২২ আগস্ট ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সড়ক দুর্ঘটনা ॥ ঘুরে ফিরে একই বৃত্ত

  • মিলু শামস

সড়ক দুর্ঘটনার শাস্তি হিসেবে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রেখে মন্ত্রিসভায় আইনের খসড়া উত্থাপন হয়েছে। আবার চালকের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হেলপার থেকে চালক হওয়ার পুরনো প্রক্রিয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। কদিন বাসের হেলপার হিসেবে কাজ করে স্টিয়ারিং, এক্সিলেটর, ব্রেক, গিয়ার ইত্যাদির সঙ্গে পরিচিত হলেই গাড়ি নিয়ে সোজা রাস্তায় নামার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠেছে। দুর্ঘটনার নায়ক বা ভিলেন হয়ে আবারও আলোচনায় তারা। দুর্ঘটনার অনুঘটক হিসেবে তাদের দিকেই থাকে অভিযোগের আঙ্গুল সব সময়।

সত্যিই কি সড়ক দুর্ঘটনার সব দায় চালকের? বেশিরভাগ দুর্ঘটনা হয়ত চালকের অদক্ষতার জন্যই হয়। কিন্তু অদক্ষ চালক স্টিয়ারিং ধরছে কেন? তাদের পেশাগত সঠিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না কেন? বছর তিনেক আগের এক জরিপে জানা যায়, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) বৈধ ছাড়পত্র নিয়ে সারাদেশে গাড়ি চালাচ্ছে নয় লাখ ষাট হাজার চালক। আর বৈধ ছাড়পত্রে গাড়ি চলছে চৌদ্দ লাখের বেশি। সরকারী হিসাবে অবৈধ চালক পাঁচ লাখের কাছাকাছি। বেসরকারী হিসাবে সংখ্যা আরও বেশি হবে নিঃসন্দেহে। বৈধ ছাড়পত্রহীন এসব চালকের একমাত্র ভরসা ‘ওস্তাদ’-এর কাছে শেখা বিদ্যা। আর এদের হাতে জীবন সঁপে আমরা রাস্তায় চলছি। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘটছে ভয়াবহ সব দুর্ঘটনা। দু’হাজার এগারোয় মীরসরাই ট্র্যাজেডি সড়ক পরিবহনের দুরবস্থা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল। চুয়াল্লিশ স্কুলছাত্রের মৃত্যুতে আলোড়িত হয়েছিল দেশ।

সেসময় প্রধানমন্ত্রীর কড়া নির্দেশে মীরসরাই ট্র্যাজেডির খলনায়ক ট্রাকচালক মফিজ গ্রেফতার হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু শাস্তি নিশ্চিত হয়েছিল কিনা তা জানা যায়নি। যদি হয়েও থাকে তাহলে বেঘোরে এত প্রাণ নষ্ট করার জন্য তার শাস্তি হয়েছে বড়জোর সর্বোচ্চ তিন বছরের জেল ও দশ হাজার টাকা জরিমানা। বাস মালিকের কিন্তু কিছু হয়নি। তাদের বিরুদ্ধে কখনও শাস্তি নেয়া হয়েছে এমন দৃষ্টান্ত নেই। চালকদের জেল হলেও বেশিরভাগ দুর্ঘটনায় চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে চালক জামিন পায়। সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত আইনেই এ সুযোগ রয়েছে। এ আইন পাস হয়েছিল ১৮৬০ সালে। এতে সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল সাত বছরের কারাদ-। ১৯৮৫ সালে এক অধ্যাদেশে তা প্রথমে পাঁচ এবং পরে তিন বছর করা হয়। একজন মারা গেলে চালকের যে শাস্তি এক শ’ জন মারা গেলেও তাই।

এরশাদ সরকারের সময় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- ও জামিন অযোগ্য ধারা যুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু চালকদের আন্দোলনের মুখে কয়েক মাসের মধ্যে শাস্তির ধারা বাতিল করে পুরনো ধারায় ফিরে যায়। একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে এরপর সাজার মেয়াদ আরও কমানো হয়। সে সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলে ড্রাইভিং শিখতে গিয়ে ছড়াকার বাপ্পী শাহরিয়ারকে আহত করে, পরে তিনি মারা যান, ছেলেকে বাঁচাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রভাব খাটান। এ প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি এক অধ্যাদেশ জারি করেন। তাতে সাজার মেয়াদ সাত বছর থেকে নামিয়ে পাঁচ বছর করা হয়। মাঝে এ মেয়াদ তিন বছর থাকলেও এখন আবার পাঁচ বছর হতে যাচ্ছে।

১৯৯২ সালে সাবেক এক মন্ত্রীর ছেলে রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়। নিজের ছেলেকে বাঁচাতে ওই মন্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনায় চালকদের শাস্তি কমানোর বিল উত্থাপন করেন এবং সংসদে বিল পাস হয়। দু’শ’ ঊনআশি ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি তিন বছর করা হয়।

ব্রিটিশ আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল দশ বছর সশ্রম কারাদ- ও জামিন অযোগ্য অপরাধ। এরশাদ সরকার এ শাস্তি বাড়িয়ে চৌদ্দ বছর করে। তখন পরিবহন শ্রমিকরা আন্দোলন করে শাস্তি পাঁচ বছরে নামায়। মন্ত্রীর ছেলের ঘটনা এর পরের। আগের আইনটি কেন ফিরিয়ে আনা হবে নাÑ তা জানতে চেয়ে উচ্চ আদালত থেকে একটি রুলও জারি হয়েছিল। মীরসরাই ট্রাজেডির পর ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের কর্ণধার ইলিয়াস কাঞ্চন এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, ‘এবারই প্রথম দেখলাম সড়ক দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী ঘটনাস্থলে গেলেন। অন্য কোন কারণে নয়, তাঁরা গেছেন কেবল রাজনীতি করতে। এটি সাধারণ মানুষ ভাল চোখে দেখে না। সড়ক দুর্ঘটনারোধে তাঁরা যদি এক হয়ে বর্তমান আইন বাতিল করতে পারেন, তাহলেই মানুষ তাঁদের সাধুবাদ জানাবে। আইন করতে গেলে কিছুটা সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। পরিবহন শ্রমিকরা ধর্মঘট ডেকে বসবে। তাদের ব্যবসার জন্য তারা রেলওয়েকে ধ্বংস করে দিয়েছে। বিআরটিসি বাস সার্ভিসও ধ্বংস করে দিচ্ছে। তাদের ভয় পেলে চলবে না। যেভাবে হোক তাদের রুখতে হবে। নয় মাস যুদ্ধ করে যদি আমরা দেশ স্বাধীন করতে পারি, এক মাস যুদ্ধ করে আমাদের সন্তানদের বাঁচাতে পারব না? বিকল্প ব্যবস্থা রেখে সরকারকে কঠিন ও যুগোপযোগী আইন করতেই হবে।’

কিন্তু শুধু আইন করেই কি দুর্ঘটনা বন্ধ করা যাবে? ব্রিটিশ আমলের আইনে গাড়ি চালানো অবস্থায় ইয়ার ফোন চালানো নিষেধ ছিল। সমসাময়িক বাস্তবতা বিবেচনা করে ১৯০৭ সালে বিআরটিএ আইনের ধারা সংশোধন করে ইয়ার ফোনের সঙ্গে মোবাইল ফোন ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। অমান্য করার শাস্তি এক মাসের কারাদ- অথবা পাঁচ শ’ টাকা জরিমানা অথবা দুই-ই। কিন্তু কে শুনছে কার কথা? গাড়ি চালাতে চালাতে সেল ফোনে কথা বলা এখন পরিচিত দৃশ্য।

গত দশ-বারো বছরে যানবাহন বেড়েছে চার গুণেরও বেশি। ১৯৯৫ সালে দেশে যানবাহন ছিল তিন লাখ পঁয়ষট্টি হাজার। ২০০৯ সালে তা বারো লাখ সত্তর হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে শতকরা আশি ভাগ গাড়ির ফিটনেস নেই।

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর আর্থিক ক্ষতি হয় বছরে সাত হাজার কোটি টাকার বেশি। সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে এ তথ্য পাওয়া যায়। ২০০৬ সালে পরিচালিত এদের আরেকটি প্রতিবেদনে ক্ষতির পরিমাণ পাওয়া গিয়েছিল এক শ’ ছিয়াত্তর কোটি টাকার।

বেশিরভাগ দুর্ঘটনায় মামলা হলেও ঠিকমতো তদন্ত হয় না। দুর্ঘটনার পর চালককে শনাক্ত করতে পারে না পুলিশ। করলেও অনেক সময়ই নেপথ্য কারণে ঘটনা চেপে যান তদন্ত কর্মকর্তারা।

ঝামেলা এড়াতে সাধারণত নিহতের পরিবার পুলিশের কাছে যায় না। মামলা করলেও তার খোঁজ রাখে না। তদন্তকারী কর্মকর্তারাও ছয় মাস-এক বছর ফাইলবন্দী রেখে মামলা তামাদি করে দেন। কখনও কখনও অজ্ঞাত আসামি এবং চালককে দায়ী করে এবং চালকের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রও দেয়। কিন্তু তাতেও নানা রকম অসঙ্গতি ও দুর্বলতা থাকে। ফলে বিচারিক আদালতে আসামি সহজে পার পায়। সড়ক দুর্ঘটনা আইনেই গলদ থাকায় চালক বা আসামির তেমন কিছু হয় না।

দুর্ঘটনা সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান এ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই) ২০১০ সালে সড়ক দুর্ঘটনার ওপর গবেষণা চালায়। তাতে দেখা গেছে, প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় বারো হাজার মানুষ মারা যায়। দুই-তৃতীয়াংশ দুর্ঘটনা হয় বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে। নিহতদের শতকরা আশি ভাগের বয়স পাঁচ থেকে পঁয়তাল্লিশ বছরের মধ্যে।

তিপ্পান্ন ভাগ পথচারী, যাদের মধ্যে শতকরা একুশ ভাগের বয়স ষোলো বছরের নিচে। শতকরা পঞ্চাশ ভাগ মারা যায় দুর্ঘটনার পনেরো মিনিটের মধ্যে। মস্তিষ্ক বা হৃদযন্ত্রে বড় ধরনের আঘাত ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে এসব মৃত্যুর মূল কারণ। পঁয়ত্রিশ ভাগ মারা যায় এক থেকে দু’ঘণ্টার মধ্যে। সাধারণত মাথা ও বুকে আঘাতে এ মৃত্যু হয়। বাকি পনেরো ভাগ মারা যায় দুর্ঘটনার এক মাসের মধ্যে। বিশেষ কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হওযায় এরা মারা যায়।

এআরআইয়ের তথ্যমতে, সারাবিশ্বে প্রতিবছর প্রায় বারো লাখের মতো সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এর শতকরা নব্বই ভাগই হয় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে। মোট দুর্ঘটনার অর্ধেকের শিকার এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো। দুর্ঘটনার শিকার মানুষের চিকিৎসার জন্য এসব দেশে জাতীয় প্রবৃদ্ধির শতকরা এক থেকে পাঁচ ভাগ খরচ করতে হয়।

সরকারীভাবে বছরে প্রায় চার হাজার দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান থাকলেও আসল সংখ্যা তার চেয়ে চার-পাঁচ গুণ বেশি। দুর্ঘটনার জন্য বছরে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি গুনতে হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশিক্ষিত চালকের অভাব, পথচারীর অসতর্কতা, ফিটনেস ঠিক না থাকা, অতিরিক্ত গতি, সড়ক নির্মাণে ত্রুটি, অতিরিক্ত গাড়ি, ত্রুটিপূর্ণ সেতু এবং অতিরিক্ত পণ্য পরিবহনের কারণেই দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে। এ ছাড়া জাতীয় স্থল পরিবহন ও মহাসড়ক বিধিমালা ২০০১সহ বিভিন্ন নীতিমালার বাস্তবায়ন না হওয়া, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের অকার্যকর অবস্থা, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ও সামাজিক আন্দোলন জোরদার না হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।