১৯ জুলাই ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আইভি জামানের সাহসী ভাস্কর্য ভুবন

নানা রঙে রঙিন বাংলাদেশ আবার নানা বর্ণে বর্ণিল বাংলাদেশ। পৃথিবীতে এমন দেশ সত্যিই খুব কম আছে যেখানে প্রকৃতিতে এত রং খেলা করে; প্রকৃতি এত বর্ণে বর্ণিল হতে পারে। আবার এই বাংলাদেশেই শিল্পের অন্যতম একটি শক্তিশালী মাধ্যম ভাস্কর্যকে মূর্তি আখ্যা দিয়ে হামলা করা হয়; ভেঙ্গে ফেলা হয়। দেশে স্থাপিত প্রায় প্রতিটি ভাস্কর্য কোন না কোন সময় মৌলবাদী গোষ্ঠী কর্তৃক হামলার শিকার হয়েছে। আবার মৌলবাদী গোষ্ঠীর হিট লিস্টের তালিকার ওপরের দিকেও থাকেন এদেশের ভাস্কর্য শিল্পীরা। এই যখন বাস্তবতা; এই যখন প্রেক্ষাপট তখন ভাস্কর আইভি জামান সাহসী ভাস্কর্যের ভুবন রচনা করে আমাদের ভাবনার বন্দরে সজোরে কড়া নেড়ে গেলেন।

গত ২৫ জুন থেকে ১০ জুলাই জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে ‘সাহসী ভাস্কর্যের ভুবন’ শিরোনামে হয়ে গেল তাঁর চতুর্থ একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী। এখানে ‘বুদ্ধ’ ভাস্কর্যে তিনি ধ্যানমগ্ন বুদ্ধের প্রতিকৃতি তৈরি করে শান্তির বার্তা দিতে চেয়েছেন। চিরায়ত বাংলার বিলুপ্তপ্রায় উপকরণ বিশালাকার এক খড়মের ভাস্কর্যের মধ্যে আমাদের হারানো ঐতিহ্যকে মনে করিয়ে দিয়েছেন। আইভির বেড়ে ওঠা উত্তরবঙ্গের বগুড়া শহরে। শৈশবে দেখা সেখানকার গ্রামে বিলুপ্তপ্রায় মাটির বাড়ি ঘর এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাঁওতাল পল্লীও তাঁর ভাস্কর্যে উঠে এসেছে সুনিপুণ মুনসিয়ানায়। ভাবনা বা চিন্তা ছাড়া মানুষ কোন কাজ করতে পারে না সেটিই দেখিয়েছেন তাঁর ‘চিন্তা’ ভাস্কর্যে। আবার মানুষের প্রচ- কর্মব্যাস্ততার মাঝে প্রয়োজন হয় বিশ্রামের। তাঁর ‘বিশ্রাম’ ভাস্কর্যে সেটিই দেখতে পাই। নগর জীবন আমাদের ফেলে আসা গ্রামীণ জীবনের অনেক স্মৃতিকে ম্লান করে দিয়েছে। তেমনি একটি ভাস্কর্য ‘মোরগের ডাক’ আমাদের গ্রামীণ চিরায়ত জীবনের কথা মনে করিয়ে দেয়। পৃথিবীর যা কিছু সৃষ্টি তাঁর প্রথম ধাপটি দেখিয়েছেন তাঁর ‘বীজ’ ভাস্কর্যে। চাঁদের আলো যে আমাদের একটি মন ভাল করা পরিবেশ তৈরি করে তা দেখতে পাই তাঁর ‘পূর্ণ চাঁদ’ ভাস্কর্যে। সময় বহমান এই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি তাঁর ‘ঘাড়ি’ ভাস্কর্যে। সর্বোপরি তার ভাস্কর্যের ভুবন এক অনবদ্য। তিনি ভাস্কর্যের বিষয়বস্তু নির্মাণের ক্ষেত্রে এক জায়গায় স্থির থাকেননি। তিনি প্রতিনিয়ত বিভিন্ন বিষয়ে স্থানান্তিরত হয়েছেন। ভাবনার জগৎ যে কতটা প্রসারিত হতে পারে সেটিই লক্ষ্য করা যায় তাঁর প্রতিটি কাজে।

গত প্রায় চার দশক তাঁর অনুশীলন এবং নিরীক্ষা অব্যাহত রয়েছে। তিনি নীরিক্ষা করেছেন শৈশবে দেখা তাঁর জন্মভিটার নিকটবর্তী মহাস্থান গড়ের পুন্ড্রবর্ধন এবং গৌড়বঙ্গের টেরাকোটা, মূর্তিতত্ত্ব নিয়ে। আবার মানুষের জীবনাচার এবং অন্যান্য আঙ্গিক নিয়ে। নানা মাধ্যমে ভাস্কর্য চর্চা করেন তিনি। প্রধানত পাথর, ব্রোঞ্জ, ইস্পাত এবং কাঠ তাঁর প্রিয়। তিনি গাছের গুড়ি দিয়ে তৈরি করেন মননশীল ভাস্কর্য। জং ধরা লোহার পাতে তিনি শিল্প খুঁজে ফেরার চেষ্টা করেন। পাথর, ইস্পাত কিংবা ব্রোঞ্জে নির্মিত ভাস্কর্যে তিনি বিভিন্ন আঙ্গিকে তৈরি করেছেন বৈচিত্র্যময় ভাস্কর্য। নিভৃতে সাধারণ মানুষ হিসেবে নান্দানিক বোধ অনুসন্ধান করে ফেরেন তিনি।

তাঁর স্বামী এদেশের খ্যাতিমান ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান। তাঁরা দুজনে ভাস্কর্য সৃষ্টির কাজটি করেন একই ছাদের নিচে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় দুজনের সৃষ্টি দুটি স্বতন্ত্র ধারার। একজনের কাজের সঙ্গে আর একজনের কাজের কোন মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। সত্যিকার অর্থে আইভি জামানের শিল্পকর্ম দেখে মনে হয়েছে তিনি এদেশের ভাস্কর্য শিল্পে এক নতুন যুগ সৃষ্টি করেছেন।

আইভি জামান তাঁর কাজের মাধ্যমে আমাদের উপলব্ধির জায়গাটিকে প্রতিনিয়ত প্রসারিত করছেন। বিশেষ করে একজন ভাস্কর হিসেবে তিনি এদেশের শিল্পকলাকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। তাঁর এই সমৃদ্ধির যাত্রা অব্যাহত থাকুক সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।