করি ক্রিকেটাররাও তাদের নতুন উদ্যমে শুরু করবে এবং অতীতের সাফল্যকে ফিরিয়ে আনবে।

মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ, ঢাকা থেকে

.

ভাগ্যকে দুষব!

অমিত দাস ॥ চরম অনিশ্চয়তা আর চমকে ভরা থাকে এই খেলা ইনিংসের শেষ বলটি পর্যন্ত। ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় না সহজে দুর্ভাগ্যের চোরাবালিতে পা দিয়ে কোন দল যে কখন তলিয়ে যায় ব্যর্থতায় আর দুঃখ নিয়ে মাঠ ছাড়ে। দুঃসময়ে খেলোয়াড়ের সকল ক্রীড়া নৈপুণ্য নিষ্ফল হয় এমন নজিরও আছে ভূরি ভূরি। কখনও কখনও দেশের জয়পরাজয় আমাদের মতো আবেগপ্রবণ দর্শকগণকে আনন্দ-বেদনার বন্যায় ভাসায়, আবার অপরিসীম দুঃখ দিয়ে থাকে। যেমন বাংলাদেশ আফগানিস্তানের সঙ্গে হেরেছে তাই দেশে কোন হইচই নাই, বলা যায় সমগ্র দেশ এক আনন্দালোহীন অন্ধকারে ঢেকে গেছে কারও মুখে কোন কথা নেই। বেদনায় বোবা হয়ে গেছি সবাই। খেলাধুলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিকবিশ্বে বাংলাদেশের যেটুকু খ্যাতি ছড়িয়েছে তা মূলত ক্রিকেটের হাত ধরেই। ক্রিকেট বাংলাদেশে কেবল বাইশগজে বন্দী নয় তা পঞ্চান্নহাজার বর্গমাইলের আমাদের সকল বঙ্গবাসীকে আশ্চর্যরকমভাবে প্রাণের আবেগে বন্দী করে ফেলেছে। তাই ক্রিকেট নিয়ে আছে আমাদের এক অসাধারণ অনুভূতি। আজ ক্রিকেট আমাদের আবেগ আমাদের অস্তিত্ব আমাদের পরিচয়। ক্রিকেটের সঙ্গে আমাদের নাড়ির সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ভাল খেললে আমরা আনন্দে আত্মহারা হই এমনকি হার্টের রোগী ভাল হয়ে যায় আর খারাপ খেললে অনেকে হার্টফেইল করে বা দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। ক্রিকেট আজ বাংলাদেশে এক জাতীয় উন্মাদনার নাম। প্রতিটা টুর্নামেন্ট ও সিরিজকে ঘিরে গোটা জাতির মনেই জয়াশা থাকে প্রবল। দেশের প্রতিটা জয়ে ক্রিকেটভক্ত জনসাধারণ জয়োৎসব পালন করে উৎসবে মাতোয়ারা হয়ে যায়। রং মেখে ঢাক ঢোল বাজিয়ে বিজয় মিছিল নিয়ে রাজপথে বেরিয়ে পড়ে ক্রিকেট পাগল বাঙালী। ক্রিকেটে বাংলাদেশের খেতাব খ্যাতি এদেশের ক্রিকেটমোদী দর্শকের মনে অনেকে আশা জাগিয়েছে কিন্তু ভারতের দেরাদুনে সদ্যসমাপ্ত আফগানিস্তানের সঙ্গে টি-টুয়েন্টি সিরিজে বাংলাদেশের অপরিকল্পিত অগোছালো ধৈর্যহীন বাজে খেলা বদনাম কুড়ানো অকল্পনীয় পরাজয় দেশবাসীকে দারুণভাবে আহত করেছে।

প্রিয় খেলোয়াড়দের নজিরবিহীন ব্যর্থতাকে বিশ্বাস করতে পারছে না কেউ কেননা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ দুটি দেশের অবস্থান এক নয়। এই হারে সারাদেশ হতাশ হয়েছে হতবাক হয়েছে। কেননা টাইগারদের হুঙ্কারে খেলার মুন্সিয়ানায় যেখানে ভারত অষ্ট্রেলিয়া নিউজিল্যান্ড ইংল্যান্ড আফ্রিকা শ্রীলঙ্কা খাবি খায় ধরাশায়ী হয় সেখানে আফগানিস্তানের মতো একটি আন্ডারডগ দল দেরাদুনে দুর্দান্ত খেলে সাকিব তামিমদের মনে ভয় ধরিয়ে দিল তা আমার কাছেও কেমন যেন অবিশ্বাস্য ঠেকছে। নিকট অতীতে বাংলাদেশের ক্রিকেটে আমরা সুবর্ণসময় অতিবাহিত করেছি। আবারও হয়ত আমাদের ক্রিকেটে সুদিন আসবে আমরা বাংলাদেশ বাংলাদেশ বলে আনন্দে গলা ফাটাব নাচব গাইব তবে আমরা দর্শকরা কখনও যেন বিন্দুমাত্র বিবেচনাহীন না হই প্রিয় ক্রিকেটারদের প্রতি এই পরাজয়ে। ক্রিকেটের প্রতি আমাদের ভালবাসাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে আমাদের সর্বাত্মক সমর্থন নিয়ে তাদেরকে সবধরনের উৎসাহ উদ্দীপনা যুগিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। আফগানিস্তানের সঙ্গে সিরিজটা ছিল নিছক একটা দুর্ঘটনা। পচা শামুকে পা কাটার মতো আর কিছু নয়। আবার নতুন করে পুনরুজ্জীবিত হতে হবে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে মনোবল দৃঢ় করতে হবে। দেশের কথাই সবসময় মাথায় রাখতে হবে। আমাদের বড় বড় বিজয়গুলোকে কি আমরা ভুলে যাব না কোনদিন না আমাদের ক্রিকেট ভাবনার আকাশে সেই জয়গুলো নক্ষত্রের মতো জ্বল জ্বল করছে।

চন্দ্রনাথ ডিগ্রী কলেজ, নেত্রকোনা থেকে

.

অর্থই অনর্থের মূল ॥ আবদুল আজিজ

বাংলাদেশীরা আবেগে যেমন কিছু সত্য কথা বলে ফেলে, তেমনি আবেগে কিছু সত্য গোপন করে মিথ্যা কথা বলে। আফগানিস্তান বাংলাদেশকে হারিয়ে যেমন উল্লাস করছে, আমরা অনেকটাই হতাশ এবং বিরক্ত হয়েছি। এই রকম ভাবে বাংলাদেশ উঠতি সময়ে উল্লাস করেছিল এবং শক্তিধর বিপক্ষ দল অধুনা বাংলাদেশ দলকে স্বাগত জানানোর পিছনে হয়তবা ফুঁসেছিল রাগে। খেলায় হারজিত আছে এটা মানি, কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কিছু অসচেতন মনোভাব একেবারে ভুল দিকে হেঁটে যায় যা আমাদের উন্নতি বুঝায় না। কিছুদিন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের মধ্যে যে অগ্রযাত্রার ঢেউ আমরা দেখেছিলাম এখন সেটা কিছুটা ম্লান। প্রতিভার বিকাশ কেবল দলে প্রবেশকে বুঝায় না, প্রতিভাবান খেলোয়াড়কে কিভাবে কখন ব্যবহার করতে হবে এসব ব্যাপার বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে মাথায় রাখতে হবে। হুট করে কোন ডিসিশন নেওয়া ঠিক না। দেশের দলের খারাপ পারফর্ম দেখে দেশের মানুষের মধ্যে ভিন্নদেশীয় পতাকা কেনা ও সমর্থনের হিড়িক পড়ে যেটা কাম্য মনে করি না।

ইদানীং বাংলাদেশের ভাল খেলোয়াড় ভারতের জনপ্রিয় (ওচখ) ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগে খেলছে। ভাল অর্থ পাচ্ছে নাম হচ্ছে কিন্তু কামের কাম বাংলাদেশের কিচ্ছু হচ্ছে না। কিচ্ছু হচ্ছে না বলে যে সেটাকে আমরা স্বাগত জানাইনি তা বললে কিন্তু ভুল হবে। বাংলাদেশেও (ইচখ) বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ সরকার যেভাবে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়েছেন তা কল্পনাতীত।

আজাইপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে

.

২০ ওভারের খেলাতে পিছিয়ে ॥ আজহার মাহমুদ

বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে অন্যতম একটি খেলা হচ্ছে ক্রিকেট। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অসাধারণ কিছু খেলার মাধ্যমে এই স্থানটি বাঙালীর হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাদেশ এখন অন্যতম একটি দেশ। বিশ্বের সকল দল এখন বাংলাদেশের সঙ্গে খেলতে ভেবে চিন্তে খেলে। কারণ বাংলাদেশের খেলার মান বর্তমানে অনেক গুণ বেড়েছে। ২০১৫ সাল থেকে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ ক্রিকেটের যে উন্নতি হয়েছে তা ছিল অবিস্মরণীয়। তবে এই সেরা সময় থেকে হঠাৎ করে ছন্দপতন করেছে বাংলাদেশ দল। বিশেষ করে ২০ ওভারের খেলায় বাংলাদেশ দল দুর্বল। সর্বশেষ আমরা যদি তাকাই তাহলে সম্প্রতি আফগানিস্তানের মতো নতুন একটি দলের সঙ্গে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইট ওয়াশ হওয়ার ম্যাচের দিকেই তাকাতে হবে। এই ফরমেটে সবশেষ নিদাহাস ট্রফিতে ২ ম্যাচ জিতেছে বাংলাদেশ। এর আগে আমরা যদি পরিসংখ্যানে দেখি এই বছরের শুরুতে বাংলাদেশে সফর করে শ্রিলঙ্কা দল। সেখান থেকে সর্বশেষ আফগান সিরিজ পর্যন্ত ১০টি ২০ ওভারের ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। এই ১০টির মধ্যে ২টি ছাড়া বাকি ৮টিতেই হেরেছে বাংলাদেশ। সেই তুলনায় আমার মতে ওডিআই এবং টেস্ট অনেকটাই ভাল পর্যায়ে রয়েছে। যদিও অন্যান্য দলের চাইতে পয়েন্ট তালিকায় নিচে রয়েছে তবুও একদম ছেড়ে দিয়ে খেলে না বাংলাদেশ। কিন্তু ২০ ওভারের খেলায় আসলে বাংলাদেশ যেন ছন্দ হারিয়ে ফেলে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে বাংলাদেশে কোন টিটুয়েন্টি স্পেশালিস্ট নেই। প্রতিটা দেশেই টিটুয়েন্টি খেলার জন্য কয়েকটা ভাল মানের খোলোয়াড় রয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে সেরকম খেলোয়াড় নেই বললেই চলে। তাই এই ফরমেটের জন্য বাংলাদেশের কিছু ভাল খেলোয়াড় তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিটা দেশেই টিটুয়েন্টি খেলার জন্য ভাল কিছু খেলোয়াড় তৈরির উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ফ্রানচাইজিভিত্তিক দলের মাধ্যমে লিগ খেলানো হয়। যেমন বিপিএল, আইপিএল, সিপিএল, বিগব্যাশ, পিএসএল, কাউন্টিসহ আরও অনেক লিগ রয়েছে। এছাড়াও প্রতিটা দেশে আরও কিছু ঘরোয়া লিগের মাধ্যমে তাদের দেশের খেলোয়াড়দের প্রতিভা বের করে জাতীয় দলে দরজায় আনা হয়। কিন্তু সেই তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। বাংলাদেশে বিপিএল হলেও সেখানে দেশী খেলোয়াড়দের তেমন পাত্তাই দেওয়া হয় না। গতবারের বিপিএলে ৫ জন বিদেশী খেলোয়াড়ও খেলিয়েছে তারা। এভাবে হলে তো দেশের খেলোয়াড়দের প্রতিভা দেখার মতো সুযোগ তৈরি হবে না। ৮ দলে ৮ জন দেশী খেলোয়াড় খেলতে পারলে হয়তো আরও একজন ভাল মানের খেলোয়াড় আমাদের চোখে পড়ত। বর্তমানে ক্রিকেট অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলেছে টিটুয়েন্টি খেলা অর্থাৎ ২০ ওভারের খেলা। তাই বাংলাদেশকেও সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই খেলায় বাঘের মতো উপরে উঠতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের এই ফরমেটের খেলাগুলো দেখলে চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কিছুই পারে না বাঙালী সমর্থকরা। তাই এই ফরমেটের জন্য ভাল মানের খেলোয়াড় তৈরি করাটাই মূল কাজ বলে আমি মনে করি।

চট্টগ্রাম থেকে

নির্বাচিত সংবাদ