২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দেশীয় গরুতে কোরবানি -স্বদেশ রায়

মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ জানিয়েছেন, এবার কোরবানি ঈদে আর বিদেশী গরুর প্রয়োজন হবে না। কথাটা শুনে খুবই ভাল লাগল। মনে পড়ে গেল পাঁচ ছয় বছর আগের কিছু স্মৃতি। ভারতে তখন কংগ্রেস ক্ষমতায়, তবে নির্বাচন আসন্ন। আর নির্বাচনকে সামনে রেখে ভারতের গোরক্ষা সমিতি, আরএসএস সংগঠনগুলো তখন গো মাতা নিয়ে খুব ব্যস্ত। দিল্লীতে বসে তাদের এসব ব্যস্ততা দেখে মনে মনে একটা প্রমাদ গুনি। কারণ, ততদিনে অনেকখানি পরিষ্কার হয়ে গেছে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় আসছে, তাই মনে শঙ্কা জাগে- পারবে কি বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে গোরক্ষা সমিতি, আরএসএস এদের অস্বীকার করে বাংলাদেশে গরু রফতানি করতে? যদিও এ চিন্তাটি রাজনীতিবিদদের। তবে সাংবাদিক হিসেবে আমার জানা বা বোঝার বিষয় ছিল, পারবে কিনা বিজেপি বাংলাদেশে গরুর সরবরাহ বজায় রাখতে? এ কারণে দিল্লীতে থাকা অবস্থায় ইচ্ছে করেই বিজেপির কয়েক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করি। তারা আমার উদ্বেগ দেখে অনেকটা আশ্চর্যই হন, কারণ তারা রাজনীতিবিদ। তারা জানেন রাজনীতিতে সব সময়ই দুইয়ে দুইয়ে চার হয় না। যা হোক, কেন্দ্রীয় এক নেতা যিনি আগে সাংবাদিক ছিলেন, তিনি বুঝতে পারলেন একজন সাংবাদিক হিসেবে বিষয়টি আমার জানা ও বোঝা দরকার। তিনি আমাকে ছোট্ট একটা কথাতেই বিষয়টি পরিষ্কার করে দিলেন, বললেন, দেখেন আমাদের নর্থ ইস্ট ইন্ডিয়াতেও কাউ ইটার আছে। আমার আর বুঝতে বাকি থাকে না ভোটের রাজনীতির শুভঙ্করের ফাঁকি আর ক্ষমতার রাজনীতি এক নয়।

যা হোক, গরু নিয়ে ভারতে যাই ঘটুক না কেন, বাংলাদেশে ভারতীয় গরু সরবরাহের খুব ঘাটতি ঘটেছে বলে কোন খবর সংবাদ মাধ্যমে পাইনি। তবে মাঝে মাঝেই ভেবেছি, আমাদের গরুর মাংসের এত বড় মার্কেট- আর দিন দিন এ মার্কেট বড় হচ্ছে, আমরা নিজেরাই কেন নিজেদের মার্কেটটা দখল করছি না। তা ছাড়া শেখ হাসিনার অর্থনীতি বা হাসিনোমিক্স নিয়ে যখন ভবিষ্যতে গবেষণা হবে নিশ্চয়ই তখন অর্থনীতিবিদদের একটি দিকে বিশেষ খেয়াল দিতে হবে, শেখ হাসিনা কিভাবে অভ্যন্তরীণ মার্কেট গড়ে তুলেছিলেন। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়িয়ে অন্যদিকে নিজস্ব উৎপাদন বাড়িয়ে তিনি কিভাবে ১৬ কোটির এক বিশাল মার্কেট গড়ে তুলেছিলেন। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন আর মার্কেট যদি কোন দেশের শক্তিশালী হয়, তা হলে ওই দেশের অর্থনীতি কখনই কোন বড় বিপাকে পড়ে না। পৃথিবীব্যাপী রিসেশান, ইউরোপীয় রিসেশানের সময়েও তাই বাংলাদেশে তার বিন্দুমাত্র আচড় পড়েনি। এমন একটি অর্থনীতিতে ষোলো কোটি মানুষের গরুর মাংসের মার্কেটে আমদানি মাংস ঢুকবে দিনের পর দিন- এটা তো মেনে নেয়া যায় না।

বছর দুই তিন আগে এ নিয়ে কথা বলেছিলাম অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সঙ্গে। কোন সাক্ষাতকার নয়। এমনি বোঝার জন্য ব্যক্তিগত আলোচনা। অর্থনীতির অনেক কিছু, বিশেষ করে দেশের অর্থনীতির কোন্্ বিষয়টি এখন কী পর্যায়ে আছে, কোথায় যেতে পারে এগুলো বোঝার জন্য অনেক সময় তাঁর সঙ্গে কথা বলি। আমাদের অর্থমন্ত্রীর একটা বড় দিক হলো, অর্থনীতির যে কোন খুঁটিনাটি বিষয়ে যাবতীয় ডাটাসহ তাঁর মনে থাকে। গরুর মাংসের বাজার নিজেদের উৎপাদন দিয়ে মেটানোর বিষয়টি তার কাছে তুলতেই তিনি যেন খুব খুশি হলেন। বাস্তবে তাঁর ভেতর একটা শিক্ষকের চরিত্র আছে। প্রথম জীবনে তিনি শিক্ষক হতেও চেয়েছিলেন। কোন কিছু জানতে বা বুঝতে চাইলে একজন ভাল শিক্ষকের মতো তিনি খুব খুশি হন। তাই গরুর মাংসের কথা উঠতেই তিনি প্রয়াত মন্ত্রী ছায়েদুল হকের কথা বলেন। তিনি বলেন, ভদ্রলোক গরু উৎপাদন ও গরুর দুধ উৎপাদন নিয়ে কতকগুলো ভাল পদক্ষেপ নেন। এ কথা বলেই তিনি বলেন, দেখো তাঁর মতো একজন রাজনীতিবিদ দেশের জন্য এ্যাসেট ছিলেন। কারণ, তিনি সমস্যার সমাধান জানতেন। বলেই অর্থমন্ত্রী বলেন, এখানেই কিন্তু রাজনীতিবিদদের সঙ্গে অন্যের পার্থক্য। অন্যরা সঠিক সমাধানটা জানেন না। অর্থমন্ত্রীর ডিটেইলস কথা থেকে বুঝলাম গরুর মাংস ও দুধ উৎপাদনে শেখ হাসিনার সরকার যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছে তাতে খুব শীঘ্রই দেশ একটা বড় পরিবর্তন দেখতে পাবে। আর সেই পরিবর্তনটিই ছায়েদুল হকের উত্তরসূরি নারায়ণ চন্দ জানালেন এবার, এই ঈদে দেশীয় গরুতে আমাদের মাংসের চাহিদা মিটবে। নারায়ণ চন্দ যোগ্য উত্তরসূরি ছায়েদুল হকের । কারণ, তাঁর সব থেকে বড় গুণ তিনি কাজের প্রতি নিবেদিত, শেখ হাসিনার প্রতি তাঁর শতভাগ আনুগত্য এবং শিক্ষিত মানুষ। তাই তিনি যে দুই বছরে ছায়েদুল হকের কাজগুলো এগিয়ে এনেছেন তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে এবার ঈদের আগেই।

ইতোমধ্যে পত্রপত্রিকায় ও টেলিভিশনে গরুর ফার্মগুলোর যে খবর পাওয়া যাচ্ছে তা সত্যিই সুখবর। কারণ, খুবই আধুনিক উপায়ে গরু পালন করা হচ্ছে দেশে। অর্থাৎ অধিকাংশ ফার্মই বিজ্ঞানভিত্তিক। আবার এই বড় ফার্মের পাশে আছে আরেক ধরনের ফার্ম। তা হচ্ছে প্রতি বাড়িতে ফার্ম। সম্প্রতি সংবাদ সম্পাদক বন্ধুবর আলতামাস কবির মিশুর সঙ্গে তার এলাকা ঘোড়াশালে গিয়েছিলাম। সেখানে বেড়াতে গিয়ে বুঝতে পারি, মিশুর একটা রাজনৈতিক স্বপ্ন আছে। তাছাড়া ওই এলাকার লোকের রয়েছে তাঁর বাবার প্রতি সীমাহীন শ্রদ্ধা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তার বাবা আহমেদুল কবিরকে শ্রদ্ধা করেন। আর ভালবাসেন মিশুকে। তাদের অনেকে মনে করেন আমি শুধু বেড়াতে আসিনি, মিশুর জনপ্রিয়তার খোঁজ নিতেও এসেছি। তাই তারা আমাকে বলেন, চাঁদাবাজি, জমি দখল এসব থেকে বাঁচতে হলে তাদের মিশুকে প্রয়োজন। এমনকি তাদের কয়েকজন এও জানালেন, তারা তাদের জমিতে সাইননবোর্ড লাগিয়ে রেখেছে এই বলে যে- ‘এ জমির মালিক আলতামাস কবির মিশু’। যাতে তাদের জমি কেউ দখল করতে সাহস না পায়। এমন সংবাদ শুনে নিজ চোখে দেখতে গেলাম সে সাইনবোর্ড। পেলাম তার সত্যতা। যা হোক, এই ঘোরাঘুরিতে সব থেকে যেটা চোখে পড়ে তা হচ্ছে, প্রতিটি বাড়িতে একটি করে ফার্ম। ছোট্ট একটা ঘর সেখানে দুটো তিনটে গরু ও বিশ-পঁচিশটি মুরগি পালন করছে। এর পরে অনেকের কাছে তাদের এলাকাগুলোর খোঁজ নিয়েছি। প্রতিটি এলাকায় কম-বেশি চিত্র এক।

বড় ফার্মের ওই সব গরুর পাশাপাশি সারাদেশের এই প্রতিটি বাড়ির ফার্ম থেকে মার্কেটে যে সম পরিমাণ যোগান দেয় তা নিয়ে প্রশ্ন থাকা উচিত নয়। আবার যারা আধুনিক পদ্ধতিতে গরু পালন করছেন তাদের দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন হয়েছে। এক. তারা সকলে এখন সেই সব জাতের গরু পালন করছেন যাতে একটি গরুর বিশ মণ থেকে ত্রিশ মণ মাংস হয়। এ জন্য তারা সিন্ধী, শাহীওয়ালসহ নানা জাতের ভাল ভাল গরু পালন করছেন এবং গরু পালনে তারা সম্পূর্ণ বিজ্ঞানভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছেন। যেমনটি গ্রহণ করা হয়েছে আমাদের ধান ও অন্যান্য ফল উৎপাদনের ক্ষেত্রে। আর এর ফলেই এই কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ ঘোষণা দিতে পারলেন এবার ঈদের জন্য গরু আমদানি করার প্রয়োজন পড়বে না।

নারায়ণ চন্দ্র চন্দ শিক্ষক মানুষ। তিনি আমাদের থেকে অনেক ভাল বোঝেন। তার পরেও তাকে বলব, আপনি এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে মতিয়া চৌধুরীকে অনুসরণ করুন এবং তঁাঁর সঙ্গে কথা বলুন। কারণ, মতিয়া চৌধুরীকে দেখি প্রতি মুহূর্তে তাঁর কৃষির উৎপাদন ও কৃষিতে নতুন নতুন উপাদান যোগ করার চেষ্টা। কারণ, তিনি সব সময়ই বলেন, জমি কমে যাচ্ছে, মানুষ বাড়ছে। এই প্রতিকূল অবস্থায় তাঁকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকতে হবে। তিনি তাই চালের ওপর চাপ কমাতে নানা কিছু যোগ করছেন। ভুট্টা থেকে শুরু করে নানান ফলমূল অবধি। যাতে দেশের মানুষের স্বাস্থ্য ভাল হয় আবার চালের ওপর থেকে চাপ কমে। নারায়ণ চন্দকেও এমনভাবে ভাবতে হবে, একদিকে তাকে যেমন মাংসের উৎপাদন বাড়াতে হবে তেমনি আবার মাংসের ওপর থেকে চাপ যাতে মাছ উৎপাদন আরও বাড়িয়ে কমানো সম্ভব হয়- সেটা দেখতে হবে। পাশাপাশি দেশীয় বাজার পূর্ণ করে তাকে মাংস রফতানির দিকে দেশকে নিয়ে যেতে হবে। সে জন্য এখনই একটা মাস্টারপ্ল্যান দরকার। সে কাজটি তাকে করতে হবে।

swadeshroy@gmail.com