২২ আগস্ট ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মহাসঙ্কটে পাকিস্তান

২৫ জুলাই অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সঙ্কট আরও ঘনীভূত হয়ে উঠেছে। শুক্রবার বিকেলে বেলুচিস্তান প্রদেশের মাস্তুং জেলার একটি নির্বাচনী জনসভায় ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ওই হামলায় বেলুচিস্তান আওয়ামী পার্টির (বিএপি) প্রার্থীসহ নিহতের সংখ্যা ১৩৩। আহত দেড় শতাধিক। অন্তত ২০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আইএস এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। এর আগে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আকরাম খান দুররানির গাড়িবহর লক্ষ্য করে চালানো হয় বোমা হামলা। প্রদেশের বান্নু জেলায় এই হামলায় দুররানি বেঁচে গেলেও নিহত হন ৪ জন এবং আহত হন ৩২ জন। গত বৃহস্পতিবার রাতে বেলুচিস্তানের খুজদারে বিএপির নির্বাচনী কার্যালয়ের কাছে বোমা বিস্ফোরণে আহত হন দুজন। ১০ জুলাই পেশোয়ারে আত্মঘাতী বোমা হামলায় আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টির নেতাসহ নিহত হন অন্তত ২০ জন। হামলার ধরন ও ধারাবাহিকতা দেখে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, আগামীতে এ ধরনের হামলা আরও ঘটবে, যা দেশের গণতন্ত্র, নির্বাচন ও স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করে তুলতে পারে।

অন্যদিকে একই দিন রাতে দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ ও তার মেয়ে মরিয়ম নওয়াজকে দেশে ফেরার পরই গ্রেফতার করা হয়েছে। ন্যাশনাল এ্যাকাউন্টিবিলিটি ব্যুরোর (এনএবি) কর্মকর্তারা পাসপোর্ট জব্দসহ গ্রেফতার করেন তাদের। উল্লেখ্য, পানামা পেপারস রিপোর্টে তাদের নামসহ লন্ডনে বিলাসবহুল একাধিক ফ্ল্যাট কেনা সংক্রান্ত দুর্নীতি মামলায় ৬ জুলাই নওয়াজকে ১০ বছর এবং মরিয়মকে ৭ বছরের কারাদ- প্রদান করে পাকিস্তানের এ্যাকাউন্টিবিলিটি কোর্ট। একই মামলায় নওয়াজের জামাতা এখন কারাগারে। এ নিয়ে সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে নওয়াজের দল পিএমএলের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর ক্ষোভ-বিক্ষোভসহ সংঘাত-সংঘর্ষেরও আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালত নওয়াজ শরীফকে রাজনীতিতে অযোগ্য ঘোষণা করে রায় দিয়েছে। গ্রেফতারসহ হুমকি-ধমকি মোকাবেলা করেই দেশে ফেরার প্রাক্কালে নওয়াজ লন্ডনে এক জনসভায় বলেন, ‘এর আগে আমরা প্রায়ই বলতাম, রাষ্ট্রের ভেতর রাষ্ট্র, এখন এটা রাষ্ট্রের ওপর রাষ্ট্র।’ এর মাধ্যমে নওয়াজ প্রকারান্তরে সেনাবাহিনী ও আইএসআইয়ের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে যে, পাকিস্তানের রাজনীতির আকাশে আবারও সমূহ সঙ্কট ঘনীভূত হয়ে উঠেছে। ১৯৭৩ সালের পর পাকিস্তানী জেনারেলরা প্রত্যক্ষভাবে ২০ বছর দেশ শাসন করেছে এবং জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাঁচ বছরের কিছু বেশি সময় (জানুয়ারি ১৯৭২ থেকে জুলাই ১৯৭৭) ছাড়া অন্য সময় ক্রীড়নকের ভূমিকা পালন করেছে পেছন থেকে। এও সত্য যে, পাকিস্তানের ১৯৭৩ সালের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬ এবং অষ্টাদশ সংশোধনী অনুযায়ী সংবিধান বাতিলের ক্ষেত্রে কঠোর রাষ্ট্রদ্রোহের শাস্তি, এমনকি মৃত্যুদ-ের বিধান রাখা হয়। তাই সংবিধান স্থগিত করে সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ বা ক্ষমতা দখল আপাতত সম্ভব নয় বিধায় বারবার দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সরকার পরিবর্তনের এহেন অভিনব বিচারিক পন্থা। উল্লেখ্য, এর আগে প্রায় সব নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও আনা হয়েছে দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে দুর্নীতির অভিযোগ। প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টারি রাষ্ট্র ব্যবস্থার সঙ্গে কখনই সমন্বিত করা হয়নি। ফলে শক্তিশালী সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরকারের দূরত্ব ও ভুল বোঝাবুঝি বরাবরই পরিলক্ষিত হয়েছে।

নওয়াজ শরীফের গ্রেফতার এবং নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার মধ্য দিয়ে একটি বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, বর্তমান বিশ্বে দুর্নীতি করে কেউ পার পেতে পারে না। নওয়াজ শরীফের গ্রেফতারের পর পাকিস্তানের পরিণতি ও নির্বাচনের কি হবে তা সে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তবে এ থেকে যে বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে তা হলো, সে দেশের সেনাবাহিনী তথা আইএসআই এবং তালেবান, আইএস, আল-কায়দা, জইশ-ই মোহাম্মদ, লস্কর-ই-তৈয়বাসহ নানা জঙ্গীগোষ্ঠীর ব্যাপক সহিংস তৎপরতা জাতীয় নির্বাচনসহ পকিস্তানের ভবিষ্যতকেই অনিশ্চিত করে তুলেছে।