১০ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এক ঘন্টার মধ্যে এসি চেয়ার ও কেবিনের টিকেট উধাও

এক ঘন্টার মধ্যে এসি চেয়ার ও কেবিনের টিকেট উধাও

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ঈদ যাত্রায় ট্রেনের অগ্রিম টিকেট বিক্রির প্রথম দিনে কমলাপুর রেল স্টেশনে একেবারেই ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে এবার। কারণ প্রথম দিনে উপচেপড়া মানুষের ভীড় আর কখনই লক্ষ করা যায়নি। রাতভর অপেক্ষা করা মানুষের সংখ্যাও কম ছিল না। সকাল আটটায় বিক্রি শুরুর প্রথম এক ঘন্টায় রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রাম সহ বিভিন্ন এলাকার এসি চেয়ার ও কেবিনের টিকেট শেষ হওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। তাছাড়া অন্তত চারবার সার্ভারে গোলযোগ দেখা দেয়ায় টিকেট বিক্রি কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এ নিয়ে হইচই করেছেন যাত্রীরা। আজ বিক্রি হবে ১৮ আগস্টের ট্রেনের অগ্রিম টিকেট। এদিকে অগ্রিম টিকেট নিতে রাজধানীর কল্যাণপুর ও গাবতলী এলাকায় খুব একটা লোক সমাগম দেখা যায়নি।

এক ঘন্টার মধ্যে এসি টিকেট নিয়ে হইচই ॥ সড়কপথে ভোগান্তির কথা চিন্তা করেই অনেকেই এবারও ট্রেনে বাড়ি যাবার প্রস্তুতি নিয়েছেন। প্রিয় জনের কাছে যাওয়া। তাও আবার ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করে। সব মিলিয়ে টিকেট সংগ্রহে একটু ধকল তো পোহাতে হবেই। এটাই স্বাভাবিক। অনেকে তা মেনেই নিয়েছেন। কিন্তু প্রত্যাশিত টিকেট না পেয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। প্রথম দিনেই মধ্য রাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন অনেকেই। কেউ টিকেট হাতে পেয়ে হেসেছেন প্রশান্তির হাসি। আবার কেউ মুখ কালো করে বাড়ি ফিরেছেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এসি চেয়ার ও কেবিনের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তাই অনেকে হয়ত পাননি। আমরা সাধ্যমত দেয়ার চেষ্টা করেছি।

অন্যান্য বছর ঈদের টিকেট বিক্রির প্রথম দুই দিন তেমন একটা ভিড় থাকে না। ঈদের সরকারী ছুটি শুরুর আগের দিনের টিকেটের চাহিদা বেশি থাকে। তাই ভিড়ের চাপ বেশি থাকে টিকেট বিক্রি শুরুর তৃতীয় দিন থেকে। তবে বুধবার বিভিন্ন রুটের ট্রেনের টিকেটের জন্য রাত থেকেই ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের কাউন্টারে অপেক্ষায় ছিলেন টিকেট প্রত্যাশীরা। সকাল ৮টায় কাউন্টার খোলার সময় লাইন দেখা যায় স্টেশনের মূল ফটক পর্যন্ত। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাইন দীর্ঘ হয়। দুটি মহিলা কাউন্টার খোলা হয় এবারও। তবে মহিলা টিকেট প্রত্যাশীদের উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়।

সূচি অনুযায়ী বুধবার বিক্রি হয়েছে ১৭ অগাস্টের বিভিন্ন গন্তব্যের ট্রেনের টিকেট। রমিজ হোসের জানান, তিনি মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসের এসি চেয়ারের টিকেট কাটতে ভোর রাতে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। সকাল নয়টার কিছুক্ষণ পর কাউন্টার থেকে জানানো হয় এসি চেয়ারের টিকেট শেষ। এ নিয়ে চরম হট্টগোল দেখা দেয়। শহীদ মিয়া নামের একজন জানান, রাজশাহীর ট্রেনের টিকেটের জন্য মঙ্গলবার রাত ৮টায় কমলাপুর স্টেশনে আসেন তিনি। কাউন্টারের সামনে তার সামনে ছিলেন ২৯ জন। তারপরও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরার টিকেট পাননি তিনি। এসি টিকেটের জন্য কালকে আবার আসব। যদি না পাই পরের দিন আবার আসব। তাও টিকেট না পেলে এবার ঈদে বাড়িই যাব না।

নারী কাউন্টারের সামনে প্রত্যাশা নামে একজন বললেন, তিনি কমলাপুরে এসেছেন রাত ৯টায়। কিন্তু এগারো ঘণ্টা অপেক্ষা করেও প্রত্যাশা অনুযায়ী এসি টিকেট পাননি। আমি রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনের এসি টিকেট চেয়েছিলাম। লাইনে আমি সবার আগে। আমিই যদি এসি টিকেট না পাই তাহলে এসি টিকেট গেল কই। রাত্রি জানালেন আমি সিলেটের টিকেট পেয়েছিল এবার রাড়ি যাওয়া নিশ্চিত। এই বলে হাসতে হাততে বিদায় নিলেন। টিকেট পেয়ে হাসির মুখে যেন আর হাসি ধরছিলনা। খুশিতে হেসে কুটিকুটি হাসি। বললেন, অনেক ধকল গেছে টিকেট সংগ্রহ করতে। কিন্তু নানা নাটকীয়তা দেখে না হেসে আর পারছিনা।

এদিন উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন রুটের ট্রেনের টিকেটের চাহিদা ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি। রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুরের ট্রেন নীলসাগর ও লালমনি এক্সপ্রেসের বেশিরভাগ টিকেট বিক্রি শেষ হয়ে যায় বেলা ১১টার মধ্যে। একই অবস্থা দেখা যায় দেওয়ানগঞ্জের তিস্তা এক্সপ্রেসের টিকেটের ক্ষেত্রেও।

বুধবার বিভিন্ন আন্তঃনগর ট্রেনের ২৩ হাজার ৫৩৬টি অগ্রিম টিকেট দেয়া হচ্ছে জানিয়ে কমলাপুরের স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্ত্তী বলেন, মোটামুটি সুশৃঙ্খলভাবেই টিকেট দেয়া হচ্ছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত টিকেট না পাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসি টিকেটের চাহিদা বেশি। এজন্য সবার প্রত্যাশা অনুযায়ী টিকেট দেয়া যায় না। তবে এখনও অনেক কাউন্টারে নন এসি টিকেট পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি সবার হাতে টিকেট তুলে দেয়ার। কিন্তু সবার চাহিদা তো এক রকম নয়।

ট্রেনের অগ্রিম টিকেট বিক্রি চলবে ১২ আগস্ট পর্যন্ত। অন্যদিকে ঈদ শেষে ফিরতি টিকেট বিক্রি শুরু হবে ১৫ আগস্ট থেকে, চলবে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত। রেলওয়ে মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন জানান, অগ্রিম টিকেট বিক্রিতে সব ধরণের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি টিকেট কালোবাজারী রোধে নেয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তিনি জানান, আমারা যাত্রীদের উত্তম সেবা দেয়ার চেষ্টা করছি। এবারের ঈদ উপলক্ষে প্রতিদিন প্রায় তিন লাখ যাত্রী রেলওয়ে পরিবহন করবে বলেও জানান তিনি।

আগামী ২২ আগস্ট ঈদের সম্ভাব্য তারিখ ধরে প্রতিবারের মতো এবারও ১০ দিন আগে থেকে ট্রেনের অগ্রিম টিকেট বিক্রি শুরু হবে। প্রতিবারের মতো এবারও একজন যাত্রী সর্বোচ্চ চারটি টিকেট সংগ্রহ করতে পারবেন। ঢাকায় ২৬টি কাউন্টার থেকে অগ্রিম টিকেট বিক্রি করা হবে। এর মধ্যে দুটি কাউন্টার নারী যাত্রীদের জন্য সংরক্ষিত।

৮ আগস্ট বিক্রি হবে ১৭ আগস্টের টিকেট। এভাবে ৯, ১০, ১১ ও ১২ আগস্ট পর্যায়ক্রমে টিকেট মিলবে ১৮, ১৯, ২০ এবং ২১ আগস্টের টিকেট। সকাল ৮টা থেকে কমলাপুর ও চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় অগ্রিম টিকেট বিক্রি করা হবে।

আগামী ১৫ আগস্ট থেকে শুরু হবে ঈদফেরত যাত্রীদের জন্য ট্রেনের অগ্রিম টিকেট বিক্রি। ঈদফেরত অগ্রিম টিকেট রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, দিনাজপুর ও লালমনিরহাট স্টেশন থেকে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় সকাল ৮টা থেকে টিকেট বিক্রি শুরু হবে।

ফিরতি টিকিটের মধ্যে ১৫ আগস্টে পাওয়া যাবে ২৪ আগস্টের টিকেট। একইভাবে ১৬, ১৭, ১৮ ও ১৯ আগস্ট যথাক্রমে পাওয়া যাবে ২৫, ২৬, ২৭ ও ২৮ আগস্টের টিকেট। সংবাদ সম্মেলনে রেলমন্ত্রী জানান, সুষ্ঠু ও নিরাপদ ট্রেন চলাচল নিশ্চিত করতে ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ওরল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হবে। আর ঈদযাত্রায় যে কোনো নাশকতা ঠেকাতে আনসার, জিআরপি, র্যাব, পুলিশ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাঠে থাকবেন। ঈদ উপলক্ষে বাড়তি কোচ সংযোজন ও লোকোমোটিভ সরবরাহ করা হবে এবং টিকেট কালোবাজারি প্রতিরোধে সার্বক্ষণিক পাহারা থাকবে। রেল মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে,এবার কোরবানির ঈদের আগে চার দিন সাত জোড়া বিশেষ ট্রেন চলাচল করবে বিভিন্ন গন্তব্যে। এছাড়া ঈদের পর আরও ৭ দিন এসব বিশেষ ট্রেন চলবে।

ঢাকা- দেওয়ানগঞ্জ, চট্টগ্রাম-চাঁদপুর রুটে দুটি করে, ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-দিনাজপুর, ঢাকা-লালমনিরহাট ও ঢাকা-খুলনা রুটে এসব ট্রেন চলবে। এছাড়া ভৈরব-কিশোরগঞ্জ এবং ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ রুটে ঈদের দিন চলবে শোলাকিয়া স্পেশাল। এবার ঈদে ৯ জোড়া বিশেষ ট্রেন দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচল করবে। এছাড়া ঈদের পাঁচ দিন আগে (সম্ভাব্য তারিখ ১৮ আগস্ট) থেকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত আন্তনগর রুটের সব ট্রেনের ডে-অফ বাতিল করা হয়েছে।

১০ আগস্ট থেকে লঞ্চের অগ্রিম টিকেট ॥ আগামী ১০ আগস্ট থেকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের জন্য অগ্রিম লঞ্চের টিকেট বিক্রি শুরু হবে। শুধুমাত্র কেবিনের যাত্রীরা অন্য বারের মত এবারও অগ্রিম টিকেট সংগ্রহ করতে পারবেন সদরঘাট নদী বন্দর থেকে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ চলাচল (যাত্রী) পরিবহন সংস্থার সচিব ছিদ্দিকুর রহমান জানিয়েছেন, লঞ্চের অগ্রিম টিকেট বিক্রির সিদ্ধান্ত এখনও চূড়ান্ত না হলেও আশা করছি ১০ আগস্ট থেকে বিক্রি শুরু হতে পারে। এদিকে বিআরটিসি বাসের অগ্রিম টিকেট দেয়া এখনও শুরু হয়নি। চলতি সপ্তাহে তা চূড়ান্ত হতে পারে।

চাপ নেই বাস কাউন্টারে ॥ পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে ঘরমুখো মানুষের ঈদের বিশেষ টিকেট কেনার চাপ নেই রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে। তাই কাউন্টারের ভিতরে বাইরে পরিবহন শ্রমিকরা যাত্রীদের ডাকাডাকি করেও টিকেট বিক্রি করতে পারছেন না। তবে বিশেষ কয়েকটি পরিবহনে ঈদের বিশেষ টিকেট কেনার চাপ রয়েছে। বুধবার গাবতলী বাস টার্মিনাল ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

ঈদুল আজহার সম্ভাব্য দিন ২২ আগস্ট ধরে আগামী ১৭ ও ১৮ আগস্ট সাপ্তাহিক সরকারি ছুটির পর ১৯ ও ২০ আগস্ট কার্যদিবস রয়েছে। পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, এই দুইদিনের ছুটি নিশ্চিত হবার পর বাসের টিকেটের জন্য যাত্রীদের ঢল নামবে। যারা পরিবারকে আগে পাঠিয়ে দিতে চাচ্ছেন, তারা এখন আসছেন, তবে তাদের সংখ্যাও খুব কম।

বাস কাউন্টারে গিয়ে দেখা গেছে আগামী ১৮ থেকে ২১ আগস্ট পর্যন্ত অগ্রিম টিকিটের চাহিদা বেশি। হানিফ কাউন্টারের ম্যানেজার শফিকুল ইসাম বাবু বলেন, মঙ্গলবার থেকে আমাদের ঈদের অগ্রিম টিকেট বিক্রি শুরু হয়েছে। কাউন্টারে আগের মতো ভিড় হয় না। কারণ যেকোনো কাউন্টার থেকেই যেকোনো রুটের টিকেট কেনা যায়। তাই সবার গাবতলী বা সায়দাবাদ যাওয়া লাগে না। এছাড়া অনলাইনে ঘরে বসেই মানুষ টিকেট কিনতে পারে।

এদিকে সৌখিন পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার সবুজ বলেন, যাত্রীর চাপ নেই তাই এবার ঈদে বিশেষ টিকেট বিক্রি করা হচ্ছে না। স্বাভাবিক সময়ে যেভাবে বাস চলে এবার সেভাবেই টিকেট বিক্রি হচ্ছে। রাস্তায় এক ধরণের আতংক সৃষ্টি হওয়ায় এবার ঈদে অগ্রিম টিকেট বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি বলেও জানান তিনি।