১৭ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সুমন ভাই, এ কেমন চলে যাওয়া!

  • বোরহান বিশ্বাস

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সুমন ভাইয়ের (সুমন জাহিদ) মৃত্যুর খবরটি প্রকাশের পর কুষ্টিয়া থেকে এক বন্ধু ফোনে আমাকে বিষয়টি জানায়। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।

বিস্তারিত জানতে বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টাল ঘাটা শুরু করলাম। ‘ঢাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে একজনের মৃত্যু’- শিরোনামে দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি জাতীয় দৈনিকের অনলাইন ভার্সনে খবর দেখতে পেলাম। সম্ভবত তখনও উদ্ধার হওয়া লাশের পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। তাই ১৪ জুন (বৃহস্পতিবার) ১টা ২৭ মিনিটে আপডেট করা ওই সংবাদের ভেতরের খবর ছিলÑ ‘রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে এক ব্যক্তি মারা গেছেন। বৃহস্পতিবার সকালে খিলগাঁওয়ের বাগিচা মসজিদ সংলগ্ন রেললাইনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। তবে ওই ব্যক্তির নাম পরিচয় পাওয়া যায়নি।

ঢাকা রেলওয়ে থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইয়াসিন ফারুক বলেন, আজ সকাল সাড়ে নয়টার দিকে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি ট্রেনে কাটা পড়ে অজ্ঞাত পরিচয়ের ওই ব্যক্তি মারা যান। ঘটনাস্থল থেকে রেল পুলিশের সদস্যরা লাশ উদ্ধার করেন। তবে তিনি ট্রেন থেকে পড়ে গেছেন, নাকি রেললাইন পার হওয়ার সময় মারা গেছেন, সেটি এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।’

টেলিভিশন অন করলাম। হঠাৎ একটি টিভি চ্যানেলে চোখ আটকে গেল। চ্যানেলটির ‘সর্বশেষ’ খবরে জানানো হচ্ছে, ‘কমলাপুরে রেল লাইনের পাশ থেকে উদ্ধার হওয়া লাশটি শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের ছেলে সুমন জাহিদের। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাব্যুনালের সাক্ষী ছিলেন।’ এক এক করে বিভিন্ন চ্যানেল ও ওয়েব পোর্টালে সুমন ভাইয়ের নিহত হওয়ার খবর আসতে লাগল।

সুমন ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় একটি সাক্ষাতকারের সূত্র ধরে। ২০১২ সালে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে সাক্ষাতকার নেয়ার জন্য জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শহীন রেজা নূর ভাইয়ের কাছে মিডিয়া সংশ্লিষ্ট কোন শহীদ পরিবারের সন্তানের যোগাযোগ নম্বর চাই। শমী আপা (শমী কায়সার) তখন দেশের বাইরে। শাহীন ভাই আমাকে সুমন ভাইয়ের নম্বরটি দিয়ে বললেন, ও শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের ছেলে। কথা বলে দেখতে পার। সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের ছেলে! ব্যাস, সঙ্গে সঙ্গে ফোন করলাম। সাক্ষাতকার নেয়া হলো। ১৪ ডিসেম্বর ‘মার চোখ দুটো সেই গামছা দিয়ে বাঁধা ছিল’ শিরোনামে দৈনিক সংবাদে এটি প্রকাশিত হলো।

সাক্ষাতকারটির এক জায়গায় সুমন ভাই বলেছিলেন, ‘প্রতি বছরই সরকারের কাছে আমাদের একটি দাবি থাকে। এবারও যুদ্ধাপরাধীদের সেই ঘৃণ্য অপকর্মের বিচার চাইব। আমাদের সময়েই আমরা এই বিচার দেখে যেতে চাই। যাতে পরবর্তী প্রজন্ম যারা আছে যেমনÑ আমার সন্তান যেন জানতে পারে তাদের দাদির হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে।’

পাশাপাশি এলাকায় আমাদের বাসা। প্রায়ই দেখা হতো, কথা হতো। বাসায় যেতে বলতেন। কিন্তু সময়-সুযোগ করে কখনো যাওয়া হয়ে ওঠেনি। মাঝে-মধ্যে অফিসে আসতেন সুমন ভাই। কথা হতো। তার একটি দাবি ছিল, মালিবাগ-মৌচাক-মগবাজার ফ্লাইওভারটি যেন তার শহীদ মায়ের নামানুসারে রাখা হয়। এ জন্য তিনি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রায়ই বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপানোর জন্য চিঠি ধরিয়ে দিতেন। আমি সংশ্লিষ্ট বিভাগে সেগুলো পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করতাম।

এক সময় চ্যানেল নাইনে কাজ করতেন সুমন ভাই। পরে ব্যাংকে যোগ দেন। ব্যাংকার হওয়ার বেশ কিছুদিন পর তার সঙ্গে দেখা হয়। স্মিত হেসে বলেছিলেন, নতুন জীবন শুরু করলাম।

সুমন ভাইয়ের সঙ্গে যতটুকু মেশার সুযোগ হয়েছে তাতে যে বিষয়টি আমাকে আকর্ষণ করেছিল তা হলোÑ তার ইন্ট্রোভার্ট ক্যারেক্টার। নিজেকে একেবারে প্রকাশ করতে চাইতেন না। শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের ছেলে হিসেবে অফিসে যখন তাকে পরিচয় করিয়ে দিতাম সবাই সম্মানে দাঁড়িয়ে যেতেন। আর সুমন ভাইকে দেখতাম বিনয়ের সঙ্গে তাদেরকে বসতে বলতেন।

একবার বাসা থেকে কর্মস্থল পল্টনের দিকে যাচ্ছিলাম। রাস্তায় প্রচ- জ্যাম দেখে হাঁটা শুরু করলাম। হঠাৎ দেখলাম, কে যেন হোন্ডায় বসে ইশারায় ডাকছে। মাথায় হ্যালমেট থাকায় প্রথম অবস্থায় বুঝতে পারছিলাম না। কাছে গিয়ে দেখি সুমন ভাই। অফিসে যাওয়ার তাড়া আছে কিনা জানতে চাইলেন। বললাম, হ্যাঁ। হোন্ডায় উঠে বসতে বললেন। পরে রাস্তার উল্টো পাশ দিয়ে দ্রুত আমাকে দৈনিক বাংলা মোড়ে পৌঁছে দিয়ে নিজের কাজে চলে গেলেন। ধন্যবাদ জানানোর সময়টুকু দিলেন না।

শেষবার সুমন ভাই যখন আমার বর্তমান কর্মস্থলে আসেন, তখন বন্ধু ঝর্ণা মনি ও আমার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা হয়। একসঙ্গে চা খাই আমরা।

আজ একটি কথা বারবার মনে পড়ছে, দেশ মাতৃকার জন্য একাত্তরে শহীদ সেলিনা পারভীন নিজের জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ১৩ ডিসেম্বর। লাশ শনাক্ত হয়েছিল ১৭ ডিসেম্বর। সেই ঘটনার সাক্ষী ছিলেন সুমন ভাই। খুব কাছ থেকে দেখেছেন মাকে চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা।

পরবর্তী সময়ে মায়ের স্মৃতি রক্ষার্থে নানা রকম উদ্যোগ নিয়েছিলেন সুমন ভাই। ’৭১ এ সিদ্ধেশ্বরীর ভয়াবহ ঘটনার পরও স্মৃতি বিজড়িত ওই এলাকার পাশেই তিনি থেকে গেছেন। প্রাণনাশের হুমকি থাকার পরও মনের গভীরে মায়ের স্মৃতি, নিজের শৈশবের স্মৃতি আগলে রাখতেই তিনি হয়তো দীর্ঘদিন সিদ্ধেশ্বরীর অদূরে শাহজাহানপুরে থেকেছেন। অন্য কোথাও শিফ্ট হননি।

প্রথম অবস্থায় খিলগাঁও বাগিচাসংলগ্ন রেললাইনের পাশ থেকে সুমন ভাইয়ের লাশ আবিষ্কার হয় অজ্ঞাত পরিচয়ে (পরে অবশ্য পরিচয় জানা গেছে)। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে তার মা সাংবাদিক সেলিনা পারভীন জীবন দিয়ে গেছেন। সেই স্বাধীন দেশের মাটি আবারও সুমন ভাইয়ের রক্তে রঞ্জিত হলো। তাকে জীবন দিতে হলো।

পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ‘সুমন জাহিদের লাশ উদ্ধারের পর স্বজনরা এটিকে পরিকল্পিত হত্যা বলে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পলাতক দুই যুদ্ধাপরাধী চৌধুরী মঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার পর থেকে তাকে হুমকি দেয়া হচ্ছিল বলে জানান স্বজনরা। পুলিশও বিষয়টি জানত। তাকে নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছিল। পুলিশ তাকে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করার পরামর্শও দিয়েছিল।

কমলাপুর রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইয়াসিন ফারুক বলেন, ঘটনাস্থলের আশপাশের লোকজনের জবানবন্দী নিয়েছেন। কিন্তু এখনই কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চান না। ঘটনার সবদিক তারা খতিয়ে দেখছেন।’

সুমন ভাইয়ের মৃত্যুটি কোনভাবেই স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। শহীদ পরিবারের সন্তানের এমন করুণ মৃত্যু মেনে নেয়া কষ্টের।

লেখক : সাংবাদিক