১৭ জুলাই ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মাদারীপুরে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পানির পাম্প ॥ মিলছে না বিশুদ্ধ পানি

মাদারীপুরে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পানির পাম্প ॥ মিলছে না বিশুদ্ধ পানি

সুবল বিশ্বাস, মাদারীপুর ॥ ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দু‘টি পানির পাম্প থেকে সুপেয় নিরাপদ পানির বদলে সরবরাহ করা হচ্ছে আয়রণযুক্ত নোংরা ও দূষিত পানি। নিরাপদ পানির জন্য ব্যয়বহুল এ ব্যবস্থা এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য হুককি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পানি ব্যবহারে জন্ডিস, কলেরাসহ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগের পদস্থ কর্মকর্তা। প্রতিমাসে নিয়মিত বিল পরিশোধ করেও গ্রাহকরা পাচ্ছেনা বিশুদ্ধ পানি।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সুপেয় ও নিরাপাদ বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য ২০১২ সালের আগস্ট মাসে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এর ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৩ কোটি টাকা। এ অর্থের ৭০ ভাগ সরবরাহ করে সরকার ও ৩০ ভাগ সরবরাহ করে এসএস কনস্ট্রাকশন এবং এসএস এন্টারপ্রাইজ নামের একটি এনজিও। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে রাজৈর উপজেলার কবিরাজপুর ও শিবচর উপজেলার নিলখী ইউনিয়নে নির্মাণ করা হয় দু‘টি পানির পাম্প।

চুক্তি অনুসারে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ৩০ ভাগ অর্থ যোগানদানকারী প্রতিষ্ঠান এর লভ্যাংশ গ্রহণ করে পাম্প দ‘ুটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নিকট হস্তান্তর করে। চলতি বছর জানুয়ারী থেকে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসা-বাড়িতে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য প্রত্যেক গ্রাহকের কাছ থেকে নেয়া হয় ২ হাজার ৯০০শ‘ টাকা করে। দুটি পাম্পের ১ হাজার ১২০ জন গ্রাহককে মাসে ১৮০ টাকা করে পানির বিল পরিশোধ করতে হয়। প্রতি ২৪ ঘন্টায় কমপক্ষে ৫/৬ ঘন্টা পানি সরবরাহের কথা রয়েছে।

গ্রাহকদের অভিযোগ, পাম্প চালুর পর থেকে গ্রাহকদের ৫/৬ ঘন্টা পানির সুবিধা দেয়ার কথা থাকলেও প্রতিদিন দেয়া হচ্ছে ২ থেকে ৩ ঘন্টা। তাও মাত্রাতিরিক্ত আয়রণযুক্ত নোংরা ও দূষিত পানি দেয়া হচ্ছে। এরপরেও প্রতি মাসে ১৮০ টাকা নির্ধারিত পানির বিলের বিপরীতে নেয়া হয় ২০০ টাকা করে।

বৃহস্পতিবার সকালে এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, কবিরাজপুর ইউনিয়ন ভবনের পিছনে নির্মাণ করা হয়েছে পানির বড় একটি ট্যাংক। পাশেই রয়েছে পানির পাম্প। পাম্পের পাইপগুলো যেখানে সেখানে ফেলে রাখা হয়েছে। আশে-পাশে ময়লার স্তুপ। একই চিত্র শিবচর উপজেলার নিখলী ইউনিয়নে।

কবিরাজপুর ইউনিয়নের শ্রীকৃষ্ণদী গ্রামের বাসিন্দা কুলসুম বেগম বলেন, ‘এই পানি খাওয়ার অযোগ্য, তবুও প্রতি মাসে ২০০ টাকা করে বিল দিতে হয়। কিন্তু সরকারি এই পানি এখন আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এই পনিতে প্রচুর ময়লা আর আয়রণ আসে। পানি কোন পাত্রে রাখলে পাত্র একদিনেই লাল হয়ে যায়।’

মহিউদ্দিন নামে এক গ্রাহক বলেন, ‘পাম্প দিয়ে সব সময় ময়লা পানি আসে। কিছুদিন আগে এই পানি পান করে আমার ঘরের সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ে। এরপর থেকে এই পানি রান্না-বান্নাসহ ঘরের কোন কাজে আর ব্যবহার করি না। হাত-পা ধোয়া ছাড়া এই পানি আমাদের কোন কাজে আসে না।’

শিবচর নিখলীর এক গ্রাহক মোবারক আলী বলেন, ‘নিরাপদ পানি পাবো বলে বাসার ছাদে পানির ট্যাংকি বাসাই। কিন্তু এই ট্রেংকিতে পানির সাথে ময়লা ভাসছে। পানির বর্ণ পরিবর্তন হয়ে লালচে হয়ে গেছে।’

রাজৈর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সৈয়দ আলী মাতুব্বর বলেন, ‘৫০ ফিট উঁচু ও ১০০ ঘন মিটার পানি ধরণ ক্ষমতা সম্পন্ন পাম্প দ‘ুটি থেকে নোংরা পানি সরবরাহের কথা নয়। আমি গত ৬ মাস আগে পানির পাম্প থেকে পানি সংগ্রহ করে তা পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে দেখেছি, তখন খারাপ কিছু পাইনি। তবে এখন কি অবস্থা তা জানি না। আর পাম্পে নিয়োজিত স্টাফ আমাদের কিছু জানায়নি। গ্রাহকরাও কোন অভিযোগ,দেয়নি। পাম্প দু‘টি যেহেতু জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে, সেহেতু আমরা বিষয়টি দ্রুত সমাধাণের পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।’

মাদারীপুরের সিভিল সার্জন মো. ফরিদ হোসেন মিঞা বলেন, ‘কোন পানির পাম্প থেকে যদি নোংরা, আয়রণযুক্ত পানি সরবরাহ করা হয়, তবে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। দীর্ঘদিন ধরে এই পানি পান করলে জন্ডিস, কলেরা, ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত যেকোন রোগ হতে পারে।’

মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সুপেয় পানি সরবরাহের লক্ষ্যে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু এ প্রকল্পে জনসাধারণ উপকৃত হয়নি। জনসাধারণকে সঠিক ভাবে পানি সরবরাহ করা হয়নি। আমরা এই বিষয়ে খোঁজ খবর নিচ্ছি। যদি এ বিষয়ে আমরা কোন অনিয়ম দুর্নীতি পাই, তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’