১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পোশাক শ্রমিকের মজুরি

শ্রমজীবী মানুষের দু’বেলা দু’মুঠো আহার যোগাড় করা সহজসাধ্য নয়। কঠোর পরিশ্রমের পরও মেলে না যথাযথ পারিশ্রমিক। অর্ধবেলা অনাহারে কাটে কারও কারও। আয়ের চেয়ে ব্যয়ভার বেশি হলে দুঃসহ অবস্থার সৃষ্টি হয়। ‘পরিশ্রমে ধন আনে প্রবাদ তাদের জীবনে যেন প্রযোজ্য নয়। উৎপাদনশীলতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত শ্রমিকরা। তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে মালিকরা মুনাফা লাভ করে। সে তুলনায় শ্রমিকরা ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প শ্রমিক আর বেসরকারী খাতের শ্রমিকদের পারিশ্রমিক বা বেতন-ভাতা এক নয়। অনেক ক্ষেত্রেই বৈষম্য থেকে যায়। বিদ্যমান বাজারে দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতির সঙ্গে বেতন-ভাতার সামঞ্জস্য না থাকলে শ্রমিকদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বেসরকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের অনেক মালিক কার্যকর পদপেক্ষ নিলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা কার্যকর হয় না। বর্তমান শ্রমিকবান্ধব সরকার চলতি বছর রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের মজুরি স্কেল ও ভাতা অনুমোদন করেছে। এ জন্য মজুরি কমিশনও গঠন করা হয়েছে। গত জানুয়ারিতে পোশাক খাতের শ্রমিকদের নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নে বিজিএমইএ মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি সমন্বয়ে মজুরি কমিশন গঠন করেছে। এই কমিটির পেশ করা নয়া বেতন কাঠামো অনুমোদন হয়েছে। তার আগে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। তিন হাজার টাকা মূল বেতন ধরে পাঁচ হাজার তিনশ’ টাকা ন্যূনতম মজুরি ঠিক করা হয়। ওই বেতন তারা পাচ্ছেন ২০১৪ সালের জানুয়ারি হতে।

গত কয়েক বছরের মূল্যস্ফীতিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর দাবি করা হচ্ছিল। শ্রমিক সংগঠনগুলো তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন ষোলো হাজার টাকা দাবি করছে। অপরদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) প্রস্তাব দিয়েছে দশ হাজার টাকা করার। তাদের মতে, অঞ্চল ভেদে পোশাক শ্রমিকদের ব্যয়ে তারতম্য রয়েছে। ঢাকার বাইরে গাজীপুরে জীবনযাত্রার ব্যয় সবচেয়ে বেশি। আর ঢাকার ভেতরেও ব্যয়ের ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। তাই মিরপুর আর তেজগাঁওয়ের শ্রমিকের বেতন এক হওয়া ঠিক নয়। বিদ্যমান মজুরি কাঠামোর গ্রেড ৭ বিলুপ্ত করে নতুন মজুরি কাঠামোতে গ্রেড ৬-এর ন্যূনতম মজুরি দশ হাজার ২৮ টাকা করা যেতে পারে বলে সিপিডি মনে করে। বেতন বাড়ানো হলে বাড়ি ভাড়াও বাড়বে। বড় ব্যয় বাড়বে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে। ৮৬ শতাংশ শ্রমিক এখনও টয়লেট এবং ৮৫ শতাংশ শ্রমিক রান্নাঘর শেয়ার করেন। ৪০ শতাংশ শ্রমিকের ঘরে কোন টেবিল-চেয়ার নেই। মাত্র পাঁচ শতাংশ শ্রমিক বেতন পায় মোবাইল বা ব্যাংকিং চ্যানেলে। অথচ এই শ্রমিকরা যে উৎপাদন করে তাতে একটি পোশাক পাঁচ ডলারে কিনে বায়াররা ২০ ডলারে বিক্রি করে। তাই পোশাক শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে শুধু মালিকরা নয়, বায়ারদেরও দায়িত্ব থেকে যায়।

মালিকদের সক্ষমতা ও শ্রমিকের ন্যায্যতা উভয়ই বজায় রেখে মজুরি নির্ধারণ প্রয়োজন। দেশের অর্থনীতিতে উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বড় সেক্টর পোশাক খাত। বর্তমানে এই সেক্টরে ৪৪ লাখ শ্রমিক কাজ করে। তারা যাতে তাদের জীবনযাপন সঠিকভাবে করতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। মহিলা শ্রমিকরা যাতে যৌন হয়রানির শিকার না হয় সেজন্য প্রতিটি কারখানায় সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন সব সময় দ্বৈতনীতি বহাল রাখে। মজুরি বাড়লে, শ্রমিকরা ভাল থাকলে উৎপাদন বাড়বে। উৎপাদন বাড়লে মুনাফা বাড়বে। মুনাফা বাড়লে বৈদেশিক আয় বাড়বে। প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো শ্রমিক সহায়ক হয়ে উঠুকÑ এটাই প্রত্যাশা।