২১ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিমত ॥ প্রসঙ্গ ॥ নিরাপদ সড়ক চাই

  • হাফিজ বিন রহমান

‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস, ইউ ওয়ান্ট জাস্টিস’। স্লোগানটি ধর্মনিরপেক্ষ, সময় নিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক। এই স্লোগানের আবিষ্কর্তা এ দেশের তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরী। তারা বয়সে নবীন। আমাদের সন্তান-সন্ততি। বাংলাদেশের ভবিষ্যত। এ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী। যাদের মনে করা হতো, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে অত্যধিক প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে অসামাজিক হয়ে যাচ্ছে। লাশের পাশে সেলফি তোলা। ট্রেন লাইনে সেলফি তুলতে গিয়ে প্রাণ হারানো। হিংস্র জন্তুর সঙ্গে সেলফি তুলে অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দেয়ার মতো হতভাগ্য এক প্রজন্ম মনে করা হতো তাদের। কিন্তু চালক কর্তৃক ইচ্ছাকৃতভাবে রাজধানীর শহীদ রমিজউদ্দিন কলেজের দু’জন ছাত্রছাত্রীকে চাপা দেয়ায় তাদের মাঝে ক্ষোভ দানা বাঁধল। এই মর্মান্তিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর বিস্ফোরণোন্মুখ প্রতিবাদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ড দেশের আপামর জনসাধারণকে দারুণভাবে নাড়া দিয়ে গেল। ইতোপূর্বেও এ দেশে সড়ক দুর্ঘটনার কবলে হাজার হাজার প্রাণ নির্মমভাবে ঝরে গেছে। কখনও কখনও আঞ্চলিকভাবে এসব দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে। কখনও কখনও সমগ্র দেশে একসঙ্গে প্রতিবাদ হয়েছে। কিন্তু এবারের প্রতিবাদ ছিল নজিরবিহীন। রাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ নাগরিকগণের জন্য অধিকতর শিক্ষণীয়।

জাবালে নূর নামক পরিবহনে যাত্রী ওঠা-নামা নিয়ে রেষারেষির ফল রাজিব ও দিয়ার প্রাণ বিসর্জন। অনেকের কাছে এটি নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে পরিগণিত হলেও বাস্তবিক পক্ষে এটি আদৌ কোনো দুর্ঘটনা নয়। প্রায়শই লক্ষ্যে করা যায়, বেশি সংখ্যক যাত্রী গাড়িতে তুলে বেশি লাভের প্রত্যাশায় পাবলিক বাসগুলো অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে। তারা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে নিকটস্থ বাস স্টপেজে আগে উপস্থিত হওয়ার জন্য পথচারীকে চাপা দেয়। রিক্সা, সিএনজি, অটোরিক্সা, মোটারসাইকেল আরোহীকে হত্যা করে। অনেক সময় রোড আইল্যান্ড ও ফুটপাথে উঠে পড়ে। আবার রাস্তার পাশে লাইট পোস্ট ভেঙ্গে তছনছ করে দেয়। দুই বা ততোধিক গাড়ির রেষারেষিতে মাঝখানে চাপা পড়ে নিরীহ নাগরিক নিহত হয়। আবার অনেক সময় এত বেশি গতিতে প্রতিযোগী বাসকে অতিক্রম করে যে, স্টপেজেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে অনেক বাস। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাত্রীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এ বিষয়গুলোর জন্য চালকের দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা দায়ী নয়; বরং অন্যের থেকে বেশি লাভবান হওয়ার এ এক ন্যক্কারজনক মানসিকতা। রাজিব ও দিয়ার অতি মূল্যবান জীবন এ কারণেই ঝরে গেল। যার ফলস্বরূপ ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় নেমে এলো। অত্যন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন করল তারা। সঠিক দায়িত্ব জ্ঞানসম্পন্ন ট্রাফিকের মতো ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করল। সিরিয়ালে গাড়ি চলতে বাধ্য করল। যাদের লাইসেন্স নেই তাদের গাড়ি থেকে নামিয়ে দিল। এসব ক্ষেত্রে মন্ত্রী, এমপিরাও বাদ গেলেন না। বাদ গেল না পুলিশ মিডিয়ার গাড়িও। অথবা সরকারী-বেসরকারী আমলা-কামলা কেউই।

সারাদেশে এই আন্দোলন একটিই বার্তা দিল, পরিবহন খাতের এই নৈরাজ্য বন্ধ করতে হবে। সড়ক নিরাপদ করতে হবে। সড়কে স্বেচ্ছাচারী হত্যার মিছিল থামাতে হবে। সড়ক-সন্ত্রাসী পরিবহন শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এমনই এক সঙ্কটময় মুহূর্তে রাজিব ও দিয়ার স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাত করলেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশে স্বজন হারানোর বেদনা তাঁকে বোধকরি কাউকে বোঝানোর প্রয়োজন নেই।

আন্দোলনকারী শিশু-কিশোর ছাত্রছাত্রীরা সময়ের প্রয়োজনে নয় দফা দাবি উত্থাপন করে। প্রধানমন্ত্রী আন্দোলনকারীদের আশ্বস্ত করলেন, নয় দফা দাবি মেনে নেয়া হবে। তিনি রাজিব ও দিয়ার মাতা-পিতাকে ডেকে প্রত্যেককে বিশ লাখ টাকার সঞ্চয় পত্র অনুদান দেন। এ ছাড়াও শহীদ রমিজউদ্দিন কলেজের ছাত্রছাত্রীদের যাতায়াতের জন্য পাঁচটি গাড়ি উপহার দেন। তিনি নৌপরিবহন মন্ত্রীকে কেবিনেট মিটিংয়ে তিরস্কারও করেন। অন্যান্য দাবি বাস্তবায়নে দৃঢ় আশ্বাস প্রদান করেন। এর পরও ছাত্রছাত্রীরা ক্লাসে ফিরে যায়নি। কারণ হিসেবে আন্দোলনকারীরা কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে এনে বলে, ‘আশ্বাস নয় বাস্তবায়ন চাই।’ এটা তাদের দাবি।

আমি নিজেও কোটা সংস্কারের পক্ষে। কারণ মেধা ও কোটা সমতালে চলতে পারে না। কিন্তু কোমলমতি শিশুদের বোঝা দরকার যে, কোটা সংস্কার ও সড়ক দুর্ঘটনা নিরোধ সম্পর্কিত দাবি এক ও অভিন্ন নয়। কোটা সংস্কারের পক্ষ ও বিপক্ষ রয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় কার্যত পক্ষ বিপক্ষ নেই। যদি মালিক-শ্রমিককে পক্ষ বা বিপক্ষ ধরা হয় তাহলে নিহত দিয়ার পিতা কি দিয়ার বিপক্ষ বা প্রতিপক্ষ? কারণ তিনি তো ড্রাইভার। যানবাহন শ্রমিক। যাদের গাড়ি সড়কে চলছে, সে গাড়িতে তাদের সন্তান, আত্মীয়স্বজন চলাফেরা করে। এক ড্রাইভার ভিন্নরুটে অন্য ড্রাইভারের গাড়িতে উঠছে। যানবাহন শ্রমিকদের পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন বিভিন্ন চালকের গাড়িতে চড়ে। সুতরাং এখানে পক্ষ-বিপক্ষ নির্ধারণ করা বড়ই কঠিন। কিন্তু কোটা সংস্কারের আন্দোলন ভিন্ন মাত্রিক।

বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে প্রধানমন্ত্রী একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। কমিটি কাজও করছে। কোন কিছু তো আগে থেকে নির্ধারণ করা নেই। সুতরাং সময় দিতেই হবে। এসব বিষয়ের সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনাকে গুলিয়ে-মিলিয়ে ফেলা সমীচীন নয়। তা ছাড়াও জেলা কোটা, প্রতিবন্ধী কোটা এসব না রাখার কোন বিকল্প নেই।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, কোটা সংস্কারের সঙ্গে দেশের সকল জনগণ একমত নয়। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াল ছোবল থেকে বাঁচার ব্যাপারে দেশের সব নাগরিক একমত। সুতরাং কোটা সংস্কার ও সড়ক দুর্ঘটনা নিরোধ বিষয়ক দাবি এক নয়। মনে রাখতে হবে, প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা আছে বলেই, নয় দফার সব দাবি তিনি মেনে নিয়েছেন। গুরুত্বপূর্র্ণ দাবি অনেকাংশ বাস্তবায়ন করেছেন। এমনকি দাবিতে নেই, সেটিও নিজ থেকে করে দেখিয়েছেন। ইতোমধ্যে তিনি রমিজউদ্দিন কলেজকে পাঁচটি গাড়ি হস্তান্তর করেছেন।

অনেকেই বলছেন, এই আন্দোলন অনেক শিক্ষা দিয়ে গেল। ‘নতুন প্রজন্ম গোল্লায় যাচ্ছে’ এ ধরনের ধারণা যারা পোষণ করতেন, তারাই বলছেন, না নতুন প্রজন্ম সঠিকভাবে বেড়ে উঠছে। তারা সঠিকভাবে বিদ্যার্জন করছে। এ সমাজ এ রাষ্ট্র নিয়ে তাদের চিন্তার শেষ নেই। তারা সমাজ সচেতন। দেশ বিদেশের বহু কিছু তারা জেনে ফেলেছে। আইনকানুনের প্রতি তারা শ্রদ্ধাশীল। ভাল ভাল কথা দিয়ে তারা ব্যানার, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড লিখছে।

তবে তাদের মূল স্লোগান ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস, ইউ ওয়ান্ট জাস্টিস’ এই স্লোগানটি সুগভীর অর্থ সংবলিত। তবে তারা এই স্লোগান দিয়ে কী বোঝাতে চাচ্ছে সেটি স্পষ্ট নয়। কারণ তারা কি দেশের সামগ্রিক বিষয়ে জাস্টিস চাচ্ছে? নাকি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছাত্রছাত্রীর ঘাতক চালকের শাস্তির ব্যাপারে জাস্টিস চাচ্ছে? যদি সামগ্রিক বিষয়ে জাস্টিস চায়, তাহলে সেটি রাজনৈতিক আন্দোলনের নামান্তর; যেটির সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা কাম্য নয়। সম্ভবত তারা চায়, ঘাতক ড্রাইভারের শাস্তি। সেক্ষেত্রে যদি তারা জাস্টিস চায়, তাহলে বিদ্যমান মোটরযান আইনে সর্বোচ্চ যে শাস্তি আছে, সেটিই দাবি করতে হবে। কিন্তু আন্দোলনের ভাব-ভাষা-দাবি দেখে এটি প্রতীয়মান হয় যে, বিদ্যমান আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি দিলেও তারা যে জাস্টিস চাচ্ছে তা পাওয়া যাবে না। সুতরাং আইনের সংশোধন আগে প্রয়োজন।

ছোট ছোট শিশু-কিশোর আমাদের অনেক শিখিয়ে গেল। রাস্তায় গাড়ি চালাতে গেলে বৈধ লাইসেন্স থাকতে হয়। রুট পারমিট থাকতে হয়। যানবহনের ফিটনেস থাকতে হয়। ট্রাফিক আইন মানতে হয়। জনজীবনে শান্তি ও স্বস্তি আনতে গেলে জনশৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজ করা যায় না। কিন্তু এই আন্দোলন থেকে আন্দোলনকারীদেরও কিছু শিক্ষা রয়েছে। আমৃত্যু তাদের যেটি স্মরণ রাখতে হবে ও লালন করতে হবে। আজকে যারা আন্দোলন করেছে ভবিষ্যতে তারাই হবে মন্ত্রী, এমপি, সচিব, আইজি, বিচারপতি, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, এমনকি রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীও হবেন তারাই। তখন এ আন্দোলনের কথা ভুলে না গিয়ে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করলেই কেবল তাদের বাহবা দেয়া যাবে। এর আগে এখনই এত বাহবা দেয়ার খুব বেশি প্রয়োজন নেই।

লেখক : বাংলাদেশ বেতারের গীতিকার