১৫ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ফরাসী চমক দেখল ফুটবল বিশ্ব

ফরাসী চমক  দেখল ফুটবল বিশ্ব
  • ফ্রান্সের বিশ্বজয় ক্রোয়েশিয়ার হৃদয় জয়

জিএম মোস্তফা ॥ সাফল্যের সঙ্গেই সমাপ্তি ঘটল রাশিয়া বিশ্বকাপের। দীর্ঘ এক মাসের যুদ্ধ আর ৬৪ ম্যাচের রোমাঞ্চ যেন উত্তেজনায় ভাসিয়ে রেখেছিল গোটা ফুটবল দুনিয়াকে। রবিবার সেই উন্মাদনার সমাপ্তি টানল ফ্রান্স-ক্রোয়েশিয়ার ম্যাচ। তবে প্যারিসে এখনও উৎসব চলছে। বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি বলে কথা। তাও আবার দীর্ঘ দুই দশক পর। ফ্রান্সকে যা উপহার দিয়েছেন এমবাপে-গ্রিজম্যান-পোগবারা। এমন শিরোপা জয়ের উত্তেজনা কী আর খুব সহজে থামে? ফাইনালে ওঠে ফ্রান্সের কাছে হেরে তীরে এসে তরী

ডুবেছে ক্রোয়েশিয়ার। তারপরও আনন্দে-উল্লাসে মাতোয়ারা দেশের মানুষ। এ যাবতকালের ইতিহাসে এবারই যে প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলে ক্রোয়েশিয়া।

বিশ্বকাপ শুরুর আগে এর সাফল্য নিয়ে সংশয় ছিল অনেকেরই। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার রাজনৈতিক সংঘাতই হোক, কিংবা খেলার মাঠে জঙ্গী হামলার হুঁশিয়ারি, খেলা শুরুর আগে মস্কোর পরিবেশ মোটেই সুখকর ছিল না। বিদেশ থেকে আসা সমর্থকদের অনেকেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। কেউ কেউ আশঙ্কা করছিলেন বর্ণবিদ্বেষের শিকার হওয়ার। সেসব আশঙ্কা ছুড়ে ফেলে নির্বিঘেœই উতরে গেল রাশিয়া বিশ্বকাপ। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্টিনিও সফল আয়োজক হিসেবে রাশিয়ার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে এটাই এ যাবতকালের ইতিহাসের সেরা বিশ্বকাপ। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘২০১৮ বিশ্বকাপ প্রমাণ করেছে সত্যিই রাশিয়া ফুটবলের দেশ। ইতিহাসের সেরা আয়োজন করেছে তারা। দর্শক মাতিয়েছে এ আসর। আর তাই সবার মুখে মুখে এখন শুধু রাশিয়া, রাশিয়া, রাশিয়া! আমি আগেই জানতাম রাশিয়া ইতিহাস সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। এখন আরও জোর দিয়ে বলছি, রাশিয়া রেকর্ড গড়েছে।’

গোটা বিশ্বের প্রশংসা পাওয়ায় তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। তিনি বলেন, ‘সমর্থকরা দুর্দান্ত খেলা উপভোগ করেছেন। এর জন্য তারা অনেক খুশি। সে জন্য আমাদের আয়োজনকারীদের প্রচেষ্টার প্রশংসা করায় আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এত বড় একটি আয়োজনে সফল হয়েছি। দর্শকরা আমাদের দেশে এসে খেলা দেখেছেন। তারা আমাদের আতিথেয়তা এবং উন্মুক্ততা, প্রকৃতি, সংস্কৃতি কিংবা ঐতিহ্যে মুগ্ধতায় ডুবে ছিলেন। তারা অনুভব করতে পেরেছেন আমরা খুব ভাল আয়োজন করেছি। এ জন্যই তারা অনেক প্রশংসা করছেন।’ বিদেশী সমর্থকদের জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করেন উৎফুল্ল রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট। যে সব বিদেশী ফুটবল সমর্থকদের ফ্যান আইডি রয়েছে তারা এ বছরের শেষ পর্যন্ত আর কোন ভিসা ছাড়ায় রাশিয়ায় প্রবেশ করতে পারবেন।

রাশিয়া বিশ্বকাপকে সাফল্যম-িত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ফ্রান্স। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই নজরকাড়া পারফর্মেন্স উপহার দিয়েছে তারা। গতিশীল ফুটবল খেলে ফেবারিট হয়ে আসা আর্জেন্টিনা, বেলজিয়াম এবং ফাইনালে অপ্রতিরোধ্য ক্রোয়েশিয়াকেও হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে দিদিয়ের দেশমের শিষ্যরা। বয়স বিবেচনায় রাশিয়া বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ দল ফ্রান্স। রবিবার ফাইনালেও ছয় গোলের রোমাঞ্চকর ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াকে বিধ্বস্ত করে ১৯৯৮ সালে প্রথমবার বিশ্বজয় করা ফ্রান্স। সেইসঙ্গে নতুন এক ইতিহাসও গড়েছে ফ্রান্স। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ দল নিয়ে বিশ্বজয় করেছে অঁরি-জিদানের উত্তরসূরিরা। তাদের আগে ১৯৭০ বিশ্বকাপে সর্বকনিষ্ঠ দল নিয়ে বিশ্বজয় করেছিল সেলেসাওরা। রাশিয়ার মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ক্রোয়েশিয়াকে পরাজিত করে আর্জেন্টিনা-উরুগুয়ের রেকর্ডেও ভাগ বসিয়েছে ফ্রান্স। এই তিনটি দলই এখন বিশ্বকাপে দুইবার করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। শুধু তাই নয়, ষষ্ঠ দেশ হিসেবে এক বা তারও বেশি সময় বিশ্বজয়ের রেকর্ডও এখন গ্রিজম্যান-এমবাপেদের। এই তালিকায় সবার আগে রয়েছে ব্রাজিল। সর্বোচ্চ পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন তারা। চারবার করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কীর্তি রয়েছে ইতালি, জার্মানির। দুবার করে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে এবং আর্জেন্টিনা।

অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিশ্বের প্রায় সব দেশই কঠোর হচ্ছে। ফ্রান্সও তার বাইরে নয়। দুই দশক ধরে দেশটিতে অভিবাসীদের রুখতে আইন ও শক্তিপ্রয়োগ করে যাচ্ছে ফ্রান্সের শাসকগোষ্ঠী। সেখানকার সমাজে অভিবাসীবিরোধী বীজ বুনে দেয়া হচ্ছে, অভিবাসীদের বিরুদ্ধে হিংসা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। অথচ ফ্রান্সের যে দলটি রাশিয়া বিশ্বকাপ জিতেছে, সে দলের কমপক্ষে ১৫ খেলোয়াড় আফ্রিকান বংশোদ্ভূত। এদের অনেকে নিজে অথবা তাদের পরিবার আফ্রিকা থেকে অভিবাসী হয়ে ফ্রান্সে এসেছিল। এমনকি এমবাপের পরিবারও আফ্রিকান অভিবাসী হিসেবে ফ্রান্সে এসেছে। স্যামুয়েল উমতিতি ক্যামেরুনে, স্টিভ মান্দানা কঙ্গোতে জন্মগ্রহণ করেছেন। পল পগবার বাবা-মা এসেছেন গিনি থেকে। এনগোলো কন্তের পরিবার এসেছে মালি থেকে। মাতুইদির বাবা-মায়ের জন্ম এ্যাঙ্গোলায়। প্রেসনেল কিমপেবে ও স্টিভেন এনজনজির বাবার জন্ম কঙ্গোতে। কোরেনটিন টলিসোর বাবা এসেছেন টোগো থেকে। এ তালিকা লম্বা হতেই থাকবে। বলতে গেলে অভিবাসীরাই ফ্রান্সকে বিশ্বকাপটা এনে দিল। যে অভিবাসীদের ওপর এত নির্যাতন, তারাই ফ্রান্সের ইতিহাসের অন্যতম সেরা গৌরবটি এনে দিল।

এদিকে, ফ্রান্সের কাছে হেরেও স্বপ্ন দেখতে শিখিয়ে গেল ফুটবলবিশ্বের বাজিগর ক্রোয়েশিয়া। প্রথমবারের মতো ফাইনালে ওঠেই চমক দেখিয়েছে তারা। পুরো টুর্নামেন্টে ভাল ফুটবল খেলে গোটা দুনিয়ার ফুটবল প্রেমীদের হৃদয়েই আলাদা করে জায়গা করে নিয়েছেন মডরিচ-মানদুকিচরা। ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট কোলিন্ডা কিতরোভিচও টুর্নামেন্টের শুরু থেকে সক্রিয় ছিলেন। ফুটবলের প্রতি তার ভালবাসায় মুগ্ধ বিমোহিত হয়েছে গোটা বিশ্বের ক্রীড়ামোদিরা।