১৯ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মধ্যাহ্ন, অপরাহ্ণ!

  • আলী যাকের

(পর্ব- ১২)

রাজনীতি বাঙালীর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এর কারণ অন্বেষণে আমি যাব না। একাধিক কারণ থাকতে পারে। তবে মূলত এই যে, রাজনীতি ছাড়া বাঙালী খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অনেকে হয়ত এই বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। কিন্তু কথাটা সত্য। রাজনীতি যে রাজের নীতি, রাজার নীতি কিংবা রাজ্য নিয়ে নীতি হতে হবে এমন শর্ত কেউ দেয়নি। আমাদের এই নাতি বৃহৎ দেশটিতে নানা দিকে চোখ ফেরালেই আমার এই নিবেদন সম্যক বোঝা যাবে। আমি গ্রাম-বাংলা ভালবাসি। অতএব, মাসে দুই মাসে ঢাকা ছেড়ে আমার নিজ গ্রামে কয়েক দিনের জন্য পাড়ি জমাই। এক সময় আমার গ্রামটি একেবারে অজপাড়াগাঁ ছিল। সম্প্রতি রাস্তা ঘাটের উন্নয়ন হওয়ায় চার-সাড়ে চার ঘণ্টায় পৌঁছানো যায়। তবে চরিত্রগতভাবে বাংলাদেশের পাড়াগাঁ বলতে যা বোঝায় আমার গ্রামটি তাই রয়ে গেছে। ওখানে আমাদের জাতীয় রাজনীতি নিয়ে কথা-বার্তা কালে ভদ্রে শোনা যায়। তবে গ্রামের বিষয়াদি নিয়ে ব্যাপক ক্রিয়া, প্রতিক্রিয়া এবং মতবাদ প্রায় জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতির মতোই অস্থির এবং অসহিষ্ণু। এই রাজনীতির বিষয় হিসেবে গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের পরিচালনা পর্ষদ থেকে শুরু করে ইউনিয়ন কাউন্সিলে প্রতিনিধিত্ব কিংবা মেডিক্যাল সেন্টারে ডাক্তার নিয়োগ এসব কিছুই সরবে অবস্থান করে। এই যখন একটি দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি, আমাদের শহরগুলোতে যখন আমরা রাজা-উজির, মন্ত্রী-মিনিস্টার কাউকেই ছাড় দিয়ে কথা বলি না তখন জীবনের সব ক্ষেত্রেই রাজনীতি ব্যাপকভাবে অনুপ্রবেশ করবে এটাই স্বাভাবিক। অতএব, সংস্কৃতির বিষয়টিও এমত রাজনৈতিক চেতনা থেকে বাইরে থাকবে সেটাও আমরা ভাবি কিভাবে? যদি কেউ, কোন সংস্কৃতি কর্মী, এমন ভাবেন যে তিনি কেবল সাংস্কৃতিক কর্মকা- নিয়েই দিন কাটাতে চান তাহলেও উপায় নেই। রাজনীতি কোন না কোনভাবে তাকে স্পর্শ করবে। পাঠক ভুল বুঝবেন না। আমি এ কথা বলতে চাইছি না যে একজন শিক্ষিত মানুষ রাজনীতি সম্বন্ধে একেবারে অসচেতন থাকবেন। অবশ্যই তার রাজনৈতিক একটি মত থাকবে কিন্তু সেই মতটি হবে একেবারে তার নিজস্ব। তাঁর সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে রাজনীতির সরব চর্চা কখনই বাঞ্ছনীয় নয়। ধরা যাক, যুক্তরাজ্যের বিশিষ্ট নাট্য অনসম্বল রয়্যল শেক্সপীয়ার কোম্পানির কথাই। এখানে সংশ্লিষ্ট সকলের অবশ্যই নিজস্ব একটি রাজনৈতিক মতবাদ রয়েছে। তারা নির্বাচনের সময় নিশ্চয় লেবার কিংবা কন্জারভেটিভ পার্টিকে ভোট দিয়ে থাকেন। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক মতবাদটি কখনই তাদের সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে প্রতিফলিত হয় না। হ্যাঁ, তারা মানুষের মৌলিক অধিকার নিয়ে অবশ্যই তাদের কাজের মধ্য দিয়ে চর্চা করেন কিন্তু তা কখনই সরাসরি দলগত রাজনৈতিক মতবাদ হিসেবে দৃশ্যমান হয় না।

এইখানে প্রশ্ন উঠতে পারে যে আমাদের দেশ এবং প্রতীচিও দেশের মধ্যে কতগুলো মৌলিক পার্থক্য রয়ে গেছে। আমাদের জন্মই হয়েছিল রাজনৈতিক সংগ্রামের মাধ্যমে এবং জীবন প্রবাহিত হয় ওই ধরনের সংগ্রামের মধ্য দিয়েই। কথাটি অস্বীকার করার উপায় নেই। আমরা অনেক অগ্রণী দেশ এবং সমাজের থেকে ভিন্ন নানাভাবে। কিন্তু ধরেও যদি নিই যে আমাদের সংগ্রাম আমাদের সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করবে তাহলেও সময়ের আবর্তে সংগ্রাম মুখর প্রতিপাদ্য থেকে বেরিয়ে তো আসতেই হয়? আমরা যদি ভিয়েতনামের দিকে তাকাই তাহলে কি দেখব? তিন চার দশক ধরে উপনিবেশবাদ নিপীড়িত একটি দেশ স্বশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন হয়। এবং সংগ্রাম চলতে থাকার সময়ে শিল্প সংস্কৃতির প্রতিটি বিষয়ে তাদের সংগ্রামী চরিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবুও স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে মুক্ত চিন্তা, মানবিক মূল্যবোধ, প্রেম-ভালবাসা অথবা মানুষের অন্তর্গত দ্রোহ তাদের সংস্কৃতিতে বিশেষ করে নাট্যকলায় স্পষ্ট দৃশ্যমান। একেক সময় মনে হয় যে চিন্তা-ভাবনায় অপরিণত থাকলে তার ছায়া সংস্কৃতিতে পড়ে। আমরা যখনই মনে করি যে আমাদের কাজটি অকিঞ্চিৎকর হয়ে যাচ্ছে, বলা নেই কওয়া নেই বিষয় হিসেবে রাজনীতির ঘাড়ে ভর করি। এটি বড় দুঃখজনক।

এ বিষয়ে আমার একটি ধারণা আছে। অবশ্য এ কথাও বলে রাখি, প্রসঙ্গক্রমে, যে ধারণাটি ভুলও হতে পারে এবং আমার এই ধারণা ভুল হলে আমি অবশ্যই অত্যন্ত আনন্দিত হবো। আমি মনে করি যে আমাদের দেশের তরুণ-তরুণীরা হয়ত ভাবেন ইচ্ছে করলেই অভিনয় করা যায়। অন্য কোন শিল্পকলা সম্বন্ধে এটা তারা ভাবেন না কেননা সেই সব ক্ষেত্রে যথাযথ শিক্ষার মাধ্যমে মেধার বিকাশ ঘটলেই কেবল বুৎপত্তি অর্জন সম্ভব। সঙ্গীতের কথাই ধরা যাক অথবা নৃত্যকলা কিংবা চিত্রকলা। এসব ইচ্ছে করলেই সম্ভব নয়। একজন মানুষকে যথেষ্ট চর্চা করে নিজেকে তৈরি করতে হয়। অথচ অভিনয়, তাদের ধারণা, কি অনায়াসসাধ্য। এই কারনেই নাটকের জগতে একটা বয়সের মানুষ ভিড় করে আসে। এদের অনেকেই পরবর্তীতে আবিষ্কার করে যে অভিনয় বিষয়টিকে যতটা সহজ ভাবা হয়েছিল তা আসলে ততটা সহজ নয়। তখন নানা রকম কল্পনা-পরিকল্পনার হয় শুরু। নাটকে রাজনীতি আসে, বিদ্রোহ আসে, স্ল্যাপস্টিক কমেডি আসে আরও কত কি! অর্থাৎ নাটকের শরীরে অপ্রয়োজনীয় রঙের প্রলেপ দেয়া হয়। এতে করে নাটক তো হয়ই না বরং এই প্রচেষ্টাগুলোর মাধ্যমে চিন্তাশীল দর্শককে দূরে সরিয়ে দেয়া হয়। আমি নাট্যকলার একজন নগণ্য কর্মী হিসেবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি একজন অভিনেতার মোক্ষলাভ হয় তখনই যখন সে রবীন্দ্রনাথ, সফোক্লিস কিংবা শেক্সপীয়ারের নাটক অর্থ বুঝে অবলীলায় আয়ত্ত করতে পারে। কেবল তখনই ঠিক যেমন সঙ্গীতে ধ্রুপদি সঙ্গীত তেমনি নাটকে শিল্পগুণের আকর অবিষ্কার করা সম্ভব। এই কারণে অযাচিতভাবে এবং অপ্রয়োজনে নাটককে কেবল কন্টেম্পোরারাইজ করার জন্য রাজনীতিকে আঁকড়ে না ধরে জীবনের গভীরে প্রবেশ করার চেষ্টা করা দরকার। একটি শিল্পকর্মের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হতে হলে আর কতকাল আপাত রম্যে বিচরণ করব আমরা?