২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এক চলন্ত বিশ্বকোষ

  • হাসান আইবদুল কাইয়ূম

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ আমাদের জ্ঞানরাজ্যে এক অনন্য কিংবদন্তি মহাপুরুষ। তিনি বলতেন, আমার ইচ্ছে হয় আমি নিজেকে স্বামী জ্ঞানানন্দ উপাধিতে ভূষিত করি। জ্ঞান চর্চাতেই ছিল তার আনন্দ। তিনি নানা খেতাবে ভূষিত হয়েছেন। তাকে বলা হয় চলিষ্ণু বিদ্যাকল্পদ্রুম অর্থাৎ চলন্ত বিশ্বকোষ। পৃথিবীর তাবত জ্ঞানরাজ্যে তিনি অবাধে বিচরণ করেছেন, ২৪টি ভাষা তিনি আয়ত্ত করেছেন, ১৮টি ভাষার ওপর তার অসাধারণ পা-িত্য ছিল। এমন জ্ঞানীপুরুষ, এমন বহুভাষাবিদ প-িতজন পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। পৃথিবীর নানা ভাষা নিয়ে তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। ভাষা বিজ্ঞানের দুরূহ অঙ্গনে যেখানে অন্য প-িতজনেরা বিচরণ করতে সাহস পাননি কিংবা বিচরণ করতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন, সেখানে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ নির্দ্বিধায় বিচরণ করেছেন এবং ভাষায় যে কত রহস্য রয়েছে, কত যে শব্দের ব্যঞ্জনা রয়েছে তা নির্ণয় করেই তিনি ক্ষান্ত হননি, একজন ঝানু শিকারির মতো এই জ্ঞান শিকারি ভাষা ও শব্দের এবং বিভিন্ন ভাষার উচ্চারণ ও ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য উদ্ধার করে তার সমস্যা খুঁজে বের করেছেন, সেই সঙ্গে শব্দের মারপ্যাঁচ নিরূপণ করে তার সমাধান করেছেন। ভাষা ও সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে তিনি এক অপরূপ নতুন মাত্রা সংযোজন করে বাংলা সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে এক সুরম্য সড়ক নির্মাণ করেছেন। বিভিন্ন ভাষার শব্দ মূল নির্ণয়ে, এক ভাষার শব্দের সঙ্গে অন্য ভাষার শব্দের মিল খুঁজে বের করতে তার মতো পারঙ্গম মনীষী আর দৃষ্ট হয় না। বাংলা, ইংরেজী, আরবী, উর্দু, ফারসী, ফরাসী, জাপানী, চাইনিজ, তামিল, তেলেগু, মারাঠী, জার্মান, কানাড়ী, মালায়ালম, হিন্দী, বেদনাগড়ী, প্রাকৃত, সংস্কৃত তুর্কী, অহমীয়া, উড়িয়া, লাটিন প্রভৃতি কত ভাষাই না তিনি জানতেন। বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষাগুলোর ওপরও তার ছিল সমান দক্ষতা। বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান তার এক অমরকীর্তি। বাংলা ব্যাকরণ রচনা করে তিনি এক্ষেত্রে এক অনন্য অবদান রাখেন।

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ জ্ঞানের পরিধি এত বিস্তৃত ছিল যে, বড় বড় প-িতরা তা পরিমাপ করতে গিয়ে রীতিমতো হতবুদ্ধি অবস্থায় নিপতিত হয়ে গেছেন। অনেকেই কোন জটিল শব্দের কিংবা বিষয়ের অর্থ খুঁজতে তার কাছে ধরনা দিয়েছেন অথচ তার কাছে সে সব শব্দ ও বিষয়ের অর্থ ছিল সাধারণ জ্ঞানের শামিল। তিনি জ্ঞানের সন্ধানে নানা ভাষার জ্ঞান সাগরে অবগাহন করে নিজেই জ্ঞানের মহাসাগরে পরিণত হয়েছেন। নানা ভাষার বই-পুস্তক, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, কবিতা, ব্যাকরণ তিনি নিত্যদিন অধ্যয়নে অভ্যন্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন বিশ্বস্ত পাঠক ও গবেষক। জ্ঞানের কোন কিছুই তার নাগালের বাইরে ছিল না। যারা তার সান্নিধ্যে গেছেন তারাই তার জ্ঞানের গভীরতা দেখে বিস্মিত হয়ে গেছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে তার ছাত্র না হয়েও তার সান্নিধ্যে গিয়ে অনেকেই তার ছাত্র বনে গেছেন কিংবা তার একনিষ্ঠ অনুরক্তে পরিণত হয়েছেন। মূলত ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ছিলেন এমন এক অতুলনীয় মনীষার অধিকারী যা তাকে জ্ঞান, কোন কিছু বোঝা ও ধারণা করার অসম্ভব শক্তি, ধীশক্তি ও বুদ্ধি বিবেচনা প্রভৃতির ক্ষেত্রে এক ঐতিহ্যিক মসনদে অধিষ্ঠিত করেছে। তাকে যেমন জ্ঞানের মহাসাগর বলা যায় তেমনি নির্দ্বিধায় তাকে জ্ঞানসম্রাটও বলা যায়। তিনি পৃথিবীর নানা ভাষা আয়ত্ত করে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। তার মাতৃভাষা প্রীতিই তাকে পৃথিবীর নানা জাতির মাতৃভাষার প্রতি আকৃষ্ট করেছে এবং সে সব ভাষা থেকে তথ্য সম্ভার, শব্দমালা বাংলা ভাষায় এনে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি বাংলা ভাষাকে তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারতের জাতীয় ভাষা এবং পরবর্তীকালে ভারত ভেঙ্গে মুসলমানদের আলাদা বাসভূমি হিসেবে উদ্ভাবিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে গ্রহণ করার আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটান। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনে প্রদত্ত সভাপতির ভাষণে দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি বলেন : বাংলা ভাষা চাই-ই। মুহম্মদ-ই বখতিয়ারের বাংলা জয়ের পরে যখন হইতে মুসলমান বুঝিল, এই চির হরিতা ফলশস্য-পুরতিা-নদ-নদীভূষিতা বঙ্গভূমি শুধু জয় করে ফেলে যাবার জিনিস নই, এ দেশ কর্মের জন্য, এ দেশ ভোগের জন্য, এ দেশ জীবনের জন্য, এ দেশ মরণের জন্য, তখন হইতে মুসলমান জানিয়েছে বাংলা চাই। তাই বাংলার পাঠান বাদশাহ্গণ বাংলা ভাষাকে আদর করিতে লাগিলেন। যে ভাষা দেশের উচ্চ শ্রেণীর অবজ্ঞাত ছিল, যা বাদশাহ্ দরবারে ঠাঁই পেল। নসবরৎ শাহ্, হোসেন শাহ্, পরাগল খাঁ, ছবি খাঁর নাম বাঙালী ভুলতে পারিবে না। বাদশাহ দেখাদেখি আমীর-ওমরাহ বাংলার খাতির করিলেন। আমীর-ওমরাহ দেখাদেখি সাধারণে বাংলা আদর করিল। গোড়া ব্রাহ্মণের অভিসম্পাত ও চোখ রাঙানীকে ভয় না করিয়া বাঙালী নবীন উৎসাহে তাহার প্রিয় ধর্ম পুস্তকগুলোকে বাংলায় অনুবাদ করিল, কত দেশ- প্রচলিত ধর্মকথা বাংলায় প্রকাশ করিল, কত মর্মগাঁথা বাংলায় প্রচার করিল। মুসলমানও চুপ করিয়া থাকে নাই। হিন্দুর রামায়ণ আছে, মুসলমানের জঙ্গনামা আছে। হিন্দুর মহাভারত আছে, মুসলমানের কাসাসোল আম্বিয়া আছে। হিন্দুর মহাজন পদাবলি আছে, মুসলমানের মারফতী আছে, হিন্দুর বিদ্যাসুন্দর আছে, মুসলমানের পদ্মাবতী আছে। এই পুঁথি সাহিত্যকে ঘৃণা করিলে চলিবে না। ইহাই বাঙালী মুসলমানের খাঁটি সাহিত্য।... যদি পলাশী ক্ষেত্রে বাংলার মুসলমানের ভাগ্য বিপর্যয় না ঘটিত, তবে হয়ত এই পুঁথির ভাষাই বাংলার হিন্দু-মুসলমানের পুস্তকের ভাষা হইত।

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বভারতীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ভারতের জাতীয় ভাষা কি হওয়া উচিত তা নিয়ে এক সেমিনারে তিনি নানা যুক্তি প্রমাণ উত্থাপনের মাধ্যমে বাংলা ভাষায়ই যে ভারতের জাতীয় ভাষা হওয়ার যোগ্যতা রাখে তা দৃঢ়তার সঙ্গে তুলে ধরেন। অথচ সভাপতির ভাষণে কবি রবীন্দ্রনাথ হিন্দীর পক্ষে বক্তব্য রাখেন।

১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ডক্টর জিয়াউদ্দিন আহমদ উর্দুকে আসন্ন পাকিস্তান রাষ্ট্রের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা উচিত হবে বলে এক প্রবন্ধে তার মতামত ব্যক্ত করলে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ দৈনিক আজাদে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে তার প্রতিবাদ জানিয়ে বললেন, বাংলাদেশের কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দু বা হিন্দী ভাষা গ্রহণ করা হলে এটা রাজনৈতিক পরাধীনতারই নামান্তর হবে।

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ জ্ঞানসাধক ভাষাবিদ যেমন ছিলেন তেমনি তিনি ছিলেন একজন সুফী দরবেশ। তার সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ডক্টর সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় বলেন, শহীদুল্লাহ সাহেব। ঐঁসধহরঃরবং বা মানবিকী বিদ্যায় অর্থাৎ ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, ধর্ম-দর্শন, আধ্যাত্মিকতার সাধন এবং রস অর্থাৎ শাশ্বত সত্তার মধ্যে নিহিত যে আনন্দের অনুভূতি এসব বিষয়ে একজন সর্বন্ধর আচার্যের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছেন। তিনি আজীবন জ্ঞানের সাধনা করে এসেছেন এবং ইসলামের সুফী সাধকগণের নির্দিষ্ট সাধনমার্গে আত্মিকতার উপলব্ধিও তার জীবনের অন্যতম প্রধান কাম্য হয়ে আছে। তিনি একজন সংস্কারপুত চিত্তের মানুষ এরূপ মানুষই ঋঁষষ গধহ -পূর্ণমানব অথবা ইনসান-আল কামিল পদবিতে পৌঁছাবার পথে জয়যাত্রা করার যোগ্য।

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের ১০ জুলাই শুক্রবার পশ্চিম বাংলার চব্বিশ পরগনার বশিরহাট মহকুমার পিয়ারা গ্রামে এবং ইন্তেকাল করেন ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৩ জুলাই রবিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ৯ নম্বর কেবিনে। ঢাকার কার্জন হলের সন্নিকটে অবস্থিত ঐতিহাসিক মূসা মসজিদের পশ্চিম-উত্তর পাশে তার মাজার শরীফ রয়েছে। তিনি প্রচুর গ্রন্থ রচনা করেছেন, সম্পাদনা করেছেন, অনুবাদ করেছেন, পত্রিকাও সম্পাদনা করেছেন। তিনি শিক্ষকতা করেছেন যশোর জেলা স্কুলে (১৯০৮-৯), চট্টগ্রামের সীতাকু-ু হাই স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে (১৯১৫ খ্রিঃ) মাঝখানে বশিরহাটে ওকালতি করেছেন, তারপর আবার শিক্ষাঙ্গনে ফিরে এসেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে শরৎ কুমার লাহিড়ী গবেষণা সহায়ক হিসেবে। ১৯২১-৩৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে বহাল ছিলেন। মাঝখানে ১৯২২ থেকে ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আইন বিভাগে খ-কালীন অধ্যাপনা করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনাকালে ছুটি নিয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য ফ্রান্সে গমন করেন ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে।

সেখানকার সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ও ডিপ্লোফোন ডিগ্রী লাভ করে তিনি ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসে যোগদান করেন। সোরবোনে অধ্যয়নকালে ছুটির অবকাশে তিনি জার্মানিতে ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়েও অধ্যয়ন করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীকালে ১৯৪৪ পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ ও রিডার ছিলেন। তারপর বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ (১৯৪৪-৪৮), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও প্রফেসর (১৯৫২-৫৪), (১৯৫৩-৫৫ খ্রিস্টাব্দে) এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরাসী ভাষা বিভাগে খ-কালীন অধ্যাপনা, ১৯৫৫-৫৮ খ্রিস্টাব্দে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন। এ ছাড়াও বাংলা একাডেমি, উর্দু উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলা পঞ্জিকা সংস্কারেও তার অবিস্মরণীয় অবদান রয়েছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস ছিলেন (১৯৬৭-৬৯)। তার বিশাল সাহিত্যকর্ম রয়েছে, রয়েছে অসংখ্য মূল্যবান অভিভাষণ, প্রবন্ধ, নিবন্ধ।

তিনি হাফিজ, ওমর খৈয়াম, গ্যেটে প্রভৃতিসহ বহু অনুবাদ করেছেন। বাংলা ভাষা যে সংস্কৃত ভাষার দুহিতা নয় সেটা তিনিই প্রমাণ করেন। তার রচিত শতাধিক গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে : বাংলা সাহিত্যের কথা, বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, শেষ নবীর সন্ধানে, ইসলাম প্রসঙ্গ, কুরআন প্রসঙ্গ প্রভৃতি। তিনি কুরআন মজিদের অনুবাদও করেন। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ আমাদের জাতিসত্তা নির্মাণ, আমাদের ভাষা ও সাহিত্য উন্নয়নে, আমাদের শিক্ষা জগতকে সুসংহতকরণে এবং আমাদের স্বকীয়তাকে সমুন্নতকরণে প্রভূত অবদান রেখেছেন। তিনি সত্যিকার অর্থে মহা মনীষী, এক অসাধারণ জ্ঞানতাপস এবং জাতির পথনির্দেশক। তার জ্ঞান সম্ভারের কারণেই তিনি চলন্ত বিশ্বকোষ। সত্যিকার অর্থে তিনি ছিলেন মহা মনীষী পীরে কামিল।