২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দুঃসাহসিক উদ্ধার

সব জল্পনা-কল্পনা ও আশঙ্কার অবসান ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত থাইল্যান্ডের দুর্গম গুহায় আটকে পড়া ১২ কিশোর ও তাদের কোচকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। থাইল্যান্ডবাসীর সঙ্গে সঙ্গে প্রায় গোটা বিশ্ববাসী রোমহর্ষক এই দুঃসাহসিক অভিযান আনন্দের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করেছে। ভূপৃষ্ঠের ৬০০ মিটার নিচে এক গভীর সুড়ঙ্গে আবদ্ধ কিশোর ফুটবল দলটির বেঁচে থাকা নিয়ে শেষ পর্যন্ত সংশয়, সন্দেহ ও অবিশ্বাস ছিল মানুষের মনে। তবে মানুষ, প্রযুক্তি ও প্রকৃতির সহায়তায় শেষাবধি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে দলটিকে। উল্লেখ্য, থাইল্যান্ডের মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় চিয়াং রাইয়ের দুর্গম অঞ্চলে থাম লুয়াং গুহায় নিছক কৌতূহল ও অভিযানের স্পৃহায় ঢোকার পর ১৩ জুন নিখোঁজ হয় ১২ খুদে ফুটবলার ও তাদের কোচ। তারা মু লাচার নামে একটি ফুটবল দলের সদস্য। তবে দুর্ভাগ্য দলটির, গুহার প্রবেশের পর পরই ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে বন্ধ হয়ে যায় গুহার প্রবেশ মুখ। পানির চাপ ও প্রাবল্য ক্রমাগত বাড়তে থাকায় বাধ্য হয়ে পিছু হটতে থাকে দলটি এবং এক পর্যায়ে প্রায় চার মিটার গভীরে ঢুকে যেতে বাধ্য হয়, যেখানে শুধুই ঘুটঘুটে অন্ধকারসহ বিশুদ্ধ বাতাসের অপ্রতুলতা। ৯ দিন সেখানে আটকে থাকার পর ২ জুলাই দু’জন ব্রিটিশ ডুবুরি তাদের সন্ধান পেতে সমর্থ হন। তবে তাদের নিরাপদ উদ্ধার অভিযান নিয়ে দেখা দেয় অনিশ্চয়তা। কেননা, স্থানটি প্রকৃতপক্ষেই দুর্গম ও গভীর, সর্বোপরি আঁকাবাঁকা, সর্পিল, ভঙ্গুর এবং স্থানে স্থানে জলমগ্ন। যেতে আসতে সময় লাগে ১১ ঘণ্টা। সর্বোপরি প্রকৃতিও বিরূপÑ ভারি বৃষ্টিপাত ও ঝড়-ঝঞ্ঝাপূর্ণ। এতসব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে কিশোর ফুটবল দলটিকে বাইরে জীবনের পথে বের করে আনা ছিল সত্যিই দুরূহ ও ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয় প্রাদেশিক গবর্নরের নেতৃত্বে যৌথ উদ্ধার অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনী। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের উদ্ধারকারী অভিজ্ঞ দল ও বিশেষজ্ঞরাও সাহায্য-সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করে। সহায়তা নেয়া হয় সর্বাধুনিক প্রযুক্তির। দুর্ভাগ্য এই যে, দলটি সাঁতার জানত না। এর জন্য অক্সিজেন মাস্ক ও সিলিন্ডারসহ সহায়তা নেয়া হয় দক্ষ ডুবুরিদের, যারা গাইড হিসেবে কাজ করে বের করে আনতে সক্ষম হন দলটিকে। উদ্ধার করতে গিয়ে থাই নৌবাহিনীর এক সাবেক ডুবুরি সদস্যের মৃত্যুর খবরও আছে। তবে সকল বাধা-বিঘœ ও প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে শেষ পর্যন্ত সফল হয় উদ্ধার অভিযান। জয় হয় মানুষ ও মানবতার। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বিশ্ববাসী।

বর্তমান দ্বন্দ্ব-সংঘাত, হিংসা-বিদ্বেষপূর্ণ পৃথিবীতে থাইল্যান্ডের দুর্গম গুহা থেকে উজ্জ্বল উদ্ধার অভিযানটি বুঝিয়ে দিল যে, মানবতা অদ্যাবধি হারিয়ে যায়নি। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সামান্য ঘটনা হলেও নিখোঁজ কিশোর, গুহাবাসীর উদ্ধারে মানবতার আহ্বানে সাড়া মিলেছে বিশ্বব্যাপী। উদ্ধারের পর পরই কোচসহ দলটিকে ভর্তি করা হয়েছে হাসপাতালে। গুহার প্রত্যন্ত অন্ধকার আর্দ্র স্যাঁতসেঁতে অঞ্চলে কয়েকদিন অবস্থান করায় ইঁদুর-বাদুড়ের উপদ্রবে তাদের মধ্যে নানাবিধ সংক্রমণের সমূহ ঝুঁকি রয়েছে বিধায় এই ব্যবস্থা। কোয়ারেন্টাইন বা সংঘরোধ কাল শেষ হলেই তাদের ফিরিয়ে দেয়া হবে মা-বাবা-স্বজনদের কাছে। ফুটবলের বিশ্বসংস্থা ফিফা ইতোমধ্যে কিশোর ফুটবল দলটিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ১৫ জুলাই রাশিয়ায় অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল খেলা দেখার। দলটি এতে নিশ্চয়ই আনন্দে উদ্বেল ও আপ্লুত হবে। তবে শারীরিক সক্ষমতার অভাবে খেলা দেখা সম্ভব হবে না তাদের। প্রায় নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে নিশ্চয়ই তারা সমস্বরে গাইবে জীবনের জয়গান।

নির্বাচিত সংবাদ