১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যে শোকে আজও ইতিহাস কাঁদে

  • ফজলুল হক খান

আমি কারবালা দেখিনি, এজিদকে দেখিনি, পড়িনি বিষাদসিন্ধু, আমি দেখেছি জাতির জনকের বুক থেকে ঝরে যাওয়া শেষ রক্ত বিন্দু। আমি সীমারকে দেখিনি, দেখিনি তার পাষন্ড বুক। আমি দেখেছি রক্তের স্রোতে ভাসা জাতির জনকের মুখ। আমি দেখিনি সীমারের খঞ্জর, দেখেছি মানুষ নামের কিছু বর্বর। আমি দেখিনি মীর জাফর, দেখিনি পলাশীর প্রান্তর। দেখেছি ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট, জাতির দীপ্তকণ্ঠের প্রতিনিধি, শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালী, বাংলার স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে, ঘাতকেরা নির্মমভাবে হত্যা করে। যে শোকে আজও ইতিহাস কাঁদে। সেই রক্তে রাঙ্গা দুঃখের কাহিনী বলতে গেলে অশ্রু ঝরে ইতিহাসের বালুচরে। ইতিহাস কেঁদে কেঁদে কয়, এ শোক চোখের জলে মুছে যাবার নয়।

১৫ আগস্ট বাঙালী জাতির জীবনে ভয়াবহ এক শোকের দিন। যে শোক ভুলা যাবে না কোন দিন। স্মৃতির পাতায় ভুলিনি সবাই, সেই দিন কি ঘটেছিল এই সোনার বাংলায়। ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের ভোরে, গভীর শোকে কেঁদে উঠেছিল বাংলাদেশ, যে কান্নার আজও হয়নি তো শেষ। বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে সেদিন বাংলার মানুষকে কাঁদতে দেখেছি। দু’চোখ ঢেকে যেমন কাঁদে রাতের বেদনায় পরাজিত পৃথিবী। পদ্মা মেঘনা যমুনার পানি, সেদিন শোকে থেমে গিয়েছিল জানি। অসহায় বিবেকের আগুনে পুড়ে আমি, পথের পাতায় লিখে যাই সেই বিষাদের বাণী ।

সংঘাতময় এ পৃথিবীতে, আবহমান কাল ধরে চলে আসছে, ন্যায়-অন্যায়ের সংঘাত, সুন্দর-অসুন্দরের সংঘাত, ঘৃণা-ভালবাসা, শান্তি-অশান্তি, অসুর আর মানবতার সংঘাত। নিরবচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরায় চলে আসা ইতিহাসের আমোঘ ধারায়, ন্যায় এবং সত্যকে বারবার মোকাবেলা করতে হয়েছে অন্যায়-অসত্যকে, ভিতর-বাহিরের কুটিল ষড়ষন্ত্রকে। এ সংঘাতের মোকাবেলায় কত মহাপুরুষের রক্তে ভিজে গেছে পৃথিবীর বুক, সৃষ্টি হয়েছে ইতিহাসের ভয়াবহ সংকট, বিপন্ন হয়েছে মানবতা তার ইয়াত্তা নেই।

আততায়ীর হাতে মহাপুরুষের মৃত্যুবরণ যেমন সংঘাতের এক অনিবার্য ঘটনা তেমনি প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে দেশ প্রেমিক রাষ্ট্রনায়ক ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হওয়ার ঘটনা ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। ইসলামের মহান চার খলিফার তিনজনই যেমন শহীদ হয়েছেন আততায়ীর হাতে তেমনি এ গুপ্ত হত্যার তালিকায় ছিলেন ক্রুসেড বিজয়ী বীর সেনানী সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ও ইমাম ইবনে তায় মিয়ার ন্যায় মনীষীও।

বিষপানে হত্যা করা হয়েছে সক্রেটিসকে, ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে যিশু খ্রীস্টকে। এ সংঘাতের কারণেই জীবন প্রদীপ নিভে গেছে রোমের সিজার, জায়ারের লুবাম্বা, গ্রানাডার মরিস বিশপ, চিলির আলেন্দেসহ অসংখ্য মহাপুরুষের। আততায়ীর বুলেটের নির্মম আঘাতে জীবন দিতে হয়েছে এ উপমহাদেশের মহাত্মা গান্ধী, লিয়াকত আলী খান, ইন্দিরা গান্ধীসহ বিশ্বের জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়ক আব্রাহাম লিংকন, জন. এফ কেনেডির মতো মহান নেতাকে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় টিপু সুলতানের বীরত্ব ও দেশপ্রেম ব্যর্থ হয়েছে, তাকে জীবন দিতে হয়েছে শুধু এদেশের আলো, বাতাস, অন্নেপুষ্ট কতিপয় বিশ্বাসঘাতক মোনাফেকদের ষড়যন্ত্রের কারণে।

মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় যেমন বাংলার শেষ সূর্য অস্তমিত হয়েছে পলাশী প্রান্তরে তেমনি জীবন দিতে হয়েছে বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে মীরনের আদেশে মোহাম্মদী বেগের হাতে। ন্যায়-অন্যায়ের এ সংঘাতের কারণেই মনসুর হেযাজের মতো সত্যবাদী ধার্মিককেও কতল করা হয়েছে। এসব হত্যাকা- যেমন নিছক হত্যাকান্ড নয়, সংঘাতের অশুভ পরিণতি তেমনি জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়ককে হত্যার মাধ্যমে ক্ষমতাদখলও কোন অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট, শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালী, বাঙালী জাতীয়তাবাদের অগ্রদূত, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যা আবহমান কাল ধরে চলে আসা ন্যায়-অন্যায়ের সংঘাত থেকে বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়, দীর্ঘদিেিনর পরিকল্পিত এবং ছক বাধা এক প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের বাস্তবায়ন।

’৭৫-এর ১৫ আগস্ট, অন্ধকারের পেট চিড়ে যখন বেরিয়ে আসে সোনালি ভোর, কিচির-মিচির শব্দ করে রাত জাগা পাখিগুলো ঘোষণা করছে রাতের শেষ প্রহর, মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ভেসে আসছে ফযরের আযানের সুমধুর ধ্বনি তখন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ঘটে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে কলংকজনক অধ্যায়। মীর জাফরের রক্তের কণিকা বহনকারী কিছু উচ্চবিলাসী, বিপথগামী ও উচ্ছৃঙ্খল সেনা সদস্য স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকারদের সহায়তায় অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

এই নৃশংস হত্যাকান্ড ও বিভীষিকার ভয়াবহতা বুঝবার ভাষা নেই। পৃথিবীর সকল ভাষার সকল শব্দ উজাড় করে দিয়েও এই বর্বরতার চিত্র তুলে ধরা যাবে না। শুধু এইটুকু বলা চলে ছয়শত বছর পর বাংলার সবুজ প্রান্তরে কবর থেকে যেন উঠে এসেছিল তৈমুরের প্রেতাত্মা কিংবা তের শ’ বছরের আগের এজিদের বংশধররা। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট, অসুরের দল শুধু জাতির জনককেই নয়, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে আরও হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী, জীবনের সুখ-দুঃখের সাথী বেগম ফজিলাতুন্নেছা, একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল, রোজী জামাল এবং সর্বকনিষ্ঠ শিশু পুত্র শেখ রাসেলকে।

কচি মুখ মায়াবী চোখ, নির্মল হাসির অবুঝ শিশু রাসেলের বাঁচার আকুতির বিনিময়ে, ঘাতকেরা কচি বুকটা ঝাঁঝরা করে বুলেটের আঘাতে। পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে তারও বুকের তাজা রক্তে ভেসে যায় মেঝে, মাঝখানে নীরব, নিথর প্রাণহানি অবস্থায় পড়ে থাকে ক্ষত-বিক্ষত দেহ। শিশু রাসেল অসুরদের বাধা দিতে পারেনি, ভাগ্যকে মেনে নিয়েছে নীরবে। এছাড়া তার আর কোন উপায় ছিল না। নির্মম বুলেটের আঘাত ও রক্তক্ষরণে নিঃশেষ প্রায় ওষ্ঠাগত প্রাণ নিয়ে শিশু রাসেল হয়ত বা একবার বলেছে, ‘হে পৃথিবীর মানুষ! তোমরা একবার দেখ, একদল অসুরদের হাতে কিভাবে জীবন দিতে হলো একজন নিরাপরাধ, নিষ্পাপ, অসহায় শিশুকে। অসুরদের সাথে রাজনৈতিক মতানৈক্য, রাজনৈতিক বিরোধ থাকতে পারে আমার বাবার, আমার ভাইয়ের। আমি তো রাজনীতি বুঝি না, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র বুঝি না, আমি শিশু, আমি নিরাপরাধ, আমি নিষ্পাপ, আমার কোন শত্রু নেই, সারা বিশ্ব আমার জন্য অভয়ারণ্য তবুও আমাকে কেন জীবন দিতে হলো অসুরের হাতে। এ প্রশ্ন আমার পৃথিবীর মানুষের কাছে।’

অবুঝ শিশু রাসেলের কান্না, পায়নি সেদিন মানবতার ছোঁয়া। রাতের নিস্তব্ধতা ও অশুভ শক্তির বেষ্টনী ভেদ করে পৌঁছায়নি পৃথিবীর মানুষের কানে। বিদেশে থাকার কারণে বেঁচে যান ভাগ্যগুণে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা আমাদের প্রিয় নেত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা। কিন্তু স্বজন হারাবার ব্যথায় ক্ষত-বিক্ষত তাঁদের হৃদয়, বিভীষিকাময় ও দুর্বিষহ কালো রাতের স্মৃতি আজ তাদের জীবনের একমাত্র সম্বল।

’৭৫-এর ১৫ আগস্ট প্রকৃত অর্থে কোন সামরিক অভ্যুত্থান ছিল না, ছিল ১৭৫৭ সালের ইংরেজ বেনিয়াদের ষড়যন্ত্র ও দেশীয় দালালদের সহযোগিতায় পলাশী প্রান্তরে সংঘটিত বিয়োগান্ত নাটকেরই পুনরাবৃত্তি। ভাগ্যের সেই একই পরিহাস। যার যৌবনের উত্তাপে গড়া এ সোনার বাংলা- তাঁর রক্তাক্ত লাশ সিঁড়িতে ফেলে রেখে খুনীর দল এগিয়ে যায় ক্ষমতার মসনদের দিকে। যার সারাজীবনের এত সাধনার ধন, সোনার বাংলা-তাঁর অস্তিম যাত্রায় কফিন আচ্ছাদিত হয়নি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকায়, বিউগলে ভেজে উঠেনি শেষ বিদায়ের করুণ সুর। যার সারাজীবনের ত্যাগ ও শ্রমের ফসল বাঙালী জাতির স্বতন্ত্র আবাসভূমির ঠিকানা তাঁর সমাধির জন্য রাজধানীতে জুটেনি সাড়ে তিনহাত জায়গা। বঙ্গবন্ধুর রক্তাক্ত লাশ খুনীদের উল্লাস নৃত্যের মধ্য দিয়ে মাটি চাপা দেয়া হয় নিজ জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়ায়। আজ সময়ের ব্যবধানে টুঙ্গিপাড়া হয়ে উঠেছে বাঙালী জাতির তীর্থস্থান। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর মাজার দেখলে মনে হয় স্বাধীনতার সোনালি ইতিহাস গায়ে জড়িয়ে সারা বাংলা ঘুমিয়ে আছে টুঙ্গিপাড়ার সবুজ মাঠে।

ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। পলাশী প্রান্তরের বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর, মীরন, মোহাম্মদী বেগ, ঘসেটি বেগম, রায় দুর্ল্লভ, জগৎশেঠ, উমিচাঁদ বিশ্বাসঘাতকতার কাফ্ফারা কাকে বলে, ইতিহাসে পড়তে পড়তে চিনিয়ে দিয়ে গেছে। প্রধান বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর হতে চেয়েছিল মহবত জঙ্গ কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! শেষ পর্যন্ত হয়েছিল ক্লাইভের গাধা। দেনার দায়ে রাজকার্য চলাতে পারতো না, বিশ্বাসঘাতকতার শেষ পরিণতির কথা ভেবে ভাঙ্গ খেয়ে চুর হয়ে পড়ে থাকত। ইংরেজদের দেনা মেটাতে গিয়ে মীর জাফর বর্ধমান, নদীয়া জেলার গোটা খাজনা ইংরেজদের নামে লিখে দিতে বাধ্য হয়। খাজনা আদায়ের শাসনযন্ত্রে যেই ইংরেজদের প্রবেশ শুরু হলো, গোটা দেওয়ানি ও নিজামত তাদের হাতে চলে না যাওয়া পর্যন্ত আর শেষ হলো না। ইংরেজরা দেনার দায়ে মীর জাফরকে একবার ক্ষমতাচ্যুত করেছিল আবার তারাই কৃপা করে তাকে মসনদে বসিয়েছিল কিন্তু মসনদ চালাবার ভাগ্য হলো না। অচিরেই পাপের প্রায়শ্চিত করতে সে কুষ্ঠ রোগে ধুঁকে ধুঁকে মারা গেল। তারপরও তার পাপের প্রায়শ্চিত হলো না, আজও বাংলার মানুষ বিশ্বাসঘাতককে ঘৃণাভরে মীর জাফর বলে গালি দেয়।

ষড়যন্ত্রের অপর নায়ক রায় দুর্ল্লভ, মীরনের আদেশে দু’দিনের দেওয়ানি রাজবল্লভের হাতে ছেড়ে দিয়ে ধন ও মান নিয়ে কলকাতায় পালিয়ে বাঁচলেন। কিন্তু তার সঞ্চিত ধন উত্তরাধিকারীদের ভোগে লাগল না। তার একমাত্র সন্তান মুকুন্দবল্লভ তার জীবদ্দশায় মৃত্যু মুখে পতিত হওয়ায় রায় দুর্লভের বংশলোপ পেলো। জগৎ শেঠ, মহাতাব রায় ও মাহারাজা স্বরুপচন্দের পরিণাম হলো আরও ভয়াবাহ। ইংরেজদের মিত্র বলে নবাব মীরকাশিম এই দুই শেঠকে গঙ্গার জলে ডুবিয়ে মারলেন। জগৎ শেঠের পরিবার ব্যবসায় যে ঘা খেল তা আর সামলিয়ে উঠতে পারলো না। দেওয়ানি হাতে পেয়ে ক্লাইভ রুক্ষ্মভাবে তাদের উত্তরাধিকারীর হাত থেকে রাজকোষের চাবি ছিনিয়ে নিলেন। এভাবে পলাশী যুদ্ধের বিশ বছরের মধ্যে প্রায় সকল ষড়যন্ত্রকারী সমূলে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো।

আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা ইতিহাস পড়ি কিন্তু ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি না। ’৭৫-এর প্রধান মীর জাফর খন্দকার মোশতাক হতে চেয়েছিল একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু সে ক্ষমতা স্থায়ী হয়নি। মাত্র ৮১ দিনের মাথায় মোশতাক ক্ষমতাচ্যুত হয়ে চুরির দায়ে জেলে যায়। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে আর কোন দিন জনসম্মুখে বেরোয়নি। আপন বাসভবনে বন্দী অবস্থায় নিজ কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা এবং বিবেকের দংশনে মানুষের আদালতকে ফাঁকি দিয়ে ধুঁকে ধুঁকে এগিয়ে যায় মৃত্যুর দিকে। বিচার শুরু হয় বিধাতার আদালতে, নিজের সন্তানও মীর জাফরের সন্তানের পরিচয়ে এদেশে বাস করতে চায় না। পিতার অপকর্মের দায়ে ক্ষোভে আর ঘৃণায় মোশতাকের সন্তানরা দেশ ছেড়ে চলে যায়। অন্যান্য মীর জাফরদের শেষ পরিণতি আরও করুণ। একজন মধ্যপ্রাচ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। বুলেটের নির্মম আঘাতে আর একজনের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, হাড়-মাংস, শিরা-উপশিরা ছিন্ন-বিছিন্ন অবস্থায় মাটি চাপা পড়ে। মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে লাশটি উদ্ধার করা সম্ভব হলেও শনাক্ত করার কোন উপায় ছিল না। বিবর্ষ অবস্থায় লাশটি দেখার সৌভাগ্যও দেশবাসীর হয়নি। ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুঁলে কেউ কেউ পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেছে। কেউ কেউ মৃত্যু পরোয়ানা মাথায় নিয়ে বিদেশের মাটিতে ফেরারি হয়ে আছে।

সংঘাতময় এ পৃথিবীতে কখনও কখনও ন্যায় এবং সত্য পরাভূত হয়েছে, অন্যায়-অসত্যের কাছে, বিবেক বন্দী হয়েছে বর্বরতায়, নৈতিকতা, আদর্শ মানবিক মূল্যবোধ বিপন্ন হয়েছে, কিন্তু তা সাময়িক। বর্বরতা, অন্যায় অসুন্দরের মতো অপশক্তি কখনও স্থায়ী হয় না। বিভ্রান্তির ঘোর কেটে যাওয়া মাত্রই মানুষের মাঝে ফিরে আসে বিবেকের অনুভূতি, বহিঃপ্রকাশ ঘটতে থাকে অনুশোচনা, পুঞ্জিভূত গ্লানি আর দুঃসহ যন্ত্রণার। যেমন বাংলার মানুষকে অনুতাপ করতে দেখেছি সিরাজের জন্য, আমি মানুষকে কাঁদতে দেখেছি মুজিবের জন্য, গ্রানাডার মাটিকে করতে দেখেছি বিদ্রোহ, শুষে নেয়নি মরিশ বিশপের রক্ত। আমি দেখেছি চিলির আলেন্দের জনপ্রিয়তা, তাঁর ছবি বুকে নিয়ে সে দেশের মানুষের কান্না। চিলির মাটিকেও করতে দেখেছি বিদ্রোহ শুষে নেয়নি আলেন্দের রক্ত। আর এতো বাংলার মাটি ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে পুড়ে পুড়ে খাঁটি। একদম খাঁটি। যেন মুজিবের সেরা ভক্ত, বাংলার মাটিকেও করতে দেখেছি বিদ্রোহ এ মাটি শুষে নেয়নি মুজিবের রক্ত।

আমরা কেউ ইতিহাসের ছাত্র, কেউ শিক্ষক, কেউ একটি পাতা, কেউ একটি অধ্যায়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু নিজেই এক ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস, স্বাধীনতার ইতিহাস, ইতিহাসের এক কিংবদন্তি। ইতিহাসের এই কিংবদন্তিকে হত্যা করে যারা বদলে দিতে চেয়েছিল ইতিহাসের ধারা, তারা জানে না হত্যা করেই থামানো যায় না ইতিহাসের পথ চলা। সময়ের হাত ধরে আঁধার পেরিয়ে ইতিহাস এগিয়ে যায় পায়ে পায়ে। ইতিহাসের হাত ধরেই সময়ের ব্যবধানে বঙ্গবন্ধু উঠে এসেছেন তাঁর প্রিয় সোনার বাংলায়, তাঁর প্রিয় মানুষের কাছে। ইতিহাসের রক্ত গোলাপ হয়ে ফুলে ফলে, ফসলের মাঠে, কৃষকের হাসি, রাখালের বাঁশি, মাঝির ভাটিয়ালি গানে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সঞ্চারিত মিছিল, কবিতার আসরে, নাটকের মঞ্চে সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে বঙ্গবন্ধু অস্তিত্ব। রুখে তাঁর দুর্বার গতি, কার আছে এমন সাধ্য। যতদিন বাংলার মাটি, মানুষ, বৃক্ষ, আকাশ ও প্রকৃতি থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু থাকবে, বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারিত হবে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে, অত্যন্ত গর্বের সাথে।