২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পবিত্র ঈদ উপলক্ষে বেচাকেনার পরিসংখ্যান কোথায়?

  • ড. আরএম দেবনাথ

বছরে দুই বার দুই ঈদের সময় আমি একটা খবরের পিছু নিই। খরবটা সাধারণ মানুষের যারা ঢাকা এবং বিভিন্ন শহরে বসবাস করে, কাজকাম করে। এরা ঈদের সময়ে বাড়ি যায়, গ্রামে যায়। অনেকে একে বলে ‘দেশে যাওয়া’। একটা, দুইটা লোক নয়, লাখ লাখ লোক। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, খেটে-খাওয়া মানুষ, নারী-পুরুষ সবাই। ছেলেমেয়ে, শিশু সন্তান সবাই গ্রামে যায়। অথচ গাড়ি-ঘোড়া সেভাবে নেই। ট্রেনের টিকিট নেই। লঞ্চে টিকিট নেই, বাসের টিকিট নেই। ধনীদের জন্য বিমানের টিকিটও নেই। টিকিট মিললেও এর দাম আকাশছোঁয়া। কত খবর কাগজে। অনিয়ম, দুর্নীতি, দুর্ঘটনার খবর প্রত্যেক দিন। মানুষ মারা যায়। রাস্তায় মাইলের পর মাইল যানজট। ফেরি নেই। এ এক জীবন-যুদ্ধ-নারী-পুরুষ-শিশু, ধনী-গরিব সবাই এই যুদ্ধে জড়িত। বাড়ি যেতে হবে, গ্রামে যেতে হবে, সবার সঙ্গে মিলতে হবে। বাবা-মায়ের সঙ্গে ঈদ করতে হবে। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে ঈদ করতে হবে। সবার সঙ্গে আনন্দ করতে হবে। মাঝে মাঝে মনে হয় এটা হবার নয়। কীভাবে হবে লাখ লাখ লোক যাত্রী, বাড়িমুখী, গৃহমুখী; অথচ পরিবহনের ব্যবস্থা নেই। চাহিদা দশগুণ, সরবরাহ অপ্রতুল। কিন্তু না, শেষ পর্যন্ত দেখা যায় শত বাধা সত্ত্বেও সবাই ঈদের নামাজের পূর্বেই গ্রামে পৌঁছে গেছে। কষ্ট হয়েছে, ভীষণ কষ্ট হয়েছে, সময় লেগেছে পথে কিন্তু শেষ অবধি সবাই গ্রামের সবার সঙ্গে ঈদ। আমার কাছে এটা এক বিস্ময়কর কান্ড! কীভাবে এত লোকের গ্রামে পৌঁছা সম্ভব হলো। ‘ইউটিউব’ এ দেখায়-লঞ্চে মানুষের ভিড়। ট্রেনের ছাদে লোক, বাসের ছাদে লোক। খারাপ লাগে মাঝে মাঝে মানুষের দুঃখ দেখে। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে আনন্দ আসে যখন দেখা যায় শত বাধা-বিপত্তির পরও লাখ লাখ লোক দুই-চারদিনের মধ্যে ঢাকা ছাড়ে। আবার তারা ফেরতও আসে একই কায়দায়। সদরঘাটে দেখা যায় আরেক চিত্র। নবাবপুর রোড থেকে সদরঘাট পর্যন্ত মানুষ যাচ্ছে হেঁটে। মাথায় সুটকেস, জামা-কাপড়, এক হাতে ছোট্ট শিশু, আরেক হাতে কোন একটা বস্তু। মিছিল, হাজার হাজার মানুষের। বরিশাল যাত্রী মানুষের মিছিল। রিকশা নেই, গাড়ি নেই, সিএনজি নেই। পায়ে হাঁটাই একমাত্র বিকল্প। শত হোক বাড়ি ফেরা, শেকড়ের সন্ধানে। আমার কাছে প্রশ্ন, এত লোক বাড়ি যায় এ সময়ে- কিন্তু এর কোন হিসাব নেই। কত লাখ লোক দুই ঈদে বাড়ি যায়। কোন হিসাব নেই।

হিসাব নেই খরচেরও। দুই ঈদে মানুষ উদারহস্তে খরচ করে। প্রথম ঈদে জামা-কাপড়, শাড়ি-লুঙ্গি, বাচ্চাদের জামা-কাপড়, জুতা-মোজা, প্রসাধনী সামগ্রী ইত্যাদি। কোরবানির ঈদে পশুর বাজারে যায় টাকা, বিশাল অঙ্কের টাকা আছে মসলা-পাতির বাজার। বস্তুতপক্ষে বছরের ব্যবসা করে দোকানদাররা। যেন সারা বছরের ব্যবসা দুই মাসে। রোজার ঈদে ডাল, চিনি, পিঁয়াজ, রসুন, ছোলা, সয়াবিন, খেজুর ইত্যাদির বেচাকেনা। ব্যাংকগুলো এসব মাল আমদানির জন্য কোটি কোটি, শত শত কোটি টাকার ঋণপত্র খুলে। প্রতিযোগিতা করে ঋণপত্রগুলো ব্যবসায়ীদের টাকা নেই এসব মাল ছুটিয়ে আনবে বন্দর থেকে। তাদেরকে বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়। এর নাম ‘লেটার অব ট্রাস্ট’। মাল বিক্রি করে ব্যাংকের টাকা দেয়া যায়। বিশ্বাস করে ব্যাংক কাগজপত্র আমদানিকারককে দিয়ে দেয়। এসব নিয়ে কত জালিয়াতি, টাকা মায়া ইত্যাদি। কিন্তু মুস্কিল হচ্ছে এই যে এত বড় ব্যবসা, এত বিশাল পরিবেশ ভোগ্যপণ্য আমদানি তার কোন প্রকৃত হিসাব সরকারীভাবে কখনও কেউ দেয় না। কত চিনি আসল, কত তেল আসল, কত খেজুর আসল, কত পিঁয়াজ আসল তার হিসাব খুঁজে পাওয়া মুস্কিল। এত চাহিদা আছে কিনা তাও বোঝা মুস্কিল। সব মিলিয়ে রোজার ঈদের সময় কোটি কোটি মানুষ কত টাকা ‘ভোগ ব্যয়’ (কনজামশন এক্সপেন্ডিচার) করল তার হিসাব কোথায়? জামা-কাপড়, জুতা-মোজা, প্রসাধনী সামগ্রীতে মানুষ কত টাকা খরচ করল তার হিসাব কোথায় পাওয়া যাবে। ক’দিন বাদেই কোরবানির ঈদ। চারদিকে চলছে প্রস্তুতি। পশুরহাট বসবে। মানুষ মসলাপাতি কিনবে। যারা কোরবানি দেবেন তাদের হিসাবপত্র তৈরি। কিন্তু দুঃখ হচ্ছে এর কোন নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া যায় না। চামড়ার ভিত্তিতে কিছু খবর কাগজে পাওয়া যায়। কিন্তু এর মধ্যে এত গরমিল যে একে নির্ভরযোগ্য কিছু বলা যায় না। কত পশু কোরবানি হলো তার তো একটা হিসাব থাকতে পারত। না, তা সরকারীভাবে পাওয়া যায় না। মসলাপাতির হিসাব তো বহুত দূর। অথচ এসব বেচা-বিক্রির হিসাব হতে পারত। পাইকারি ও খুচরা বিক্রির ইনডেক্স হতে পারত। না, তা হচ্ছে না। বছরে কত লবঙের প্রয়োজন, কত আমদানি হচ্ছে তার হিসাব কোথায়? হিসাব পাওয়া যায় না। তবে এসবের ব্যবসা করে অনেকে শত কোটি টাকার মালিক হচ্ছেন সে সম্পর্কে আঁচ করা যায়। অথচ এর একটা হিসাব পাওয়া গেলে অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে বোঝা যেত। এই ব্যবস্থা কখন হবে। কীভাবে হবে তার কোন লক্ষণ দেখা যায় না।

দুই ঈদে মানুষ কত টাকা খরচ করে তার হিসাব পাওয়া না গেলেও একটা হিসাব পাওয়া যায়। আর সেটা ‘রেমিটেন্সের’। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশীরা প্রতিমাসে দেশে ডলার পাঠায়। রোজা এবং কোরবানির ঈদের সময় একটু বেশি পাঠায় সেটা বরাবরের ঘটনা। প্রত্যেক বছরই দেখা যায় এই দুই উপলক্ষে রেমিটেন্স বাড়ে। বর্তমানে মাসে এক বিলিয়ন (শত কোটি) ডলারেরও ওপরে দেশে রেমিটেন্স আসে। টাকার এর পরিমাণ অনেক। কম করে হলেও তা হবে হাজার দশেক কোটি টাকা। এই টাকা বোঝা যায় ঈদ উপলক্ষেই খরচ হয়। এ ছাড়া আছে দশ লক্ষাধিক সরকারী কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা ও বোনাস। ‘আছে লাখ লাখ বেসরকারী কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও বোনাসের টাকা। এর পরিমাণ কত তারও হিসাবে পাওয়া যাওয়ার কথা। কিন্তু এর কোন ব্যবস্থা নেই। অবশ্য লক্ষণ দিয়ে কিছু আঁচ করা যায়। যেমন গত ঈদে ৩০ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট বাজারে ছাড়া হয়। তার মানে মানুষ পুরনো ৩০ হাজার কোটি টাকা দিয়ে ব্যাংকের কাছ থেকে নতুন ৩০ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে। দেখা যায় ঈদের সময় মানুষ নতুন নোট ব্যবহার করতে পছন্দ করে। তার মানে কী এই ৩০ হাজার কোটি টাকা ঈদ উপলক্ষে খরচ হবে? এটা মনে করা যায়। পশুর বাজারে কত টাকা লেনদেন হয়। ঈদ উপলক্ষে মোট কত পশু বেচা-কেনা হয়। খামারিরা কত পশু বিক্রি করে। সাধারণ গৃহস্থ কত পশু বিক্রি করে এরও কোন তথ্য নেই। বস্তুত সারা দেশে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় না। যে জন্য অনেক দিন থেকে সরকারী পরিসংখ্যানের গুণগতমান নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। অনেক খবরেই দেখা যায় উপজেলা পর্যায়ে পরিসংখ্যান বিষয়ে পাস করা এবং অভিজ্ঞ কোন কর্মকর্তা নেই। পিয়ন-চাপরাশি গোছের লোক দিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়েও তাই। ‘বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্রাটি স্টিকস’ (বিবিএস) বলে একটি সংগঠন আছে। সেখানে ‘পরিসংখ্যানের’ লোকের অভাব। বিভিন্ন বিভাগের অপরিসংখ্যানবিদরা এই প্রতিষ্ঠান চালায় বলে অভিযোগ সর্বত্র। এ জন্য সরকারের একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা এক আলোচনা সভায় বলেছিলেন ‘বিবিএস’ একটি ‘বামন’ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। অথচ স্বাধীনতার ৪৬-৪৭ বছরে এতদিন ‘বিবিএস’ একটি শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত হওয়ার কথা। যদি হতো তাহলে আমরা ‘পাইকারি’, ‘খুচরা’ ব্যবসাসহ যাবতীয় খুঁটিনাটি তথ্য আমরা হাতের কাছে পেতাম।