২০ জুলাই ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বই ॥ বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি মাটির টান

‘ভূমিরেখা’ কথাসাহিত্যিক দীপু মাহমুদ’র সদ্য বইমেলায় বেরুনো অসাধারণ একটি উপন্যাস। মিয়ানমারের স্বৈরশাসকের কোপানলে পড়ে পূর্বের আরাকান রাজ্যের মুসলিম অধ্যুষিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর যে সাম্প্রতিককালের ভয়াল তা-ব সংগঠিত হয়েছে, তারই এর প্রামাণ্য কথ্য দালিলিক ভাষ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি শুধু কেবলমাত্র একটি উপন্যাস নয়, মিয়ানমারের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন যাত্রার মান, সামাজিক মর্যাদা, জীবন সংগ্রামের চালচিত্র উজ্জ্বল হয়ে উদ্ভাসিত হয়েছে।

এ মায়াময় পৃথিবীতে মানুষের মানবিক বোধ, মমত্ব, ভালবাসার যেমন পরশ মাখানো রয়েছে, ঠিক তার বিপরীতে রয়েছে মানুষের চরম শত্রু এই মানুষই। এই উপন্যাসকে ঘিরে ঔপন্যাসিক দীপু মাহমুদ তারই ব্যবচ্ছেদ করেছেন। নিদারুণ কষ্টের ভেতর দিয়ে যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে তীব্র এক দেশপ্রেম আর ভালবাসার টানে দিন গুজরান করছেন। মাতৃভূমি হারানো প্রতিশোধের তীব্র স্পৃহায় জেগে থাকা মানুষের ভেতরের সত্তার অনুরণন প্রতিফলিত হয়েছে এ উপন্যাসে।

নিজ দেশে নিজ ভূমিতে পরবাসীর মতো বসবাস করতে হয় যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তারই এক জাৎজল্যমান উদাহরণ পাওয়া যাবে এ উপন্যাসের প্রতিটি পর্বে। উপন্যাসটি পাঠ করলে শুধু কাল্পনিক কিছু দৃশ্য নয়, আপনার কাছে সত্য প্রতিভাত হবে অসুন্দরকে দুহাতে ঠেলে।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী আর মগ জাতির সন্ত্রাসীদের কর্তৃক সেদেশের রোহিঙ্গা নাগরিকদের ওপর অকথ্য নির্যাতন আর নিপীড়নের এক করুণ উপাখ্যান হিসেবে উঠে এসেছে ‘ভূমিরেখা’। উপন্যাসের ঘটনা পরম্পরায় দেখা যায়, ‘থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে নুরতাজ। তার সামনে বাড়ি পুড়ছে। আপন সংসার পুড়ছে। বর্মি মিলিটারি গ্রাম ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। নুরতাজের পেটে সন্তান নড়ে উঠেছে। সে বাঁচতে চায়। পৃথিবীর আলো দেখবে বলে আকুল হয়ে হাত-পা ছুড়ছে। নুরতাজ পেটে হাত দিয়ে বলল, ভয় পাস না। শক্ত হয়ে থাক। আমি তোকে বাঁচাব। আমি তো মা।

নুরতাজ বাড়ির পথ ছেড়ে ডানদিকে ছুটতে লাগল। পাহাড় ডিঙ্গিয়ে ওদিকে যেতে পারলে নাফ নদী। তার ওপাশে বাংলাদেশের শাহপরীর দ্বীপ। নুরতাজ পেট চেপে ধরে ছুটছে। নাফ নদী পেরুলে বাংলাদেশ। স্বাধীন এক দেশের ঠিকানা।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে নাফ নদীতে একসঙ্গে কয়েকটি নৌকা ভেসেছে। গর্ভে অনাগত সন্তান নিয়ে দেশছাড়া অন্যদের সঙ্গে নুরতাজ ভেসে চলল কোন এক অজানা গন্তব্যে। ‘ভূমিরেখা’ উপন্যাসের মূল কাহিনী এখান থেকেই শুরু কিংবা বলা যেতে পারে ‘ভূমিরেখা’ উপন্যাসটি এখানে এসে বাঁক বদল করে উপন্যাসের ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করেছে। মূলত ঔপন্যাসিক এখানে দেশহীন মানুষের তীব্র দেশপ্রেম আর ভালবাসার এক উপাখ্যান তুলে এনেছেন তার তুলির আঁচড়ে।

এখানেই শেষ নয় দেশহারা ভিটেছাড়া সন্তান পেটে নিয়ে যে নুরতাজ বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় শিবিরে আশ্রয় নেয়। সেখানে আহসান নামের এক যুবক নুরতাজকে প্রথম দর্শনেই মোহিত হয়। তার সহযেগিতায় নুরতাজ চিকিৎসা কেন্দ্রে এক পুত্র সন্তান প্রসব করে। আহসান নুরতাজের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাকে বিয়ে করতে চায়। তবে নুরতাজ সে প্রস্তাবে রাজি হয় না। স্বামী পরিজন হারানো নুরতাজের সামনে সুখের লালিত্য মাখানো অপার শান্তির হাতছানি, সামাজিক মর্যাদা, কোন কিছুই তাকে বেঁধে রাখতে পারেনি। এমন কি আহসানের বাবা-মার নুরতাজের সন্তানকে পরম মমতায় স্নেহের পরশে আবদ্ধ করে। তার পরেও নুরতাজ ঠিকই তার নিজ ভূমিতে ফিরে যাচ্ছে। যদিও সেখানে এক অনিশ্চিত ভয়াল জীবনের স্মৃতি তাকে হাতছানি দিয়ে ডাক দিচ্ছে। ফিরে যাওয়ার স্রেফ একটাই কারণ, প্রবল দেশপ্রেম আর নিজ ভূমির প্রতি মমত্ববোধ। সেটা হলো তার মা-মাটি আর মাতৃভূমির টান। পরদেশে কে আশ্রয় শিবিরে থাকতে চায়। তার তো আদি নিবাস আরাকান-বার্মা হয়ে আজকের মিয়ানমার।

ভূমিরেখা উপন্যাস শুরু হয়েছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংড় টাউনশিপের তুলাতুলি গ্রাম থেকে। শেষ হয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তঘেরা নাফ নদীর তীরে। উপন্যাসের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলার কুতুপালং শরণার্থী শিবির। কাহিনীর উপজীব্য বিষয় রোহিঙ্গা শরণার্থী মিয়ানমারের মংড় ও বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী মানুষের যাপিত জীবন। তবু ভৌগোলিক সীমারেখা ছাপিয়ে ‘ভূমিরেখা’ হয়ে উঠেছে প্রবল দেশপ্রেম আর ভালবাসার এক অনিন্দ্য সুন্দর উপাখ্যান।

কাহিনী বোঝার সুবিধার্থে উপন্যাসে কথোপকথন বর্মি বা মিয়ানমারের ভাষা কিংবা কথ্য চীনা-তিব্বতি বা তিব্বতি-বর্মি ভাষা ব্যবহার করা হয়নি। পাঠক বাংলা ভাষাভাষী হওয়ায় এখানে মুলগল্পে কথোপকথনে বাংলা ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। উপন্যাসে কাহিনীরস বা রসবোধের প্রয়োজনে বাংলাদেশের পাঠকের অভিজ্ঞতা প্রাধান্য পেয়েছে। উপন্যাসের শেষভাগের ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজার জেলার কুতুপালংয়ে। সহজেই সব পাঠকের কথা বিবেচনা করে ঔপন্যাসিক সহজভাবে সংলাপগুলো আঞ্চলিক ভাষার পরিবর্তে প্রমিত বাংলা ভাষা ব্যবহার করেছেন। যা তিনি তার উপন্যাসের পূর্ব কথনে ব্যাখা দিয়েছেন।

উপন্যাসের কাহিনীর শুরুতে যে একটি গোষ্ঠী মিলিটারি ক্যাম্পে হামলা করেছিল। তারই জের আজকের এই রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে বিতাড়ন, পরদেশে শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয়। জান-মাল হারানো মানুষের করুণ আর্তির ভয়বহ বর্ণনা এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য বিষয় হয়ে উঠে এসেছে।

আসলে এটি একটি সম্পূর্ণ উপন্যাসে রূপলাভ করেছে তখনই, যখন রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসেবে নুরতাজসহ লাখো লাখো মানুষের আশ্রয় প্রার্থনার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের মানবতার দিকগুলোও তুলে ধরা হয়েছে। আবার উপন্যাসে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নাগরিকদের যেভাবে পাস দেয়ার মাধ্যমে এক গ্রামের লোককে অন্য গ্রামে যাতায়াতে বিধিনিষেধ আরোপ, বিনা কারণে যখন-তখন পুরুষদের ধরে নিয়ে নির্যাতন করা, হত্যা গুম করা। মহিলাদের গণধর্ষণ, শিশু ও নারীদের হত্যা করা এসবই উপন্যাসে ঘটনা পরম্পরায় উঠে এসেছে। রোহিঙ্গা নারীদের ঘন ঘন সন্তান ধারণের বিষয়টি কথোপকথনে ঔপন্যাসিক জানান দিয়েছেন, নারীরা গর্ভবতী থাকলেই কেবলমাত্র মেলিটারিদের ধর্ষণের হাত থেকে রেহায় পায়। অন্যথায় তাদের জোর করে ধরে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। এ কারণেই রোহিঙ্গা নারীরা ঘন ঘন সন্তান ধারণ করেন। আবার মগরা কৌশলে গর্ভবতী নারীদের এবরসন করানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করে, কোন কোন ক্ষেত্রে চালাকির আশ্রয় নিয়ে তাদের এবরসন করায়। এসব ঘটনার বর্ণনার মধ্য দিয়ে ঔপন্যাসিক পাঠককে সেখানকার বাস্তবতার খানিক ছোঁয়া দিতে পেরেছেন। যা থেকে একজন পাঠক উপন্যাস পাঠের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকার সামাজিক, রাজনৈতিক দৈন্যদশার স্বচ্ছ একটি চিত্র পেয়ে যাবেন।

পরিশেষে এ কথা বলতেই হবে ‘ভূমিরেখা’ একটি সার্থক উপন্যাস। সত্য কাহিনীকে ধারণ করে প্রকৃত ঘটনার কাছাকাছি হলেও যে চিত্র উপন্যাসিক তার চিত্রকল্পে এঁকেছেন, তা পাঠক হৃদয় ছুঁয়ে যাবে বলেই আমার বিশ্বাস। সুন্দর বাঁধাই, ঝকঝকে ছাপা আর নজরকাড়া প্রচ্ছদই বলে দিচ্ছে ভেতরের কাহিনী পাঠককে কাছে টানবে। উপন্যাসটির ব্যাপক প্রচার ও পাঠকপ্রিয়তা প্রতাশা করছি।

আনোয়ার কামাল