২২ আগস্ট ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গ্রিনরোডের সেন্ট্রাল হাসপাতালের ভুল চিকিৎসায় এক শিশুর মৃত্যু অভিযোগ

গ্রিনরোডের সেন্ট্রাল হাসপাতালের ভুল চিকিৎসায় এক শিশুর মৃত্যু অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ রাজধানীর গ্রিনরোডের সেন্ট্রাল হাসপাতালের বিরুদ্ধে আবারও ভুল চিকিৎসা ও অবহেলায় আরিয়ান নামে ১৯ মাসের এক শিশু রোগীর মৃত্যু অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসায় অবহেলা ও অতিরিক্ত এ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ প্রয়োগে শিশু আরিয়ানের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার পর হাসপাতালে কর্মকর্তাদের উপর চড়াও ও ভাঙচুর করেন বিক্ষুব্ধ স্বজনরা।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মৃত শিশু আরিয়ানের বাবার নাম সাহাদাত হোসেন। গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী। রাজধানীর হাতিরপুল এলাকার ২৯/৩২ নম্বর বাড়িতে সপরিবারে বসবাস করেন। আরিয়ানের বাবা সাহাদাত হোসেনের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী সদরে। সাহাদাত হোসেন-আছিয়া খাতুন শিমু দম্পতির একমাত্র সন্তান আরিয়ানের জন্ম ২০১৬ সালের ২ ডিসেম্বর। ব্যবসায়ী সাহাদাতের একমাত্র সন্তান ছিল আরিয়ান। আরিয়ানের চাচা শহীদ এলাহী জানান, বুধবার থেকে জ্বর ছিল ভাতিজা আরিয়ানের। জ্বর না কমায় পরদিন বৃহস্পতিবার রাতে গ্রিন রোডে সেন্টাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শিশু বিশেষজ্ঞ সুজিত কুমার রায়ের অধীনে পেডিয়াট্রিক ইউনিটের শিশু ওয়ার্ডে তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়। আরিয়ানের রক্ত পরীক্ষা করে দেখা যায়, প্লাটিলেটের উপস্থিতি ৭৬ হাজার। চিকিৎসা চলাকালীন সেটি দাঁড়ায় ১ লাখ ২২ হাজার। শনিবার সকাল থেকে শিশু আরিয়ানের অবস্থার অবনতি হতে থাকে। দুপুরে অবস্থা আরও খারাপ হয়। ওই সময় চিকিৎসকদের ডাকাডাকি করলে কেউ সাড়া দেননি। শহীদ এলাহী অভিযোগ করেন, ওইদিন বিকেলের দিকে মারা যায় আরিয়ান। নিহতের চাচা জানান, রাতে আরিয়ানকে ২৫০ মিলিগ্রামের সাপোজিটার দেয়া হয়। এরপর থেকে অস্বস্তি শুরু হয় আরিয়ানের। চোখমুখ কালো বর্ণ ধারণ করে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলে তার ডেঙ্গু হয়েছে। কিন্তু ডেঙ্গুর জন্য যে ধরনের চিকিৎসা দরকার ছিল। তা তাকে দেয়া হয়নি। অবস্থার অবনতির বিষয়টি বারবার জানানোর পরও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গুরুত্ব দেয়নি। বরং মারা যাওয়ার পর আরিয়ানকে এনআইসিইউ বিভাগে নেয়া হয়। মৃত শিশু আরিয়ানের বাবা ব্যবসায়ী সাহাদাত হোসেন অভিযোগ করেন, এখন ভাই কথা বলার মতো অবস্থায় আমি নেই। আমার আরিয়ানকে জীবিত এনে মৃত অবস্থায় বাসায় নিয়ে যাচ্ছি। শুধু বলে রাখছি, ওরা আমার আরিয়ানকে মেরে ফেলেছে। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে বাবা সাহাদাত হোসেন বিলাপ করছিলেন।

এ সময় তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, যে ডাক্তারের অধীনে আরিয়ানকে ভর্তি করা হয় সেই ডাক্তার সুজিত কুমার রায়কেও বারবার ডেকে পাওয়া যায়নি। আমার আরিয়ানের অবস্থা যখন খুব খারাপ তখন ডিউটি ডাক্তার ফোনে কথা বলায় ব্যস্ত। আর ওরা আমাদের আরিয়ানের কষ্ট বোঝেনি। ওরা চিকিৎসক না খুনি। ওরা কসাই।

আরিয়ানের আকস্মিক মৃত্যুর সংবাদে পরিবারের মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হাসপাতাল ও ধানমন্ডি থানার সামনে আহাজারি করেন আরিয়ানের স্বজনরা। ঘটনার পর হাসপাতালের পঞ্চম তলার ৬০৯ নং ডাক্তারদের বসার কক্ষের গ্লাস ভাঙচুর করেন বিক্ষুব্ধ স্বজনরা। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দুটি গেট আটকে দেয়। খবর পেয়ে ধানমন্ডি থানা পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। ধানমন্ডির থানার ওসি আব্দুল লতিফ বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। পরে আরিয়ানের পরিবার মরদেহ নিয়ে চলে যায়। তারা অভিযোগ দিলে মামলা হবে।

এদিকে কর্তব্যে অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার অভিযোগ অস্বীকার করেছে সেন্ট্রাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সেন্ট্রাল হাসপাতালের উপ-পরিচালক (এডমিন) ডাঃ মোজাহের হোসেন বলেন, আরিয়ানের মৃত্যু কর্তব্য অবহেলা কিংবা ভুল চিকিৎসায় হয়নি। ডাক্তাররা দেখেছে, অবস্থার অবনতি হওয়ায় এনআইসিইউতে নেয়া হয়েছে। সেখানেই রবিবার বিকেল সাড়ে ৫টায় মারা যায় আরিয়ান। তিনি বলেন, আরিয়ানের ডেঙ্গু জ্বর হয়েছিল। ক্লাসিকেল ডেঙ্গু চিকিৎসায় যে ব্যবস্থা নেয়া দরকার। চিকিৎসকরা তা নিয়েছিলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানান, এর আগে গত বছরের ২৪ জুন ভুল চিকিৎসায় শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে সেন্ট্রাল হাসপাতালের বিরুদ্ধে। বিষয়টি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের হাতাহাতিও হয়। জন্ডিস রোগে শিশুটির চিকিৎসা চললেও ডেথ সার্টিফিকেটে বলা হয়, সে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছিল। পাশাপাশি তার হার্টের একটি এক্সরে রিপোর্টও সংযুক্ত করা হয়। এছাড়া গত বছরের ১৮ মে সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় মারা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী আফিয়া জাইন চৈতি। ওই ঘটনায় হাসপাতালে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ভাঙচুর চালায়। পরে অভিযুক্ত তিন চিকিৎসককে আটক করে ধানমন্ডি থানা পুলিশ। ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেও চৈতিকে দেয়া হয় ক্যান্সারের চিকিৎসা। ডাক্তাররা বলেছিলেন, আফিয়ার লিউকেমিয়া (ব্ল্যাড ক্যান্সার) হয়েছে। সেই অনুযায়ীই তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। তবে মৃত্যুর আগে জানানো হয় ক্যান্সার নয়। ডেঙ্গু হয়েছিল। পরে সেন্ট্রাল হাসপাতালের বিরুদ্ধে অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে চিকিৎসকসহ সেন্ট্রাল হাসপাতালের ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।