২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ অবিচ্ছেদ্য

  • সিমিন হোসেন রিমি

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক অবিচ্ছেদ্য নাম। দেশপ্রেমের অনন্ত শক্তির উৎস তিনি। বঙ্গবন্ধুর জীবন কর্মচিন্তা-চেতনা সমস্ত কিছু ছিল মানুষকে ঘিরে। মানুষের মুক্তির চিন্তায় যেমন উদগ্রীব ছিলেন তিনি তেমনি সমাধানের পথও খুঁজেছেন বাস্তবতার নিরিখে। বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব সর্বোপরি বাংলাদেশের প্রতীক। বিশ্ব মানচিত্রে যে বাংলাদেশ, সেই বাংলাদেশের প্রতীক তিনি।

জাতীয় শোক দিবসে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি এই বাংলার হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। স্মরণ করছি তাঁর পরিবারের নিহত সকলকে। যাকে হারানোর বেদনা অমোচনীয়। তিনি কালে কালে হয়ে ওঠেন সকল প্রেরণার উৎস। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বঙ্গবন্ধুকে তিলে তিলে জয় করতে হয়েছিল দুর্লঙ্ঘ প্রাচীর। সহ্য করতে হয়েছিল নিদারুণ নিপীড়ন। তারপরও সবকিছু সহ্য করে নিঃস্বার্থ ভালবাসায় তিনি খুঁজেছেন মানুষের সার্বিক মুক্তির পথ। তাঁর চিন্তাকে ঘিরে ছিল মানুষ আর মানুষের কষ্ট মোচনের ভাবনা।

চিন্তা-চেতনা, সাহসে-কর্মে বঙ্গবন্ধু ছিলেন অনন্য। দেশের মানুষের সার্বিক মুক্তির জন্য কী কী চাই তার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা তিনি তাঁর ’৭০- এর নির্বাচনের প্রাক্কালে দলীয় কর্মসূচী হিসেবে ২৮ অক্টোবর ১৯৭০ সালে বেতার ও টেলিভিশনে সুদীর্ঘ লিখিত বক্তব্যে তুলে ধরেন। আজ তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর সেই বক্তব্যের কিছু অংশ তুলে ধরা হলো। ‘পাকিস্তানের জনগণের কাছে আওয়ামী লীগ এ প্রতিশ্রুতি দিতে পারে যে, তারা জনগণের পাশপাশেই থাকবে, স্বৈরাচারী ও শোষকগোষ্ঠীর মোকাবেলার সংগ্রামে নেতৃত্ব দেবে। কোন জাতি কোনদিনই আত্মাহুতি না দিয়ে মুক্তি ও ন্যায়বিচার পায়নি। তাই আজ আওয়ামী লীগ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোকে জানিয়ে দিতে চায় যে, পাকিস্তানের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাদের মোকাবেলা আওয়ামী লীগ অবশ্যই করবে। গণতান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্থা বিঘিœত করা হলে আওয়ামী লীগ সব শক্তি দিয়ে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেই আওয়ামী লীগের জন্ম আর সঙ্কটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই আওয়ামী লীগের বিকাশ। ...বিপুলভাবে বিদ্যুত উৎপাদন ও ব্যাপকভাবে বিজলি সরবরাহ করতে না পারলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সাধিত হতে পারে না।...অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। যমুনা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা স্থাপনের বিষয়টি আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিই।...সুষ্ঠু সমাজ-ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যে শিক্ষা খাতে পুঁজি বিনিয়োগের চাইতে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ আর হতে পারে না। ... জাতীয় উৎপাদনের শতকরা কমপক্ষে ৪ ভাগ সম্পদ শিক্ষা খাতে ব্যয় হওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। কলেজ ও স্কুল, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি করতে হবে। নিরক্ষরতা অব্যশই দূর করতে হবে। পাঁচ বছর বয়স্ক শিশুদের বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষাদানের জন্য একটি ক্রাশ প্রোগ্রাম চালু করতে হবে। মাধ্যমিক শিক্ষার দ্বার সকল শ্রেণীর জন্য খোলা রাখতে হবে। দ্রুত মেডিক্যাল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়সহ নয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দারিদ্র্য যাতে উচ্চশিক্ষার জন্য মেধাবী ছাত্রদের অভিশাপ না হয়ে দাঁড়ায় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।...চিকিৎসা ক্ষেত্রেও এক করুণ পরিবেশ বিদ্যমান। আমাদের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ সামান্যতম চিকিৎসা সুযোগ থেকে বঞ্চিত। প্রতি ইউনিয়নে একটি করে পল্লী চিকিৎসাকেন্দ্র এবং প্রতি থানা সদরে একটি করে হাসপাতাল অবিলম্বে স্থাপনের দরকার।...আওয়ামী লীগ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে আজ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আওয়ামী লীগ দেশবাসীর যে সমর্থন ও আস্থার অধিকারী হয়েছে, তাতে আমরা বিশ্বাস করি যে, ইনশাআল্লাহ আমরা সাফল্যের সঙ্গে এ চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে সক্ষম হবো।’ (তথ্যসূত্র : দৈনিক আজাদ, ২৯ অক্টোবর, ১৯৭০)।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, উদার গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। বাংলার সকল মানুষকে সেই স্বপ্নের ডাকে আকৃষ্ট করতে পেরেছিলেন। যার ফলে জন্মলাভ করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর অনন্য নেতৃত্বের স্পর্শে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ নতুন করে জেগে উঠতে থাকে। এর একটি সুন্দর বিবরণ আমরা পাই ১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর দেয়া ভাষণে। সেই ভাষণের অংশবিশেষ তুলে ধরছিÑ ‘উনিশ শ’ একাত্তর সালের এই ডিসেম্বর আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সমাপ্তি। একই দিনে আমাদের দেশ গড়ার সংগ্রাম শুরু। স্বাধীনতা সংগ্রামের চাইতেও দেশ গড়ার সংগ্রাম বেশি কঠিন। দেশ গড়ার সংগ্রামে আরও ত্যাগ, আরও বেশি ধৈর্য, আরও বেশি পরিশ্রম দরকার।...এর আগে কি নিয়ে আমরা শুরু করেছিলাম? চারদিকে অসংখ্য নরকঙ্কাল, বুদ্ধিজীবীর লাশ, বীরাঙ্গনা মা ও বোনের হাহাকার, অচল কলকারখানা, থানা, আইন-আদালত পর্যন্ত বিধ্বস্ত, ব্যাংকে তালা, ট্রেজারি খালি, রেলের চাকা বন্ধ, রাস্তা-ব্রিজ ধ্বংস, বিমান ও জাহাজ একখানাও নেই। যুদ্ধের জন্য অনেক ক্ষেতে ফসল বোনা সম্ভব হয়নি। পাট ঘরে ওঠেনি। নৌকা, স্টিমার, লঞ্চ, বাস, লরি, ট্রাকের শতকরা সত্তর ভাগ হয় নষ্ট, না হয় অচল। অনেকের হাতে তখন অস্ত্র। তাদের মধ্যে আছে বহু দুষ্কৃতকারী। আমাদের প্রয়োজনীয় সৈন্য ছিল না। পুলিশ ছিল না। জাতীয় সরকারে কাজ চালাবার মতো দক্ষ অফিসারও ছিল না। তখন পাকিস্তানে বন্দী কয়েক লক্ষ বাঙালী। ভারত থেকে ফিরে আসছে প্রায় এক কোটি বাঙালী উদ্বাস্তু,- যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদারের অত্যাচারে দেশত্যাগ করেছিল। তখনই দরকার এদের জন্য রিলিফ আর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা। ক্ষুধার্ত বাঙালীকে বাঁচানোর জন্য চাই অবিলম্বে খাদ্য। ওষুধ চাই। কাপড় চাই। চারদিকে এই চাই চাই আর নাই নাই-এর মধ্যে আমাদের যাত্রা শুরু। উনিশ শ’ একাত্তর থেকে উনিশ শ’ তিয়াত্তর। সময়ের হিসাবে মাত্র দু’বছর। এই দু’বছরে আমরা কি পেয়েছি আর কি পাইনি, আজ তারও খতিয়ান এবং আত্মবিশ্লেষণের দিন। আমি বড় দাবি করি না। আমরা কোন ভুল করিনি বা কোন কাজে ত্রুটি হয়নি এমন কথাও বলি না। শুধু অনুরোধ করব, আপনাদের চারপাশে পৃথিবীর আরও অনেক দেশের ইতিহাসের দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন। আমেরিকা পৃথিবীর সবচাইতে ধনী দেশ। এই আমেরিকাকেও স্বাধীনতা লাভের পর দুই-দুটি গৃহযুদ্ধের মোকাবেলা করতে হয়েছে। আজকের অবস্থায় পৌঁছাতে আমেরিকার সময় লেগেছে প্রায় এক শ’ বছর। সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্রী অর্থনীতি গড়ে তুলতে ত্রিশ বছর প্রত্যেকটি মানুষের একটানা কষ্ট ও পরিশ্রম করতে হয়েছে। সোভিয়েত বিপ্লবের পর প্রথম পাঁচ বছরে দুর্ভিক্ষে মারা গেছে অসংখ্য লোক। সমাজতন্ত্রের শত্রু অসংখ্য লোককে প্রাণদ- দিতে হয়েছে। নয়া চীন সমাজতন্ত্রী বিপ্লবের পঁচিশ বছর পর এখনও খাদ্যে আত্মনির্ভর হয়নি। শ্রমিকদের অল্প মজুরি এবং বছরে দুইপ্রস্থ কাপড় নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। আমাদের প্রতিবেশী মিত্র রাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে এখনও চলছে গরিবী হটাও আন্দোলন।

দুর্ভিক্ষে যাতে মানুষ না মরে চেষ্টা করেছি। ভিক্ষা করে হলেও বিদেশ থেকে খাদ্য এনেছি। বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল ছিল খালি। তবু পরনের কাপড়, রোগের ওষুধ আমদানির চেষ্টা করেছি। এক কোটি উদ্বাস্তুকে ছ’মাসে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। গ্রামে গ্রামে যতটা সম্ভব রিলিফ পৌঁছে দেয়া হয়েছে। সব চাইতে কম সময়ে ভাঙ্গা রাস্তা, রেলব্রিজ মেরামত করা হয়েছে। পাকিস্তানীরা যে ভৈরব সেতু ভেঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা খতম করতে চেয়েছিল, তা আবার তৈরি করা হয়েছে। আমি জানি না, রক্তাক্ত বিপ্লবের পর পৃথিবীর আর কোন দেশে সঙ্গে সঙ্গে গণতান্ত্রিক শাসন চালু করা হয়েছে কি-না। আমার জানা মতে হয়নি। বাংলাদেশে তা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার বিপ্লবের এক বছরের মধ্যে সংবিধান তৈরি করেছে। নির্বাচন অনুষ্ঠান করেছে। ভোট দেয়ার বয়স একুশের বদলে আঠারো বছর করে ভোটাধিকারের সীমানা বাড়িয়েছে। বাংলাদেশের নিজস্ব বিমান এখন উড়ছে দেশ-বিদেশের আকাশে। তৈরি হয়েছে নিজস্ব বাণিজ্যিক জাহাজ বহর। (সূত্র : মূলধারার রাজনীতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল ১৯৪৯-২০১৬, পৃষ্ঠা ৪৫২-৪৫৫, হারুন-অর-রশিদ)

স্বাধীনতা লাভের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ চরম দরিদ্র দেশ থেকে স্বল্পোন্নত দেশের পথে পা বাড়াতে সক্ষম হয়। কিন্তু ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক হত্যাকা- বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার বাস্তব রূপায়ণকে স্তব্ধ করে দেয়। সত্যের জয়কে প্রলম্বিত করা যায় কিন্তু ঠেকিয়ে রাখা যায় না। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি অর্জন করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার দৃঢ় এবং বিচক্ষণ নেতৃত্বে দেশ সুদৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলেছে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতামুক্ত, উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে এক বিস্ময়ের নাম। ছোট ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে ১৬ কোটি মানুষের বসবাস সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখন খাদ্যে আত্মনির্ভরশীল দেশ। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়, বিদ্যুত উৎপাদন বৃদ্ধি, দারিদ্র্যসীমা হ্রাসকরণ, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বে নতুন মর্যাদায় অভিষিক্ত। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ থেমে থাকার নয়।

লেখক : জাতীয় সংসদ সদস্য ও সমাজকর্মী

নির্বাচিত সংবাদ