১৭ জুলাই ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সম্প্রীতির বাংলাদেশ

ছেচল্লিশ বছর আগে যে প্রশ্নের মীমাংসা হওয়ার কথা ছিল দেশকে এখনও তার মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে এলে নানাভাবে এর প্রকাশ দেখা যায়। দু’হাজার তেরোয় বাঁশখালীর যে হিন্দু নারী সব হারিয়ে বুক চাপড়িয়েছিলেন কিংবা সাতক্ষীরাসহ আরও পাঁচ জেলার সংখ্যালঘুরা যেভাবে বাস্তুহারা হয়ে অসহায় দীর্ঘশ্বাস চেপে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে ছিলেন তেমনটা হওয়ার কথা ছিল যারা এদেশ চায়নি তাদের। অথচ ঘটছে উল্টো। ভোটের রাজনীতি শুধু শাসক শ্রেণীকেই নয়, ট্র্যাকচ্যুত করেছে রাষ্ট্রকেও। ক্ষমতায় যাওয়ার লোভের সঙ্গে আপোসের পিচ্ছিল পথ শাসকদের ঋজু হয়ে দাঁড়াতে দেয়নি। ছেচল্লিশ বছরের শাসনকালে আপোসের নানা বাঁকের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে নিতে তারা ডারউইনের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠায় যত বেশি মনোযোগ দিয়েছেন তার চেয়ে অনেক কম গুরুত্ব দিয়েছেন দেশের মানুষকে। সেক্যুলার রাষ্ট্রকে ইসলামীকরণে সামরিক বেসামরিক স্বৈরাচারী গণতন্ত্রী সব সরকার সহযোগিতা করেছে আর ধীরে ধীরে রাষ্ট্রে ও সমাজে প্রান্তিক হয়েছেন অন্য ধর্মের মানুষরা। এ রকম একটি প্রেক্ষাপট তৈরি করা থাকলে ধর্মীয় মৌলবাদীদের কাজ অনেক সহজ হয়।

সেই সহজ কাজই স্বচ্ছন্দে করে যাচ্ছে তারা। দেশীয় রাজনীতিতে যেমন নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে তেমনি আন্তর্জাতিকভাবেও মতাদর্শিক সখ্য তৈরি করেছে এবং মতাদর্শকে কেন্দ্র করে যে বিশাল অর্থনৈতিক সাপোর্ট পাচ্ছে তাই-ই তাদের সহিংস ক্ষমতা প্রদর্শনের আসল উৎস। এ অর্থ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমাজের আনাচে-কানাচে প্রবাহিত। এ স্রোত নানা শাখা-উপশাখা পেরিয়ে এমনভাবে বিস্তৃত যাতে অবগাহন করছেন শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনের অনেক হাই প্রোফাইল থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ, উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর এক বড় অংশ। বাণিজ্য পুঁজির শেকড়বিহীন আধিপত্যের সঙ্গে মিশে এ পুঁজি যে রাজনৈতিক-সামাজিক অভিঘাত তৈরি করেছে তার প্রভাব রয়েছে সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের প্রায় সব শাখায়।

লাতিন আমেরিকায় বিশ শতকের শেষদিকে জাতীয় আন্দোলনের স্বকীয়তা নিয়ে তাদের উপন্যাস বা সাহিত্য যেভাবে বিকশিত হয়েছে, আমাদের দেশে তেমনভাবে বিকশিত হতে পারেনি। অথচ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তাদেরও লড়াই করতে হয়েছে। আঠারো শতকের শেষদিকে স্পেনের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হয়ে প্রায় বিশটির মতো প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, কিন্তু তা সেভাবে বিকশিত হতে পারেনি। সে জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরও প্রায় এক শ’ বছর। বিশ শতকে শুরু হয় ওদের দ্বিতীয় উপনিবেশ মুক্তির আন্দোলন। এ আন্দোলনের প্রভাব লাতিন সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। আত্মপ্রতিষ্ঠার লড়াই বিপ্লবাত্মক উপাদানকে নির্ভর করে বিকশিত হয়েছে। নোবেলজয়ী সাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর আমাদের দেশেও তার প্রভাব পড়ে। মার্কেস লাতিন আমেরিকার নিজস্বতাকে জাদুবাস্তবতার ফর্ম দিয়ে সমূলে আঁকড়ে ধরেছেন তার উপন্যাসে। সেখানে লাতিন আমেরিকান সমাজের গভীরে প্রোথিত অলৌকিকতাও আগাগোড়া জায়গা পেয়েছে। মার্কেস বা তার সময়ের অন্য লাতিন আমেরিকান সাহিত্যিকরা সমাজের এ স্বকীয়তাকে সচেতনভাবে প্রয়োগ করেছেন বা আঁকড়ে ধরেছিলেন। কারণ আগ্রাসী মার্কিন ও তাদের সহযোগীরা অর্থনৈতিক পরাধীনতার পাশাপাশি লাতিন আমেরিকার নিজস্ব সাংস্কৃতিক উপাদান ধ্বংস করে তাদের মানসিকভাবেও পরাভূত করতে চেয়েছিল। কিন্তু মার্কেস ও সমসাময়িক লেখকরা তার বিরুদ্ধে সারাক্ষণ সচেতন থেকেছেন।

লাতিন আমেরিকার সমাজ রাজনীতির সঙ্গে আমাদের এ অঞ্চলের অনেক মিল থাকলেও রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ভিন্ন খাতে বয়ে গেছে। আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাকে পুরোপুরি আগলে রাখতে পারিনি। রাজনীতির নোংরা ডানায় ভর করে ‘ধর্ম’ এসে বারবার তা এলোমেলো করেছে। একে পৃষ্ঠপোষকতা দেয় যে অর্থ তাকে লালন করে মূলত মৌলবাদ। বাঙালী সংস্কৃতির বিশাল ভাণ্ডার ধারণ করার ক্ষমতা এর নেই। আর বাস্তবতা হচ্ছে এরই ফাঁদে পা দিয়ে আটকেছে শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ। তাই সমাজে যখন তাদের প্রত্যাখ্যানের আওয়াজ ওঠে তখন চারদিক থেকে নানা জটিলতা এসে ভিড় করে। নানা রূপে ও প্রকরণে রাজনীতির খেলা চলে। মাঝখান থেকে সব হারায় সংখ্যালঘুরা। প্রাণ দেয় সাধারণ মানুষ। রাজনীতির হিসাব-নিকাশ এক সময় মিটে যায়, কিন্তু সংখ্যালঘুদের ভালনারেবিলিটি দূর হয় না। যারা প্রতিহিংসার শিকার সাধারণত তারা নিম্নবর্গের মানুষ। সমাজে তারা সব সময়েই দুর্বল। আর এদের মধ্যে দুর্বলতম হচ্ছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা। রাষ্ট্রের চরিত্র অনুযায়ী প্রথম আঘাতটা আসে তাদের ওপর। যে যেভাবেই ব্যাখ্যা করুন না কেন মূল সূত্রটা আজও এখানেই রয়েছেÑ বৈষম্যপূর্ণ সমাজে মানবিকতা স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয় না। সমাজের একেবারে নিচের ধাপ থেকে ওপর পর্যন্ত নানা মাত্রার বৈষম্য সেখানে ঘাপটিমেরে থাকে। পত্রিকায় পড়ে এবং টেলিভিশনে দেখে দূর থেকে আহা-উহু করা যায়। টক শোতে বহুমাত্রিক বিশ্লেষণের বন্যায় তাদের প্রতি ভালবাসার নহর বইয়ে দেয়া যায়। এগুলো খুব সহজ।

কেননা এ জন্য নিজেকে কিছু হারাতে হয় না। কিন্তু বৈষম্যহীন না হোক একে সহনীয় মাত্রায় রাখার জন্য নিজের অবস্থান থেকে যেটুকু করা দরকার তা কি করা হয়? নিজেকে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা করার বহুমাত্রিক প্রলোভনের কাছে আমরা পরাভূত। নয় মাস যুদ্ধ করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জিত হয়েছে, কিন্তু সমাজ কাঠামোয় কি কোন পরিবর্তন এসেছে? সমাজের কাঠামো না বদলালে সংখ্যালঘু বলি আর নিপীড়িত বলি কারও অবস্থারই পরিবর্তন হবে না। রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে কোন না কোনভাবে এদের যুক্ত করতে না পারলে এভাবেই চলবে। একবার মৌলবাদের দলে একবার গণতন্ত্রের মোড়কে আরেকবার অন্য কোন রূপে এ রকম চলতেই থাকবে। রাষ্ট্র ক্ষমতার সঙ্গে এদের যুক্ত করা আজকের পৃথিবীতেও যে অসম্ভব নয় তারও উদাহরণ রয়েছে এ সময়ের লাতিন আমেরিকায়। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ পেরেছিলেন। গৎবাঁধা কোন ফর্মুলায় নয়, তিনি তার মতো করে নিম্নবর্গের মানুষকে রাষ্ট্র ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করেছিলন।

ভেনিজুয়েলাকে তিনি লাতিন আমেরিকার শক্তি ও সাহসের প্রতীকে পরিণত করেছিলেন। যার প্রভাব ওই অঞ্চলের রাজনীতিতে গভীরভাবে আছে। বলিভিয়াতেও সংখ্যাগরিষ্ঠ নিম্নবর্গের মানুষ রাষ্ট্র ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, অথচ প্রায় দু’দশক আগেও এই ভেনিজুয়েলা ও এখানকার অন্য অনেক দেশে সব ধরনের ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিল সাদা ইউরোপীয়দের উত্তরসূরিরা। আদিবাসী বা কৃষ্ণাঙ্গরা ছিলেন সমাজের একেবারে নিচুতলায়। শ্যাভেজ ভেনিজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদকে জাতীয় সম্পদে রূপ দেন। বেশিরভাগ কোম্পানি রাষ্ট্রীয়করণ করেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের মতো জনসংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে গরিব মানুষের জীবনের স্তর বহুগুণ উন্নত করেছিলেন।

সুতরাং সম্ভব। নিজ দেশের বাস্তবতা বুঝে মানুষের প্রতি সত্যিকারের ভালবাসা থেকে উদ্যোগ নিলে ধীরে ধীরে সব ধরনের বৈষম্য কমিয়ে আনা সম্ভব। বৈষম্য কমলে অনভিপ্রেত অনেক ঘটনা সমাজ থেকে এমনিতেই দূর হবে।