১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জাগালো-বেকেনবাওয়ারের মতো কীর্তি গড়ার হাতছানি দেশমের

রুমেল খান ॥ ভাল ছাত্র হলেই ভাল শিক্ষক হওয়া যায় না। তেমনি ভাল ফুটবলার হলেই ভাল কোচ হওয়া যায় না। উৎকৃষ্ট উদাহরণ? ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা। আর্জেন্টাইন এই এ্যাটাকিং মিডফিল্ডারকে (ক্যারিয়ার ১৯৭৬-১৯৯৭) বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দু’জন ফুটবলারের একজন ধরা হয়। ফুটবল থেকে অবসর নেয়ার তিন বছর আগেই যখন ১৯৯৪ সালে কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করেন, তখন সবাই ধরে নিয়েছিলেন এখানেও বুঝি সফল হবেন ১৯৮৬ বিশ্বকাপের এই মহানায়ক। দুটি আর্জেন্টাইন ক্লাব (মানদিউ দি কোরেয়িন্তেস এবং রেসিং), দুটি আরব আমিরাতের ক্লাব (আল ওয়াসল এবং আল ফুজাইরা) এবং আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের (২০০৮-২০১০, ২০১০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা বিদায় নেয় কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে) কোচ হিসেবে কাজ করে একটা শিরোপাও জিততে পারেননি। যাকে বলে শোচনীয় ব্যর্থতা। এরকম আরও অনেকের নামই উদাহরণ হিসেবে দেয়া যাবে। তবে ম্যারাডোনারটা দিয়েই বাকিদের যাচাই করা যায়।

তবে এর ব্যতিক্রমও আছে। তাদের সংখ্যাটা খুবই কম। যাকে বলে বিরল প্রজাতির ‘ফুটবলার-কোচ’ তারা। ইতিহাস বলেÑ পৃথিবীতে এর আগে এমন দু’জন ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া গেছে যারা ফুটবলার এবং কোচ ... উভয় ভূমিকাতেই বিশ্বকাপ ট্রফি জেতার অবিশাস্য নজির গড়েছেন। তারা উভয়েই জীবন্ত কিংবদন্তি। এদের প্রথমজন হলেন ব্রাজিলের মারিও জাগালো। দ্বিতীয়জন হলেন জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার।

এদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে এবারের রাশিয়া বিশ্বকাপে এই সুমহান কীর্তি গড়ার হাতছানি দিচ্ছে আরেকজনকে। তিনি দিদিয়ের দেশম। এই অবিশ্বাস্য অর্জনের জন্য আর মাত্র একধাপ দূরে অবস্থান করছেন ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি এবং ৪৯ বছর বয়সী দেশম।

সবার আগে এই কীর্তি গড়েছিলেন যিনি তিনি মারিও জাগালো। ব্রাজিল যখন সুইডেনে অনুষ্ঠিত ১৯৫৮ সালে জুলেরিমে বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো শিরোপা জেতে, তখন সেই দলের ইনসাইড ফরোয়ার্ড এবং লেফট উইঙ্গার ছিলেন তিনি। মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে যখন ব্রাজিল তৃতীয়বারের মতো জুলেরিমে ট্রফিটি জিতে চিরতরে এর মালিক হয়ে যায় তখন জাগালো ছিলেন দলের হেড কোচ।

তবে দুটি ব্যাপারে বেকেনবাওয়ারের চেয়ে এগিয়ে আছেন জাগালো। খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ জিতেছেন চিলিতে অনুষ্ঠিত ১৯৬২ আসরেও। যেখানে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ১৯৬৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে হেরে গিয়েছিলেন বেকেনবাওয়ার (প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড)। এছাড়া জাগালো সহকারী কোচ হিসেবেও বিশ্বকাপ জিতেছেন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ১৯৯৪ আসরে। এমন কৃতিত্ব নেই ‘কাইজার’ খ্যাত বেকেনবাওয়ারের। জাগালোর পর দ্বিতীয় কীর্তিমান হিসেবে পদাঙ্ক অনুসরণ করেন যিনি, তিনি ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার। তৎকালীন পশ্চিম জার্মানি যখন দ্বিতীয়বারের মতো ফিফা বিশ্বকাপ জেতে ১৯৭৪ সালে তখন দলের লিবারো এবং ডিফেন্ডার পজিশনে খেলতেন তিনি। ১৯৯০ সালে জার্মানি দল যখন তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতে, তখন দলটির গর্বিত কোচ ছিলেন বেকেনবাওয়ার। বেকেনবাওয়ার অবশ্য চার বছর আগেই ১৯৮৬ আসরেই কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জিততে পারতেন, যদি কার্লোস বিলার্ডো-ডিয়েগো মারাডোনার আর্জেন্টিনার কাছে ফাইনালে পশ্চিম জার্মানি না হারতো।

একটি ক্ষেত্রে জাগালোর চেয়ে এগিয়ে আছেন বেকেনবাওয়ার। ১৯৭৪ আসরের শিরোপা জয়ী জার্মানি দলের খেলোয়াড় থাকার পাশাপাশি অধিনায়কও ছিলেন তিনি। এছাড়া অধিনায়ক বেকেনবাওয়ার বিশ্বকাপ জিতেছিলেন নিজ দেশের মাটিতে। অর্থাৎ জার্মানি সেবার ছিল স্বাগতিক।

জাগালো-বেকেনবাওয়ারের পর তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে যার এই বিরল কীর্তির পুনরাবৃত্তি করার সম্ভাবনা তিনি ফ্রান্সের দিদিয়ের দেশম। ১৯৯৮ সালে প্রথমবারের মতো ফ্রান্স যখন বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয় তখন দলের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ছিলেন দেশম। আর এবার ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে ফাইনালিস্ট ফ্রান্স দলের কোচ তিনি। বেকেনবাওয়ারের মতো দেশমও ছিলেন ১৯৯৮ আসরের শিরোপাধারী ফ্রান্স দলের অধিনায়ক। আরেকটা মিল আছে। তিনিও বেকেনবাওয়ারের মতো ছিলেন আয়োজক-স্বাগতিক দলের অধিনায়ক।

এবার কী ফ্রান্স পারবে দ্বিতীয়বারের মতো কাপ জিততে (তৃতীয়বারের চেষ্টায়, ২০০৬ আসরে রানার্সআপ) এবং খেলোয়াড়-কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জিততে পারবেন কিংবদন্তি জাগালো-বেকেনবাওয়ারের মতো?

এক লাফে যেমন মগডালে ওঠা যায় না, তেমনি চূড়ান্ত সাফল্য এক ধাক্কাতেই পাওয়া যায় না। সাফল্য পেতে হলে এগোতে হয় ধীরে ধীরে ও ধাপে ধাপে। সেটাই করার চেষ্টা করেছে ‘লেস ব্লিউস’ খ্যাত ফ্রান্স।

ফ্রান্সের কোচদের ইতিহাসে দেশম সবচেয়ে বেশি ম্যাচে কোচ হওয়ার কীর্তি গড়েছেন রাশিয়া বিশ্বকাপেই। এ পর্যন্ত তার অধীনে (২০১২ সাল থেকে) ৮২ ম্যাচ খেলে ৫২টিতেই জিতেছে ফ্রান্স। ১৫ ড্রয়ের পাশাপাশি হেরেছে ১৫ ম্যাচে। দেশম ভেঙ্গেছেন তার পূর্বসূরি রেমন্ড ডমেনেখের (২০০৪-২০১০) রেকর্ড। রেমন্ডের অধীনে ফ্রান্স ৭৯ ম্যাচে ৪১টিতে জিতেছে। ২৪টিতে ড্র করেছে, হেরেছে ১৪টিতে। জাতীয় দলের হয়ে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে (১৯৮৯-২০০০) ১০৩ ম্যাচে ৪ গোলের মালিক দেশমের জাতীয় দলের হয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সাফল্য ২০১৬ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে দলকে ফাইনালে খেলানো। সেই ফাইনালে পর্তুগালের কাছে ১-০ গোলে হেরেছিল ফ্রান্স। সেই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দুই বছর আগে আমরা যে ভুল করেছিলাম, এবার বিশ্বকাপের ফাইনালে সেই ভুল করতে চাই না।’

দলে তরুণ খেলোয়াড়দের সংখ্যাই বেশি। তাদের ওপর ভরসা রাখছেন দেশম, ‘তরুণদের ওপর আমার আস্থা আছে। তারা পরিশ্রমী এবং ভালমতোই জানে, তাদের কাজটা কি। এখন পর্যন্ত তাদের ওপর আমি দারুণ খুশি। আশাকরি তারা আমাকে ফাইনালেও হতাশ করবে না।’

জাগালো-বেকেনবাওয়ারের পর খেলোয়াড় এবং কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ ফুটবলের সোনালী ট্রফিতে চুমু খাবার বিরল সৌভাগ্যের অধিকারী হতে পারবেন দেশম? এর উত্তর জানা যাবে ১৫ জুলাই ফাইনালের পরেই। সেই পর্যন্ত ফুটবলপ্রেমীদের অপেক্ষা করতেই হচ্ছে।