১৫ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আওয়ামী লীগকে হতে হবে সতর্ক

  • জাফর ওয়াজেদ

নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই অপপ্রচার, ষড়যন্ত্র এবং গণবিরোধী তৎপরতা-অপতৎপরতা বাড়ছে। ক্ষমতালোভী, সুযোগসন্ধানী ও ফন্দিবাজরা মাঠে নেমে পড়েছে নানা আঙ্গিকে, নানা চেহারায়। বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করে একটা অরাজক পরিস্থিতির বিস্তার ঘটাতে সচেষ্ট এরা। বাঙালীর সমস্ত অর্জনকে পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে যেভাবে বিপর্যস্ত করা হয়েছে, দেশকে ধ্বংসপ্রায় শুধু নয়, দরিদ্র, হতশ্রী অবস্থার দিকে ধাবিত করা হয়েছে। সে অবস্থাকে আবার ফিরিয়ে আনার জন্য গোপনে-প্রকাশ্যে তৎপর সেই গোষ্ঠী ও তাদের উত্তরসূরিরা। মাঝে মধ্যেই মনে হয়, এদেশের শিক্ষিত সমাজের একাংশের চিন্তা-ভাবনা দৃষ্টিভঙ্গি বিকারগ্রস্ত হয়ে ওঠায়, তাদের কার্যকলাপে বিকৃত মনোভাব ক্রমশ রাজনীতিকে গ্রাস করছে। যে কারণে দেশবিরোধী, রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতাকে গণতান্ত্রিক অধিকার বলে প্রচার করছে। সভা-সমাবেশ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় এই গোষ্ঠীগুলোর মূল লক্ষ্যই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত সুফলগুলো বিনষ্ট করে দিয়ে জাতিকে পঙ্গু করে তোলা। তাই নির্বাচন বর্জনকারীদের অপতৎপরতাকে অশুভ হিসেবে মূল্যায়ন না করে তাদের পক্ষাবলম্বন করে কণ্ঠ হাঁকাচ্ছে। গণমানুষের রাজনৈতিক দলের সমাজ ও আর্থিক উন্নয়নের দর্শন ও বাস্তবায়নের পথকে রুদ্ধ করে দেয়ার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। এরা রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদদের প্রতি উষ্মা-প্রকাশ করে প্রকারান্তরে গণবিরোধী ও প্রতিক্রিয়াশীলতাকে প্রশ্রয় দিয়ে আসছে। এই গণবিরোধীরা প্রয়োজনে বহিঃশত্রুকে ডেকে এনে নিজস্ব শক্তি বাড়াতে চায়। এদের উদ্দেশ্য যেমন সাধু নয়, তেমনি কর্মপন্থায় রয়েছে ভুল। তারা হিতে বিপরীত পরিস্থিতির নিয়ামক। এদের দুই হাতই ভাঙতে চায়, গড়তে চায় না। ভাঙ্গার হাতজুড়ে কেবলই নির্মমতা। সবকিছুর মধ্যেই এদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকট। ইতিবাচক কোন কিছুই এদের দৃষ্টিগোচর হয় না। তাই দেখা যায়, বাঙালী বংশোদ্ভূত এক মার্কিন অধ্যাপক এদেশে এসে রাজনীতির ছবক দিয়ে বোঝাতে চান, দেশে জটিল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। মানুষের বাকস্বাধীনতা নেই। উগ্র ধর্মান্ধ এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের পক্ষে কোন উচ্চবাচ্য না করে বরং মৌলবাদী শক্তির যে প্রসার ঘটছে, সেই কল্পকাহিনী প্রচার করে এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতির আবহ তৈরি করতে চান। ধর্মীয় চেতনার বিস্তার ঘটাতে দেশে ধর্মনিরপেক্ষ আবহ তৈরির বিপরীতে কথামালা সাজিয়ে তুলছেন। জামায়াত-শিবির যে মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত দেশকে পাকিস্তানী ভাবধারায় ফিরিয়ে নিতে স্বাধীনতার পরপরই সক্রিয়, সেসব প্রসঙ্গকে এড়িয়ে ধর্মান্ধগোষ্ঠী যে এদেশের চেতনাবিরোধী তা চেপে যাওয়ার প্রবণতাই দেখা যায়। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িকতার বিপরীতে পাকিস্তান পর্ব হতেই যে অবস্থান নিয়েছে, তার বিপরীতে মার্কিনী অধ্যাপক এদেশের ইসলামী ভাবধারার বাইরে রাজনীতি যে অচল। সে কথা বার বার বলে আসছেন যে, রক্ষণশীল ইসলামের বিকাশ ঠেকানো যাবে না বলে নানা যুক্তি উপস্থাপন করছেন। কিন্তু এ কথা বলা হয় না, লোকে কথায় কথায় যতই ধর্মের দোহাই পাড়ে, সত্যিকারের ধর্মবোধ ততই লোপ পায়। ধর্ম যে উদারতা দেখাতে পারে না বহু ধর্মের বসবাস যে দেশে, সেখানে একটি ধর্মশাসিত হওয়ার অর্থই অন্য ধর্মাবলম্বীর প্রতি অনুদারতা প্রদর্শন। ঐতিহ্য-অনুগত সনাতন সমাজ, সেও ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক অনেক নতুন জিনিসকে মেনে নেয়। একমাত্র ধর্মই ধর্মকথায় কান দেয় না। অর্থাৎ এক ধর্ম অপর ধর্মের কথা শোনে না। সে নিজের কথা অপরকে শুনিয়ে ছাড়বে। কিন্তু নিজে কারও কথাই শুনবে না। কোন ধর্মের যদি বিশেষ কোন আবেদন থাকে, তা হলে লোকে তাকে আপন তাগিদেই গ্রহণ করবে, তাকে জোর করে ঘাড়ে চাপাতে হয় না। কিন্তু ধর্মোন্মাদীদের মনে অত ধৈর্য নেই। তারা অশিক্ষিত সরলপ্রাণ মানুষদের ধর্মান্তর গ্রহণে প্ররোচনা দেয়। তাই নিয়ে বিরোধ বাধেÑ ঘটে লঙ্কাকা-। মার্কিন অধ্যাপক জানেন, কিন্তু বলেন না যে, অপর দেশের ভাষা শিখলে কেউ বিদেশী হয়ে যায় না। কিন্তু অপরের ধর্মগ্রহণ করলে বিধর্মী বিজাতীয় বলে পরিগণিত হয়। ইদানীংকালে ইসলামিক জোট বা আইএসের জঙ্গীরা নিজধর্মসহ ভিন্নধর্মাবলম্বীকে নিধনে কসুর করে না। আবার ইসলামের ধ্বজাধারী বলে নিজেদের জাহির করা যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামী বাঙালী হত্যা করেছে ধর্মের নামে, ধর্মীয় রাষ্ট্রের নামে, তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করে মার্কিন কূটনীতিকরা বলে আসছেন যে, এরা মডারেট ইসলামিক দল। এদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদর্শন করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র সেই কবে থেকেই। কিন্তু মার্কিন অধ্যাপক এদেশের ইসলামী নামধারী দলগুলোর প্রতি এক ধরনের সহানুভূতিই প্রদর্শন করে এমন মন্তব্যও করেছেন যে, এদেশে ইসলামকে বাদ দিয়ে রাজনীতির বিকাশ ঘটতে পারে না। কিন্তু বাস্তবতা কি তা বলে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধংদেহী কর্মকা-ের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মুসলমান সুশাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র শানিত করে আসছে। গণহত্যা চালানো হচ্ছে। আইএসের জঙ্গীবাদের যে বিস্তার ঘটেছে, তাতে বিশ্বের মুসলিম দেশগুলো যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, হচ্ছে। বাংলাদেশেও জঙ্গীবাদের উত্থান ঘটেছিল বিএনপি-জামায়াতের হাত ধরে। শেখ হাসিনার সরকার জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করলেও জঙ্গীবাদীদের পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। জনসচেতনতা বাড়লেও জঙ্গী তৈরির কারখানাগুলো লাগাতার কাজ করে যাচ্ছে। মাঝে মধ্যে সেসব কারখানায় হানা দিয়ে ধরপাকড় করা হলেও জঙ্গীদের অস্তিত্ব নিঃশেষিত হয়নি। বাঙালী আদতেই ধর্মান্ধ বা সাম্প্রদায়িক নয়। যে কারণে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে বাঙালী বসবাস করেনি। হেফাজতে ইসলামের ২০১৩ সালের গণবিরোধী তৎপরতা দেশবাসী ভালভাবে নেয়নি। অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে একটা অরাজক অবস্থায় দেশকে নিয়ে যাওয়ার জন্য যেসব ঘটনা ঘটিয়েছে, তা সরকার যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে। হেফাজতের গ্রহণযোগ্যতা সমাজে সেভাবে গড়ে উঠতে পারেনি। ধর্মে-ধর্মে বিরোধ এবং যুদ্ধবিগ্রহ আগেও অনেক ঘটেছে। সেসব ঘটেছে ধর্মান্ধতার ফলে। কিন্তু এ যুগের ধর্মীয় রাজনীতি অন্ধতাজাত নয়। বরং মতলবীদের কুমতলবের সৃষ্টি। সব দেখেশুনে, ভেবেচিন্তেই করা হয়। ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলে কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার ঘটতে পারে তার ভুক্তভোগী উপমহাদেশের মতো বাংলাদেশীরাও। ধর্ম এবং রাজনীতিতে জট পাকিয়ে গেলে যে অবস্থার সৃষ্টি হয় পাকিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। রাজনীতি বুঝে নিয়েছে যে সমাজদেহের সবচাইতে স্পর্শকাতর অর্থাৎ দুর্বলতম স্থানটি হলো ধর্ম। কোন বিষয়ের প্রতি সমাজকে উন্মুখ বা বিমুখ করে তুলতে হলে আবেদন জানাতে হবে ওই দুর্বল স্থানটিতে। অর্থাৎ মানুষের ধর্মবিশ্বাসের কাছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক আলী রীয়াজ এককালে এদেশে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য ‘লড়াই-সংগ্রাম’ করেছেন। তিনি ঢাকায় এক সেমিনারে বলেছেন, বাংলাদেশের সমাজে অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি, সহিংসতার ব্যাপক বিস্তারের যেসব ঘটনা প্রত্যক্ষ করছি; তা আগামীতে আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমরাও মনে করি, বিএনপি-জামায়াতসহ মৌলবাদীরা যেভাবে সমাজে অস্থিতিশীলতা তৈরিতে সক্রিয়, তা জঙ্গীবাদের বিস্তার ঘটাচ্ছে, এই জঙ্গীদের লক্ষ্য মুক্তিযুদ্ধের অর্জন ধ্বংস, মুক্তিযোদ্ধাসহ মুক্তচিন্তার মানুষকে হত্যা, সরকারকে উৎখাত করে খেমারুজ পলপটদের মতো গণহত্যাকারীদের ক্ষমতায় আসীন করে দেশকে ধর্মান্ধতায় আবদ্ধ করা। অধ্যাপক আলী রীয়াজ মনে করেন, দেশে ইসলামপন্থী রাজনীতি দুই ভাগে বিভক্ত। তুলনামূলক রক্ষণশীল এবং সংস্কারপন্থী। গত কয়েক বছরে তুলনামূলক সংস্কারপন্থী ধারা দুর্বল হয়েছে। এই পন্থীরা যে জামায়াত ও তদীয় মৌলবাদী দল তা পরিষ্কার। জনগণের ঘৃণা এদের প্রতি বর্ধিত হয়ে আসছে। আর রক্ষণশীল হিসেবে তিনি হেফাজতকেই ইঙ্গিত করেছেন। তার মতে রক্ষণশীলরা রাজনীতির এজেন্ডা নির্ধারণের মতো ক্ষমতা রাখেন। এদের প্রভাবের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে। মার্কিনী দৃষ্টিভঙ্গীতে তিনি এভাবেই দেখেন। অবশ্য দেশের জনগণ সেভাবে হয়ত দেখে না। রাজনীতিতে ধর্মান্ধতার বিস্তার ঘটুক দেশবাসী পাকিস্তান পর্বে যেমন চায়নি, একুশ শতকেও চায় না। যদিও ইসলামী নামধারী দলগুলো অর্থবিত্তের কারণে দেশের অশিক্ষিত জনগণের মধ্যে প্রভাব ফেলতে পেরেছে। দেশকে অস্থিতিশীল করা এবং সরকারের পতন ঘটাতে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে যে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করে আসছে, সে ব্যাপারে আওয়ামী লীগ এবং সরকার যে সতর্ক ছিল না; তা স্পষ্ট বোঝা যায়। দেশব্যাপী নানা ষড়যন্ত্র চলছে, অথচ দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নির্বিকার। দলে অনুপ্রবেশকারী অনেকের ভূমিকাই প্রশ্নবিদ্ধ। এরা ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকার বিস্তার ঘটাতে যাচ্ছে। সমস্যা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় স্তরে এমন নেতা নেই, যারা এসব ষড়যন্ত্রের বিষবাম্প উপড়ে ফেলে দলের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করতে পারে। এদের দুর্বলতার কারণে ষড়যন্ত্রকারীরা শক্তিমত্তা পায়। আগামী নির্বাচনে দলটি ক্ষমতায় আসতে না পারলে কি অবস্থা হবে সে সম্পর্কে ভীতি তৈরি করা হচ্ছে দলের পক্ষ থেকে। অথচ এর বিরুদ্ধে কিভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে, সে সম্পর্কে কোন নির্দেশিকা নেই।