২২ আগস্ট ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

টাঙ্গাইলের মধুপুরের বিষমুক্ত আনারসের চাহিদা বাড়ছে

টাঙ্গাইলের মধুপুরের বিষমুক্ত আনারসের চাহিদা বাড়ছে

নিজস্ব সংবাদদাতা, টাঙ্গাইল ॥ টাঙ্গাইলের সিংহভাগ আনারস চাষ হয় আনারসের ‘রাজধানী’ খ্যাত মধুপুরে। রসে ভরা এ ফলটি স্বাদ ও গন্ধে একসময় ছিল অতুলনীয়। কিন্তু অতীতের সেই ঐতিহ্য হারাতে বসেছিল। বিষাক্ত রাসায়নিক অতিরিক্ত প্রয়োগের মাধ্যমে আনারস আকারে বড় এবং আকর্ষনীয় রঙ তৈরি করায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল এর স্বাদ-গন্ধ ও গুণাগুণ। তবে এখন পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। অতিরিক্ত রাসায়নিক দিয়ে পাকানো আনারসের পাশাপাশি বিষমুক্ত আনারসও চাষ হচ্ছে মধুপুরে।

বিগত ২০১৪ সাল থেকে মধুপুরের কয়েকজন চাষী রাসায়নিকমুক্ত আনারস চাষ শুরু করেন। এটি করতে গিয়ে শুরুতেই মোটা অঙ্কের টাকা ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা। এতে তারা হতাশ হলেও ভেঙে পড়েননি। তাদের এ সংগ্রাম চালিয়েই যাচ্ছেন। এবার কিছুটা সুফলও আসতে শুরু করেছে। বিষমুক্ত আনারসের চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ছে। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে আনারসের অতীত ঐতিহ্য আবার ফিরে আসবে বলে আশা করছেন মধুপুরে আনারস চাষের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তা না হলে রাসায়নিকের কবল থেকে আনারসকে রক্ষা করা যাবে না বলে জানান তারা ।

সারাদেশে জুড়ে পরিচিতি রয়েছে শালবন খ্যাত টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়াঞ্চল। এই পরিচিতিকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে ‘লাল মাটির ফসল’ আনারসে। মধুপুরের বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা জানান, তাদের প্রায় সবাই রাসায়নিকমুক্ত আনারস আবাদ করতে চান। কিন্তু ক্ষতির আশঙ্কায় তারা সেটা পারছেন না। ভোক্তাদেরকে রাসায়নিকমুক্ত আনারস কিনতে উদ্ধুদ্ধ করতে পারলে, তাদেরকে ভাল-মন্দ আনারস চেনানোর ব্যবস্থা করা হলে রাসায়নিকমুক্ত আনারস আবাদ করা যাবে। মধুপুরের মহিষমারা গ্রামের বিষমুক্ত আনারস চাষী ছানোয়ার হোসেন জানান, আগে প্রতি বছরই আনারস বড় এবং পাকানোর জন্য তিনি ক্ষেতে রাসায়নিক প্রয়োগ করতেন। হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নেই মানুষের ক্ষতি করে এমন মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক আর প্রয়োগ করবো না। তাই আমি বিগত ২০১৪ সালে প্রায় দুইশ’ শতাংশ জমিতে রাসায়নিকমুক্ত আনারস আবাদ শুরু করি। আনারস আকারে বড় এবং পেকে হলুদ রঙ না হওয়ায় বাজারে তার আনারসের চাহিদা কম হয়। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে না পারায় প্রথম অবস্থায় প্রায় ৫০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়। তবু রাসায়নিক প্রয়োগের মাধ্যমে আনারস বড় ও পাকানোর বিপক্ষে। এবারও দেড়শ’ শতাংশ জমিতে বিষমুক্ত আনারস চাষ করছি। শুধু কৃষক চেষ্টা করলে হবে না। ভোক্তাদের রাসায়নিকমুক্ত আনারস কিনতে সচেতন হতে হবে। তারা চাকচিক্য দেখে আনারস কিনেন। আকারে বড়, আকর্ষণীয় রঙ হলেই আনারস ভাল হয় না। একসঙ্গে রাসায়নিকমুক্ত ও রাসায়নিকযুক্ত আনারস রাখা হলে রাসায়নিকযুক্তটাই ক্রেতারা পছন্দ করে কিনে নেন। যদি তা না হয় তাহলে কৃষক রাসায়নিকমুক্ত আনারস চাষে উৎসাহিত হবে এবং এক সময় দেখা যাবে বাজারে কোন বিষাক্ত আনারস নেই। গ্রামে শহরে বিভিন্ন হাট, বাজারে নির্দিষ্ট দোকান থাকলে যেখানে বিষমুক্ত আনারস বেচা কেনা করা যাবে, তাহলে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের জন্য ভালো হতো। আমরা যেমন বিক্রির নিশ্চয়তা পেতাম, তেমনি ক্রেতাও বিষমুক্ত আনারস কিনতে পারতো।

এ ব্যাপারে মধুপুর উপজেলার অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা আদনান বাবু বলেন, রাসায়নিক দেয়া আনারস দেখতে বড় এবং সম্পূর্ণ হলুদ রঙ হয়ে পাকে। আর রাসায়নিকমুক্ত আনারস কখনো সম্পূর্ণ হলুদ রঙ হয়ে পাকে না। নিচ থেকে পাকে আর উপরের অংশে কাচা থাকে। এই বিষয়টি ক্রেতাকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ফল বড় করা, একত্রে বাজারজাত করা এবং ভোক্তাকে আকৃষ্ট করার জন্য অনেকে নিয়ম না মেনে একাধিকবার হরমোন ব্যবহার করে। এটিই ক্ষতির কারণ। এ ব্যাপারে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। মানুষও আস্তে আস্তে সচেতন হচ্ছে। এবার বিষমুক্ত আনারসের চাহিদা বেড়েছে। আবাদও হয়েছে বেশি। রাসায়নিক প্রয়োগ করে আনারস আবাদ ভবিষ্যতে আরো কমে আসবে। মধুপুর থেকে বিষমুক্ত আনারস রপ্তানির চিন্তাভাবনা চলছে বলে তিনি জানান।

এ ব্যাপারে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের কনসালটেন্ট ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. সুজা উদ্দিন তালুকদার বলেন, আনারসে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে মানুষের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হতে পারে। দেহের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হতে পারে। হাড় ও অস্থির ক্ষয়রোগ হয়ে সামান্য আঘাতে এগুলো ভেঙে সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করতে হতে পারে। এছাড়া ডায়াবেটিস, প্রেসার বেড়ে স্ট্রোক ও হার্ড অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। আর বিষমুক্ত আনারস খেলে মানবদেহের পানিশুন্যতা, কোষ্ঠ্যকাঠিন্য দূর হবে। ভিটামিন সি এবং পানির চাহিদা পূরণ হবে। এছাড়া শরীরের দূষিত পদার্থ বেরিয়ে যাবে।