১৫ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ তাসাওউফ অর্জন করা জরুরী

  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

ইন্নাদ্ দীনা ইন্দাল্লাহিল ইসলাম- নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট জীবন ব্যবস্থা হচ্ছে ইসলাম। সূরা আল ইমরানের উনিশ নম্বর আয়াতের এই বাণীতে এটা সুস্পষ্ট হয়েছে যে, ইসলামই আল্লাহ্ প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থা। আমরা আচার-অনুষ্ঠানসর্বস্ব গতানুগতিক ধর্ম বলতে যা বুঝি ইসলাম কিন্তু তা নয়। এ এক পূর্ণাঙ্গ ও প্রগতিশীল জীবন ব্যবস্থা।

ইসলামে জ্ঞান বিজ্ঞান দুই ভাগে বিভক্ত, আর তা হচ্ছে ইলমে জাহির ও ইলমে বাতিল। ইলমে জাহিরের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে ইলমে ফিক্হ। এতে আইনকানুন বিধিবিধান বিধৃত রয়েছে। কুরআন, হাদিস, ইজমা, কিয়াসের মাধ্যমে ইলমে ফিক্হ সমন্বিত হয়েছে ও শরীআতকে সুসংহত করেছে। এই শরীআতকে সমুন্নত রেখে আল্লাহ্্র নৈকট্য ও সন্তুষ্টি হাসিলের জন্য ইসলামে যে প্রামাণ্য বিজ্ঞান রয়েছে সেটাই ইলমে তাসাওউফ।

শরীআত, তরিকত হকিকত ও মারিফাতের সমন্বয়ে বিন্যাসিত এই তাসাওউফ বিজ্ঞান মূলত সমস্ত ইলমের আকর, এ এক অনন্য বিজ্ঞান। এই বিজ্ঞান অর্জন না করলে মানবিক মূল্যবোধের চূড়ান্ত গুণ অর্জিত হয় না। মানব জীবন সার্থক হয় না। যারা এই বিজ্ঞানকে অস্বীকার করে তাদের ইমাম মালিক রহমাতুল্লাহি আলায়হি ফাসিক বলেছেন। তিনি বলেন : মান তাফাক্্কাহা ওয়ালাম ইয়া তাসাওউফ ফাকাদ তাফাসসাকা। ইলমে তাসাওউফ এমন এক বিজ্ঞান যা যোগ্য পীরের তত্ত্বাবধানে অনুশীলনের মাধ্যমে বাহ্যিক, মানসিক, মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক অসঙ্গতি দূর করে নিজেকে পরিচ্ছন্ন মানুষে উন্নীত করা যায়, এমনকি ইনসানে কামিল বা পরিপূর্ণ মানুষে উন্নীত হওয়া যায়।

এই বিজ্ঞান মানবদেহের অভ্যন্তরে লুক্কায়িত বিভিন্ন সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম (লতীফা) মকাম বা স্থানগুলোকে বিশেষ পদ্ধতি (তরিকা) প্রয়োগের মাধ্যমে পরিষ্কার (সাফ) করে দেয়। ফলে সেগুলো নূরে নূরানী হয়ে নিষ্কলুষ উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হয়ে যায়। ওই আলোকিত মানুষরাই প্রকৃত মানুষ। তাদেরই কেবল আলোকিত মানুষ বলা যায়, তারাই সুফী, তাদের বলা হয় ওলীআল্লাহ্। এদের সম্পর্কেই আল্লা জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেছেন, আলা ইন্না আওলিয়াল্লাহি লা খাওফুন্্ আলায়হিম্্ ওয়ালা হুম্্ ইয়াহ্্জানুন- সবাই জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ ওলীগণের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না (সূরা ইউনুস : আয়াত ৬২)।

তাসাওউফ বিজ্ঞানের উন্মেষ ঘটে সেদিন যেদিন আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু নিজেকে প্রকাশ করলেন নূরে মুহম্মদী সৃষ্টি করার মাধ্যমে। নূরে মুহম্মদী সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি বিশ্ব জগত সৃষ্টির শুভসূচনা করেন। আধুনিক বিজ্ঞানের বিগ ব্যাং থিওরি যত পর্যালোচনা ও গবেষণা করা যাবে তত নূরে মুহম্মদী থেকে বিশ্ব জগত বিকশিত হওয়ার অকাট্য সত্যটি বোঝা যাবে, ইলমে তাসাওউফ অনুশীলনের প্রয়োজনীয়তাও উপলব্ধি হবে।

একজন কামালতপ্রাপ্ত সুফী মুরাকাবায় মগ্ন হয়ে অনেক কিছুই মুসাহাদা বা প্রত্যক্ষ করতে সমর্থ হন এবং অসাধ্য সাধন করতে পারেন আল্লাহর রহমতে।

ইল্মে তাসাওউফ অনুশীলনকারী জ্ঞানের-গভীর থেকে গভীরে প্রবেশ করে সত্যকে প্রত্যক্ষভাবে দেখেন, যার ফলে তার দর্শন বা দেখাটা বাস্তব দেখা হয়। সাধারণ দর্শন যেখানে যুক্তির মাধ্যমে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা প্রদান করে সেখানে একজন সুফী বা তাসাওউফ পথের পথিক চাক্ষুস দর্শনের অভিজ্ঞতার সত্যকে ব্যক্ত করেন।

প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মক্কা মুকারমার হেরা গুহায় দীর্ঘ মুরাকাবায় রত হওয়ার মধ্য দিয়ে দিনরাত অতিবাহিত করেন। তারপর আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু ফেরেশ্তা জিবরাঈলকে (আ) লওহে মাহফুজে সংরক্ষিত কুরআন মজীদ প্রিয় নবীর (সা) নিকট নাযিল করার জন্য নির্দেশ দেন। তিনি আল্লাহ জাল্লা শানুহুর নির্দেশে হেরা গুহায় এসে প্রিয় নবীকে (সা) তা পাঠ করতে বলেন। প্রিয়নবী (সা) বললেন : আমি তো পড়তে জানি না। এভাবে তিনবার কথাবার্তা হবার পর হযরত জিবরাঈল আলায়হিস্ সালাম তাঁকে বুকে চেপে ধরলে তিনি সূরা আলাকের পাঁচখানা আয়াতে কারিমা পাঠ করলেন। সেই সুতীব্র ফয়েজের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে-যা ইল্্মে তাসাওউফে সম্পৃক্ত হয়েছে।

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সেদিন যে পাঁচখানা আয়াতে কারিমা লাভ করলেন, সর্বপ্রথম যে ওহীপ্রাপ্ত হলেন তাতে বিদ্যা অর্জনের তাকিদই কেবল থাকল না, সেই সঙ্গে আল্লাহ্ জাল্লা শানুহুর পরিচয়, মানুষের সৃষ্টি রহস্য, লেখাপড়ার গুরুত্ব ও জ্ঞান চর্চার মাহাত্ম্য প্রস্ফুটিত হয়ে উঠল এবং তাতে এও রয়েছে যে, আল্লামা বিল্্ কালাম, ‘আল্লামাল ইনসানা মালাম ইয়ালাম-আল্লাহ্ মানুষকে কলম দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।

এই যে অজানাকে জানবার শিক্ষা আল্লাহ্্র নিকট থেকে আসে তা উপলব্ধি করার এবং প্রত্যক্ষ করার সামর্থ্য অর্জন করা যায় ইলমে তাসাওউফ অনুশীলনের মাধ্যমে। আর তা সম্ভব হয় ইলমে লাদন্নী লাভের মাধ্যমে। কথাগুলো দুর্বোধ্য প্রতীয়মান হলেও তাসাওউফ জগতে প্রবেশ করতে পারলে তখন তা দুর্বোধ্য থাকে না।

কুরআন মজীদে তাযকিয়ায়ে নফসের অর্থাৎ আত্মশুদ্ধির তাকিদ দিয়ে ইরশাদ হয়েছে : কাদ আফলাহা মান তাযাককা ওয়া যাকারাসমা রব্বিহী ফাসল্লাÑ নিশ্চয়ই সাফল্য অর্জন করে সে যে পবিত্রতা অর্জন করে এবং তাঁর বর-এর নাম যিকর করে ও সালাত আদায় করে (সূরা আ’লা : আয়াত ১৪-১৫)।

এই আত্মশুদ্ধির জন্য বেশি বেশি আল্লাহর যিকর করার ওপর বিশেষ তাকিদ দেয়া হয়েছে। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : প্রত্যেক জিনিসের মরিচা সাফ করার জন্য যন্ত্র আছে, কলবের মরিচা সাফ করার যন্ত্র হচ্ছে আল্লাহর যিকর।

কুরআন মজীদে তাযকিয়ায়ে নফসের গুরুত্ব আরোপ যেমন করা হয়েছে তেমনি হাদিস শরীফে একাগ্রচিত্তে আল্লাহ্কে হাজির-নাযির জেনে ইবাদত করার তাকিদ দেয়া হয়েছে।

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ইহ্সান সম্পর্কে বলেন : আন তা’বুদাল্লাহা কা আন্নাকা তারাহু ফা-ইন্্লাম তাকুন, তারাহু ফাইন্নাহু ইয়ারাকÑ আল্লাহ্্র ইবাদত করবে এমনভাবে যে, তুমি আল্লাহ্কে দেখছ। যদিও তুমি তাঁকে না দেখ, তিনি তো তোমাকে দেখছেনই।

এই একাগ্রচিত্তে ইবাদত করতে হলে রিপুসমূহ অর্থাৎ কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্যকে দমন করতে হবে। আর এগুলো দমন করতে হলে তরিকতের নিয়ম অনুযায়ী সবক রপ্ত করে কল্বকে সাফ করতে হবে।

ইলমে তাসাওউফে বেশ কয়েকটি তরিকা রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কাদিরিয়া তরিকা, চিশতিয়া তরিকা, নক্শবন্দিয়া তরিকা, মুজাদ্দিদিয়া আলিয়া তরিকা প্রভৃতি। এসব তরিকার প্রত্যেকটিতেই যিক্্র-আয্কার, মুরাকাবা-মুজাহাদা ইস্্তিগফার প্রভৃতির নিয়মকানুন, ক্রিয়া পদ্ধতি বিধিবিধান, শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা রয়েছে।

উল্লেখ্য, দৈহিক ও মানসিক পরিচ্ছন্নতা রুহানী তরক্কির জন্য অপরিহার্য। ইসলামের আইনসমূহের সমষ্টি হচ্ছে ইলমে ফিক্হ। এতে বাহ্যিক, দৈনন্দিন ও ব্যবহারিক জীবনযাপনের ব্যবস্থাদি এবং আইনকানুন একত্রিত ও সঙ্কলিত হয়েছে। ইলমে ফিক্হ হচ্ছে ইসলামের আইনশাস্ত্র। এর থেকে বাহ্যিক বিষয়ের বিধান ও আইনকানুন বিষয়ক তাবত শিক্ষা লাভ করা যায়। তেমনি মারিফাতে উপনীত হতে হলে শরিয়াতের ওপর কায়েম থেকে রুহানী পথ বা তরিকা ধরে হকিকতে পৌঁছে মারিফাত হাসিল করতে হয়। শরিয়াতকে বাদ দিয়ে মারিফাত হাসিল করা যায় না।

আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : তুমি একনিষ্ঠ হয়ে নিজেকে দীনে প্রতিষ্ঠিত কর। আল্লাহর ফিতরতের অনুসরণ কর, যে ফিতরত অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন (সূরা রুম : আয়াত ৩০)। একমাত্র তাসাওউফ চর্চার মাধ্যমে মানুষ নিজেকে ফিতরতের আলোয় উদ্ভাসিত করতে পারে। এই ইলমে তাসাওউফে রয়েছে শয়তানকে পর্যুদস্ত করে এবং রিপুসমূহকে কঠোরভাবে দমন করে পরিচ্ছন্নতার সৌরভে নিজেকে সুরভিত করার কার্যকর বিধি-ব্যবস্থা।

ইলমে তাসাওউফ অর্জন করতে হলে যোগ্য ও কামিল পীরের নিকট মুরিদ হয়ে তালিম তালকিন ফয়েজ তাওয়াজুহ গ্রহণ করতে হয়। পীর যদি কামিল না হন তাহলে মুরিদ হওয়াটা সার্থক হবে না। যুগশ্রেষ্ঠ সুফী কুতবুল আলম হযরত মাওলানা শাহ্ সুফী আলহাজ তোয়াজউদ্দীন আহমদ, রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেছেন : দালাল লাগিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে নানা ধরনের কলাকৌশল প্রয়োগ করে লোক জড়ো করা যায় বটে কিন্তু পীর হওয়া যায় না।

তাই পীরের নিকট মুরিদ হওয়ার আগে আসল-নকল বাছাই করে নিতে হবে। প্রকৃত পীরের কাছে মুরিদ হওয়া অত্যন্ত জরুরী। মানব জীবন বোধের ভেতরে ও বাইরে যে প্রকাশ্য জীবন ও রুহানী জীবন রয়েছে তার প্রতিটির পরতে পরতে যে গভীর সম্পর্কের বন্ধন রয়েছে সে বাঁধনে নূরের ছটা বিকিরণের জন্য ইলমে তাসাওউফ অর্জন করা অবশ্য কর্তব্য।

মানুষের দেহের ভেতরে যে দশটি লতিফা রয়েছে তা নির্ণয় করেছে ইলমে তাসাওউফ। সেগুলো হচ্ছে কল্ব, রুহ, সিরর, খফী, আখ্ফা, আব আতস, খাক, বাদ। এই লতিফাগুলোর প্রত্যেকটির অবস্থান দেহের মধ্যে নির্দিষ্ট স্থানে রয়েছে। এগুলোকে বিশুদ্ধ, কলুষমুক্ত ও জ্যোতির্ময় করার পদ্ধতিও রয়েছে ইলমে তাসাওউফে।

মূলত তাসাওউফবিহীন জীবন হচ্ছে সাগরের তলদেশে পড়ে থাকা পাথরের নুড়ির মতো কিংবা খুশবুবিহীন ফুলের মতো। যারা তাসাওউফ মানে না তারা ফাসিক আর যারা তাসাওউফের তা হরফেরও জ্ঞান রাখে না অথচ বড় বড় উপাধি-ধারণ করে পীর সেজে ফায়দা লুটছে তারা ভণ্ড।

লেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরীফ

উপদেষ্টা, ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা)

সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ