১৮ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঢাকার দিনরাত - মারুফ রায়হান

ঈদে ঢাকা ফাঁকা হয়ে যায়, ঘুরে বেড়াতে বেশ মজা- এমন কথা বরাবরই আমরা বলে থাকি। কিন্তু ঈদের দিন বিকেলবেলা পঙ্গু হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে শিশু মেলার সামনে দিয়ে রাস্তা পেরুতে গিয়ে দেখি বেজায় ভিড়। একেবারে সেই চিরপুরাতন ঢাকার রূপ! আজ সত্যিই ঈদ তো! রাস্তার উভয় পাশ দিয়ে যানবাহন ছুটেই চলেছে। যদিও শিশুমেলা থেকে যে সড়কটি বাঁ দিকে ঘুরে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের দিকে গেল ওই মোড়টির জেব্রা ক্রসিংয়ের সামনের ফুটপাথে শত শত মানুষ অপেক্ষায়। উল্টোদিকেও একই অবস্থা। অবশ্য উভয় পাশেই বাস-মিনিবাস এসে থামছে এবং যাত্রী ওঠানামা করছে। রাস্তার চলমান গাড়ির বহরের ভেতর দিয়ে শত লোক কিভাবে রাস্তা পেরুবে? এখানে কোনো সিগন্যাল বাতি নেই। একজন ট্রাফিক কর্মকর্তা ও একজন ট্রাফিক পুলিশ বাহিনীর পোশাক পরে দাঁড়িয়ে থাকলেও কর্তব্য পালনের কোন আগ্রহ তাদের ভেতর নেই। শিশুমেলায় আসা শিশু ও তার অভিভাবকদের রাস্তা পেরুতে যে তারা কোন উদ্যোগ নেবেনÑ এমনটা মনে হলো না। অনুরোধ করার পরেও কর্মকর্তা গাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। বললেন, ওই যে শ্যামলীর ফুটওভারব্রিজ দেখা যায়, ওখান থেকে রাস্তা পেরুতে হবে। বলাবাহুল্য ওভারব্রিজটি তিনশ-চারশ গজ দূরে। আর সেখানে যেতে হলেও রাস্তার মানুষজনকে আরেকটি ব্যস্ত সড়ক অর্থাৎ শিশুমেলার উত্তর দিকের দ্বিমুখী যান চলাচলের সড়ক পার হয়ে যেতে হবে। এই পারাপারের জন্য তো কোন ওভারব্রিজ নেই! অবুঝকেও বোঝানো সম্ভব, কিন্তু অবুঝের ভান করে থাকে যে জন তাকে বোঝাবে কে? ঈদের দিন ওই ট্রাফিক পুলিশদ্বয় ওই পয়েন্টে দাঁড়িয়ে আছেন জনতার উপকারার্থে যে নয়, সেটা পরিষ্কার। তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন। তা নিয়ে বিশদ বলার কিছু নেই, সবার ধারণা রয়েছে। যা হোক, এত কথা বলার কারণ একটিই। সেটি হলো ট্রাফিক পুলিশ তার দায়িত্ব কতটুকু ও কিভাবে পালন করছেন সেটি মনিটরিংয়ের জন্য কোন টহল টিম কি থাকতে পারে না? আকস্মিকভাবে তারা টহল দেবেন। প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন। তাহলে যদি পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়।

.

ঈদের আগে-আগে দুঃসংবাদ

ঈদ শুরু হয়েছিল একাধিক দুঃসংবাদের ভেতর দিয়ে। মনের ভেতর বিষণ্ণতা চেপে রেখে ঈদ-উৎসবে যুক্ত হওয়া- এমনটাই ছিল পরিস্থিতি। ঈদের আগে দুটো দুঃসংবাদ আমাদের ভারাক্রান্ত করেছিল। আমার কাছে শাহজাহান বাচ্চুর পরিচয় নিখাদ কবিতানুরাগী হিসেবে। জীবনের শেষ কয়টা বছর তিনি অনলাইনে সক্রিয় ছিলেন। ব্লগার হিসেবে তার অনেক ভক্ত ও মিত্র তৈরি হয়েছিল। সেইসঙ্গে তৈরি হয়েছিল শত্রুও। এমন শত্রু যারা মতাদর্শগত বিভেদের জন্য মানবহত্যাতেও পিছপা হয় না। গ্রামে নিভৃত জীবন বেছে নিয়েও তাদের হাত থেকে রক্ষা পেলেন না তিনি। খুব কাছে থেকে আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে তাকে হত্যা করা হলো। আগে মৌলবাদী তথা জঙ্গীরা মুক্তমনা লেখকদের হত্যার জন্য চাপাতি শানাতো, এখন দেখছি পিস্তল ব্যবহার করছে।

জাপান থেকে ঢাকায় এসে শাহজাহান বাচ্চু সিদ্ধান্ত নিলেন প্রকাশনালয় খুলবেন এবং সেখান থেকে প্রকাশ করবেন কেবল কবিতার বই। আমার সৌভাগ্য যে একেবারে সূচনাতেই দেশের যে তিনজন কবির নতুন কবিতার বই প্রকাশে তিনি উদ্যোগী হন তাঁদের ভেতর ছিলাম আমিও। আমি তখন তরুণ, মাত্র একটি কবিতার বই বেরিয়েছে। শাহজাহান বাচ্চুর বিকাশা প্রকাশনী থেকে বেরুলো দ্বিতীয় কাব্য। কবি মিনার মনসুরের স্মৃতিচারণার অংশবিশেষ উদ্ধৃত করছি। তিনি লিখেছেন: “শাহজাহান বাচ্চু আমাদের চমকে দিয়েছিলেন। বলে কী লোকটা! বইয়ের বাজারে ঘোর আকাল, অথচ তিনি নাকি শুধু কবিতার বই প্রকাশ করবেন গাঁটের পয়সা খরচ করে! আমরা মনে মনে হাসলাম। ভাবলাম, অনভিজ্ঞ নতুন প্রকাশক। সদ্য জাপান থেকে ফিরেছেন। ঘোর কেটে যেতে সময় লাগবে না। কিন্তু তিনি তার অঙ্গীকার রক্ষা করেছিলেন।

যে-চারটি কবিতার বই নিয়ে বাচ্চু ভাইয়ের বিশাকা প্রকাশনীর যাত্রা শুরু হয়েছিল- সৌভাগ্যক্রমে তার মধ্যে আমার একটি বইও ছিল। আমার পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ ‘জলের অতিথি’। প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪। বাকি তিনটি কাব্যগ্রন্থের মধ্যে সিকদার আমিনুল হক ও মারুফ রায়হানের বই ছিল। অন্য বইটির কথা মনে পড়ছে না।

বইমেলায় বিশাকা প্রকাশনীর ছোট্ট স্টলটিতে সপরিবারে তিনি এসে বসতেন। চাইতেন আমরাও নিয়মিত আসি। নিয়মিত না হলেও সিকদার ভাই, মারুফ ও আমি যেতাম। আমাদের অনুরোধে শামসুর রাহমান, রুবী রহমানসহ আরও অনেকে গিয়েছেন। কবিদের বেশ ভাল একটা আড্ডা জমে উঠেছিল বিশাকা প্রকাশনীকে ঘিরে। ব্যক্তিগত নানা সমস্যার কারণে পরে সেই সম্পর্ক আমি অব্যাহত রাখতে পারিনি। বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল প্রায়।

ফেসবুকের কল্যাণে আবার যখন যোগাযোগ শুরু হয় তখন আবিষ্কার করি অন্য এক শাহজাহান বাচ্চুকে। বিশেষ করে ধর্মীয় রীতি-নীতি-সংস্কার নিয়ে খোলামেলা কথা বলতেন। কঠোর সমালোচনার পাশাপাশি কখনও কখনও উত্তেজনা-অসহিষ্ণুতাও প্রকাশ পেত তার ভাষায়। আমি দু’একবার আকারে-ইঙ্গিতে তাকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তিনি তাতে আরও ক্ষিপ্ত হয়েছেন। এক সময় আবিষ্কার করলাম, আমার বন্ধু তালিকা থেকে তিনি নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

আমি নিশ্চিত যে কাজী নজরুল ইসলাম ও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ প্রায় শতবর্ষ আগে যা লিখে ও প্রকাশ করে গেছেন আজকের বাংলাদেশে তারা তা পারতেন না। যদি তা করতেন তাদের পরিণতিও ভিন্ন হতো না। প্রশ্ন হলো, লাখ লাখ মানুষ কি তাহলে এই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্যেই জীবন দিয়েছিলেন? উদ্ভট উঠের পিঠে চড়ে কোথায় চলেছি আমরা?’

একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবী সেলিনা পারভীনের সন্তান সুমন জাহিদ নিহত হলেন। রেললাইনের ধারে পাওয়া গেল তাঁর মরদেহ, ধড় থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন ছিল। ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটির সুরকার শহীদ আলতাফ মাহমুদের সন্তান শাওন মাহমুদ ফেসবুকে মর্মস্পর্শী পোস্ট দিলেন। তিনি লিখেছেন : ‘সুমন ভাই কখনও নিজের বাবার নাম বলতেন না। দেখা করেননি কখনও। অত্যাচারী স্বামীকে শহীদ সেলিনা পারভীন ছেড়েছিলেন সুমন ভাই ছোট থাকতেই। প্রকাশনী আর লেখালেখি করে যা আয় হতো তাতেই ছেলেকে নিয়ে জীবন যাপন করতেন। তাই তাঁর কাছে মা ছিল সব। রায়ের বাজার বধ্যভূমি থেকে মাকে শনাক্ত করেছিলেন তিনি। তখন তাঁর বয়স ছিল আট বছর। মা চলে যাওয়ার পর এতিমখানা, মাদ্রাসা আর মামার বাড়ি এসবই ছিল সুমন ভাইয়ের ঠিকানা। ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর জীবনের তাগিদে অটো চালিয়ে পড়া শোনা শেষ করেছিলেন। ছোট খাটো চাকরি করে জীবন চালিয়েছিলেন।

আমাদের মাঝে সবচেয়ে বেশি ঘ্যানঘ্যানানী স্বভাবের ছিলেন তিনি। বিরক্ত করতেন সবসময়। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, শহীদদের নিয়ে, রাজাকার নিয়ে তাঁর কথা শেষ হতো না। যুদ্ধাপরাধী বিচার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন অনেকের চেয়ে বেশি। শহীদ মিনার, বধ্যভূমি অথবা স্মৃতিসৌধে সুমন ভাইকে লাল সবুজ জামায় দেখা যেত। হাতে থাকত বাংলাদেশের পতাকা। মোটরবাইক চালাতেন তিনি। আমাদের কারও বাড়ি যেতে সমস্যা হলে নিজেই নামিয়ে দিয়ে যেতেন। সুমন ভাইয়ের মোটরবাইকের পিছনে শেষ চড়েছি রায়েরবাজার বধ্যভূমি থেকে আমার বাসা পর্যন্ত। রাস্তায় নেমে কোকাকোলা আর প্যাটিস খাইয়েছিলেন। ব্যাগে হাত দিতে দেননি আমাকে।

খেয়ে না খেয়ে কষ্ট করা সময়েও তিনি বেঁচে ছিলেন। চাকরি না থাকার সময়েও তিনি বেঁচে ছিলেন। নীরবে মায়ের জন্য কাজ করবার সময়েও তিনি বেঁচে ছিলেন। একা একা বড় হবার সময়ও বেঁচে ছিলেন। দয়া করে তাঁর মৃত্যুকে পা পিছলে পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা অবসাদগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা বলে প্রচার করা থেকে বিরত থাকুন।’

.

অপারগ হয়ে সাহায্য প্রার্থনা

বৃহস্পতিবার রাতে ছিল শেষ তারাবি। আমাদের পাড়ার মসজিদে পুরো রমজান মাসে তারাবি শেষে মসজিদের সামনে অনেক সাহায্যপ্রার্থী মলিন মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। খতম তারাবির দিন তাদের সংখ্যা কিছুটা কমই মনে হলো। রোজার মধ্যেই এই কলামে লিখেছি যে ঈদকে সামনে রেখে ঢাকায় আসেন নানা পেশার মানুষ। ভিক্ষাবৃত্তিকে যারা পেশা হিসেবে নিয়েছেন তারাও আসেন দলে দলে। সম্ভবত তাদের অনেকেই আর রোজা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন না, পাড়ি জমান নিজ নিজ দেশের বাড়িতে। যাহোক, একটি হাত কিংবা পা নেই অথবা হাত-পা থেকেও নেই, অর্থাৎ কর্মউপযোগী নয় এমন সাহায্যপ্রার্থী খুব বেশি থাকেন না। তাই রাস্তার ওপর কাদামাটি মেখে শুয়ে থাকা এক লোকের দিকে না তাকিয়ে আমাদের উপায় নেই। সবচেয়ে উঁচু তার গলা, সাহায্য প্রার্থনা করতে করতে তিনি কণ্ঠস্বরকে কান্নার ভঙ্গিতে নেওয়ার দক্ষতা অর্জন করেছেন। লোকটির ঠিক পেছনেই বয়স্ক এক ক্ষীণকায়া মহিলা। তিনি বারবার শায়িত লোকটির সামনে চলে আসছিলেন। ফলে কোন কোন সাহায্যদাতা বৃদ্ধাকেই সাহায্য করছিলেন। ব্যাপারটি লক্ষ্য করে শায়িত লোকটি নিচু স্বরে ওই বৃদ্ধাকে বলেন যেন তিনি একটু দূরত্ব বজায় রাখেন। ফলে মসজিদ থেকে বেরিয়ে প্রথমে শায়িত ভিক্ষুকটির কাছেই পৌঁছুবেন নামাজীরা, পরে বৃদ্ধার কাছে।

শুক্রবার জুমাতুল বিদার দিন সকাল সকাল বিশেষ ‘হুইল-চেয়ার-গাড়ি’ নিয়ে বেরিয়ে যান আরেক বৃদ্ধ লোক। যেভাবে ‘আম্মা, মাগো ল্যাংড়া খোড়া মানুষ সাহায্য করেন’ বলে হাঁক পাড়েন তাতে পাড়া-মহল্লার সব মা-জননীর ঘুম টুটে যাওয়ারই কথা। ক্রাচ দুটো তার গাড়ির পেছনে রাখা। বহুতল ভবনের ফ্ল্যাট থেকে নিচে টাকা ফেলে দিলে বিশেষ পারদর্শিতায় তার গাড়ি ঘুরিয়ে টাকাটা ঠিকই সংগ্রহ করে নিতে পারেন।

.

ঈদের দিনে পঙ্গু হাসপাতাল

হাসপাতাল এমনই এক জায়গা যেখানে বিছানা থাকে নীরব ও অপরিবর্তনীয়, আর রোগীদের থাকে আসা-যাওয়া। এবারের ঈদে দেখা গেল একটি বেডও খালি নেই। তবে তিনজন রোগী ঈদ উপলক্ষে হাসপাতালের বাইরে বেড়াতে গেছেন। অনেক রোগীরই ঈদের দিন কাটে স্বজনদের মুখ দেখার আশায়। অথচ তাদের সেই আশা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পূরণ হয় না। সাধারণত অবস্থাসম্পন্ন রোগীরা প্রাইভেট ক্লিনিক বা হাসপাতালেই চিকিৎসা করান। পঙ্গু হাসপাতালে যারা চিকিৎসা নেন তাদের ভেতর যেমন হতদরিদ্র রোগী আছেন, তেমনি আছেন নিম্নবিত্ত বা স্বল্পবিত্ত শ্রেণীর মানুষ। পঙ্গু হাসপাতালের দুস্থ রোগীদের ওয়ার্ডে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটালেও একবারের জন্যেও মনে হবে না যে আজ ঈদের দিন। কোথাও কোন খুশি নেই, নেই নতুন পোশাক পরে রোগীর কোন নিকটজনের আগমন। ব্যতিক্রম শুধু দুপুরের খাবার পরিবেশনে। পোলাও-মুরগির মাংস ও মিষ্টি বিতরণ করা হয়। এখানেও কিছুটা ‘কৃচ্ছ্রতা’ চোখে পড়ে। এবার অবশ্য একটি করে ডিমও সরবরাহ করা হলো। এখানে একজন রোগীর সঙ্গে তার নিকটজনও থাকেন। তাদের সংখ্যা অনেক সময় একাধিকও হয়ে থাকে। তারা অবশ্য ওই খাবার পান না। শুধু রোগীর জন্যই বরাদ্দ হাসপাতালের খাবার। ঈদের দিন প্রতিটি রোগীর পাশাপাশি অন্তত বাড়তি একজনের খাবার সরবরাহ করার ব্যবস্থা নেয়া কি বিরাট কিছু? এটি ¯্রফে সদিচ্ছার প্রশ্ন। ঈদের দিন মেহমানদের জন্য বাসাবাড়িতে বাড়তি খাবার রাখা আমাদের সংস্কৃতিরই অংশ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন।

এখানে বিনামূল্যে চিকিৎসার কথা বলা হয়ে থাকে। প্রকৃতপক্ষে অপারেশনের জন্য ওষুধপত্র ও সরঞ্জাম রোগীদেরই কিনে দেওয়া লাগে। আছে পেয়িং বেড। হাসপাতালে পেয়িং বেডের সংখ্যা প্রায় ত্রিশ থেকে চল্লিশ শতাংশ। সাধারণ ওয়ার্ডের এই পেয়িং বেডের প্রতিদিনের ফি ২৭৫ টাকা। এক রোগীর লোক ঘোরাফেরা করছেন, একটি পেয়িং বেড খালি হয়েছে, রোগীকে সেখানে তুলতে হলে অগ্রিম টাকা দিয়ে বেডে উঠতে হবে। ভদ্রলোক ইতস্তত করছেন। নিচের তলায় রোগীকে শুইয়ে রেখেছেন, কিন্তু ঈদের ছুটিতে কোন ডাক্তারের সাক্ষাত পাননি। তাই টাকা খরচ করে ভর্তি হয়ে কী লাভ! বরং ঈদ যাক, ডাক্তাররা রোগীদের দেখতে আসুক, তারপর নগদ টাকা দিয়ে বেডে ওঠা যাবেÑ এমনই মনোভাব তার।

ইএফ ওয়ার্ডের ৭৫ নম্বর বেডের রোগী জয়নাল মোল্লা বললেন, তার বয়স পঁচাত্তর। ইজি বাইক চালান দেশে। সেদিন ইফতারির সময় হয়ে এসেছে, তিনিও রোজা রেখে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন। ছুটছিলেন ঘরের দিকে। হঠাৎ একটি পিকাপ সামনে থেকে মুখোমুখি তার গাড়িকে ধাক্কা দেয়। গাড়ি কাত হয়ে পড়ে যায়, তার কোমরের হাড় ভেঙে যায়। ইজি বাইকটি ধারকর্জ করে নিজেই কিনেছিলেন। এখন সেটি আর চলাচল-উপযোগী নয়, নিজেও অচল। কিন্তু জীবন কি থেমে থাকে? একমাত্র ছেলে ঘরজামাই থাকে, বাবাকে সাহায্য করে না। জয়নাল মোল্লার স্ত্রী বললেন, তার মেয়েরাই দেখাশোনা করে। সবচেয়ে ছোট মেয়েটির বয়স ষোলো-সতেরো হবে। শিশুকালে একটি পা ভেঙে পচন ধরেছিল বলে হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলা। এখন একটি সরু লম্বা লাঠি নিয়ে চলাফেরা করে। মেয়েটিই নিত্যদিনের খরচ যোগাচ্ছে হাসপাতালের বাইরে গিয়ে মানুষের কাছ থেকে চেয়েচিন্তে এনে। পঙ্গু হাসপাতালে এই পরিবারটির প্রথম আসা। নকল পা লাগালে যে মেয়েটি স্বাভাবিক মানুষের মতো হাঁটতে পারবে, এমন আজব কথা তারা আমার মুখ থেকেই প্রথম শুনলেন আর অবাক হলেন এই হাসপাতালেই সেটি সম্ভব জেনে। বললাম, আপনারা কি চান মেয়ে নকল পা লাগিয়ে সহজভাবে হাঁটুক? তাহলে লোকে কিন্তু আর তাকে ভিক্ষে দেবে না। বাবা-মা দুজনেই হা হা করে উঠলেন। বললেন, আমরা মেয়ের ভাল চাই, আপনি একটু ডাক্তারদের বলে দেন।

দুটো বেড পরেই শুয়ে আছে অল্পবয়সী এক ছেলে। সে এবার এসএসসি পাস করেছে। এ প্লাস পাওয়া মশিউর পরীক্ষা শেষেই ঢাকায় চলে আসে কিছু রোজগারের আশায়। বিমানবন্দরের উল্টোদিকে একটি ভবন নির্মাণের কাজে সে একজন সহকারী হিসেবে নিযুক্ত হয়। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় অসতর্কতাবশত পা পিছলে সে লিফটের জন্য নির্ধারিত ফাঁকা জায়গায় পড়ে যায়। মাথাটা তার বেঁচেছে বলে সে মারা যায়নি, কিন্তু মেরুদ-ের আঘাত গুরুতর। দুটো পা অবশ হয়ে গেছে, আর নাড়াতে পারছে না। ভবনটির মালিক মন্দ লোক নন, হাসপাতালে আসছেন, সাহায্য করছেন। মশিউরের মা অবশ্য বললেন, সেই সাহায্য সামান্যই। তবে অপারেশনের সব খরচ নাকি তিনি দেবেন বলে কথা দিয়েছেন।

হাসপাতালের যে ক’জন রোগীর সঙ্গে কথা বলেছি, প্রত্যেকেই দুস্থ। তাদের আর্থিক সাহায্য দরকার। বিত্তবানরা এগিয়ে না আসলে সুস্থ হয়ে আবার কর্মজীবনে প্রত্যাবর্তন তাদের জন্য বেশ কঠিন।

১৭ জুন ২০১৮

marufraihan71@gmail.com