২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শিক্ষা সহায়তায় কিছু উদ্যোগ

  • শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

শিক্ষা ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিক্ষা সহায়তা কার্যক্রম। অসচ্ছল তথা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিক্ষার সুযোগ অবারিত করার জন্য শিক্ষা উপবৃত্তির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুত, কৃষি এবং অন্যান্য সেক্টরে উন্নয়নের হাওয়া বইছে। নিরক্ষরতা দূরীকরণেও অর্জিত হয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য। শিক্ষা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্যের প্রশংসা করেছেন জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশ প্রথম স্থানে অবস্থান করছে। ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়ায় গ্রামে বসেই যে কোন শিক্ষার্থী উন্নত বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারছে। এক সময় নারী শিক্ষা ছিল শুধু উচ্চবিত্ত ও শহরের কিছু পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সেই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছে।

উপবৃত্তি প্রদান প্রকল্প

মানবসম্পদ উন্নয়নে এযাবতকালে সরকার কর্তৃক যে সকল গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচী গৃহীত হয়েছে তার মধ্যে উপবৃত্তি প্রদান কর্মসূচী অন্যতম। বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক নারীÑ যারা দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, আর্থ-সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা ইত্যাদি কারণে শিক্ষার সুযোগ হতে বঞ্চিত ছিল বিধায় দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকা-ে তাদের যথাযথ অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে নারী শিক্ষাকে উৎসাহিত করার উপায় হিসেবে বেসরকারিভাবে ১৯৮২ সাল থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ছাত্রী উপবৃত্তি প্রকল্প চালু হয়েছিল। অর্থের অভাবে শিক্ষাবঞ্চিতদের শিক্ষায় আকৃষ্ট করা ও শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য বর্তমান সরকারের উদ্যোগে বাংলাদেশে নতুন কর্মসূচী চালু করা হয়, যার নাম উপবৃত্তি। মূলত একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা যেন অর্থ আয়ের দিকে ঝুঁকে না পড়ে পড়াশোনায় নিয়জিত থাকে সে লক্ষ্যে এই ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পাঁচটি প্রকল্পের আওতায় দেশের ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে স্নাতক (পাস) ও সমমান পর্যায়ের দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রদান অব্যাহত আছে। চলতি অর্থবছর থেকে দেশের ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে স্নাতক ও সমমান পর্যায়ের দরিদ্র এবং মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের সার্বিক উপবৃত্তি কার্যক্রম প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের অর্থে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

বাংলাদেশ শিক্ষা, তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) হিসাব মতে ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে স্নাতক (পাস) ও সমমান পর্যায়ের ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রকল্পের আওতায় ১ লাখ ২৯ হাজার ৮১০ জন ছাত্রীকে ৭২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা উপবৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এরপর ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে ১১টি জেলার ৯০ শতাংশ ছাত্রী ও ১০ শতাংশ ছাত্র এবং বাকি ৫৩টি জেলায় ৩০ শতাংশ ছাত্রী ও ১০ শতাংশ ছাত্রসহ মোট ১ লাখ ৭৪ হাজার ৪৪৬ জনকে উপবৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে সর্বমোট ৩৬৬৪৬৫১৯ জন ছাত্র-ছাত্রীর বিপরীতে ১১৭৪৮৪৮৯ জন শিক্ষার্থীকে মোট ১,৮৭৯,৭৬,৩৫,৩০০ টাকা উপবৃত্তি প্রদান করা হয়েছিল। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বৃত্তি, উপবৃত্তি বা মেধাবৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা মোট ছাত্র-ছাত্রীর ৩২.০৫ শতাংশ। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে সর্বমোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩৬৯৬১৯৭৮ জন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মোট ১৬৬৪৫৭৭ জন ছাত্র-ছাত্রীকে সরাসরি বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রাথমিক শিক্ষায় ১ কোটি ৩০ লাখ শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি দেয়া হয়েছে এবং ষষ্ঠ থেকে স্নাতক পর্যন্ত যার সংখ্যা ৩৮ লাখ ১৬ হাজার। বর্তমানে মোট ১ কোটি ৬৮ লাখ শিক্ষার্থী উপবৃত্তি পাচ্ছে। যার ৭৫ শতাংশই ছাত্রী। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রাথমিক পর্যায়ে উপবৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ১ কোটি ৩০ লাখ। প্রাথমিক থেকে মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যন্ত শিক্ষাখাতে মোট উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৩৭ লাখ ৭ হাজার। এক্ষেত্রে দেখা যায়, মোট শিক্ষার্থীর অধিকাংশই কোন না কোন প্রণোদনা বা বৃত্তি-উপবৃত্তি পেয়ে থাকে। এই বৃত্তি-উপবৃত্তি বা মেধাবৃত্তি প্রদান করা হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে।

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট

অর্থের অভাবে শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে স্নাতক (পাস) ও সমমান পর্যন্ত দরিদ্র এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার রোধ, বাল্যবিবাহ রোধ এবং শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা নিশ্চিতকরণের সুমহান লক্ষ্য বাস্তবায়নে শেখ হাসিনার চিন্তাপ্রসূত বহুল আলোচিত শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট। অর্থের অভাবে শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত দরিদ্র, মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা নিশ্চিত করার নিমিত্তে দেশের সকল স্কুল/কলেজ/মাদ্রাসা/বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদানের জন্য একটি ‘ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠনের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুসারে নবম জাতীয় সংসদের দ্বাদশ অধিবেশনে ‘প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট বিল, ২০১২ পাস হয়েছিল। ২০১২-১৩ অর্থবছরে স্নাতক (পাস) ও সমমান পর্যায়ের ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রকল্পের আওতায় ১২৯৮১০ জন ছাত্রীকে মোট ৭২.৯৫ কোটি টাকা উপবৃত্তি প্রদান করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্নাতক (পাস) ও সমমান পর্যায়ের নির্বাচিত ১৫ জন ছাত্রীকে সরাসরি উপবৃত্তির টাকা বিতরণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছিল এ ট্রাস্টের, যা শিক্ষা ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হিসেবে মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

অদম্য মেধাবীদের শিক্ষায় সহায়তা

মেধাবী কিন্তু দরিদ্রতা ও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চ মাধ্যমিক অথবা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারছে না। এমন অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে পৃষ্ঠপোষকতা কার্যক্রম গ্রহণের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট আইনে শিক্ষার্থীদের জন্য যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে এসএসসি পরীক্ষা ২০১৭-এর ফল প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফলে প্রতিবছরের মতো এবারও বেশকিছু দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থী তাদের মেধার স্বাক্ষর রেখেছে। কোন কোন শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েও উচ্চ মাধ্যমিক অথবা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করতে কিংবা ভর্তি হতে পারছে না। এ বিষয়ে বিভিন্ন সময় প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তাদের ভবিষ্যত শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মুখে রয়েছে। প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা পেলে এসব দরিদ্র অথচ মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা লাভ করে জাতি গঠনের কাজে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারবে মর্মে প্রত্যাশা করা যায়। উচ্চ মাধ্যমিক অথবা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট আইন ২০১২ অনুযায়ী উল্লিখিত শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা প্রদান করেছে, যাতে এই অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবন চালিয়ে নিতে পারে।

শিক্ষা সহায়তায় সরকারের এসব কর্মসূচী বাস্তবায়ন এবং পরিকল্পিত ও সুষম দারিদ্র্যবান্ধব উন্নয়ন কৌশল গ্রহণের ফলে দারিদ্র্যের হার কমে ২২ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপের প্রাথমিক ফল অনুযায়ী অতি দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৬ শতাংশে। শুধু অতি দরিদ্র নয়, দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী সব শিক্ষার্থী সরকারের আর্থিক সহযোগিতায় লেখাপড়া করার সুযোগ পাচ্ছে। কেননা বাংলাদেশে বিদ্যমান মেধাবৃত্তি, বৃত্তি বা উপবৃত্তি প্রদানের ক্ষেত্রে দেখা যায় ৪৫ শতাংশ ছাত্র-ছাত্রী সরাসরি আর্থিক সহযোগিতা পাচ্ছে। এছাড়া সরকার সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচী বাস্তবায়নে প্রতিবছর এক লাখ কোটির বেশি অর্থ ব্যয় করছে। যার সুফল ভোগ করছে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, যা দারিদ্র্য দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সরকার যদি সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার আদলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য অনুরূপ প্রকল্প গ্রহণ করে দেশের সর্বস্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করে শিক্ষাব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করে তাহলে দেশ আরও দ্রুত প্রবৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হবে। শিক্ষা জাতীয়করণে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এবং প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট আইন ২০১২-এ সুপারিশ রয়েছে। এ ধারা অব্যাহত গতিতে চলতে থাকলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের কোন শিক্ষার্থীই অর্থের অভাবে লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত থাকবে না। শিক্ষায় শতভাগ সাফল্য অর্জন হবে এবং টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে দ্রুত সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথে এক ধাপ এগিয়ে থাকবে বাংলাদেশ।

sumahmud78@gmail.com

নির্বাচিত সংবাদ