২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ কুরবানির ঈদের আনন্দ বৈভব

  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

কুরবানির ঈদ বিশ্ব মুসলিম মননে আত্ম্যোৎসর্গের আনন্দ বৈভব বহন করে আনে। কুরবানি বা কুরবান শব্দ মূল হচ্ছে কুরব অর্থাৎ নৈকট্য। আল্লাহর কুদরত অর্জনের জন্য এ এক অনন্য মাধ্যম। মানব সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় অনাদিকাল থেকে পৃথিবীর প্রত্যেক ধর্মেই পশু উৎসর্গ করার রীতি বিদ্যমান ছিল এখনও আছে।

হযরত আলায়হিস সালাম ও আদিমাতা হযরত মা হাওয়া আলায়হাস সালামের মধ্যে বিয়ে সম্পন্ন হয় জান্নাতে। আল্লাহ্ হযরত আদম আলায়হিসসালামকে বলেন : হে আদম তুমি তোমার স্ত্রীকে নিয়ে জান্নাতে থাক। যেখানে ইচ্ছে যাও, যা ইচ্ছে খাও, কিন্তু এই গাছটির কাছে যেও না। কিন্তু একদিন স্ত্রী-হাওয়া আলায়হাস সালামকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ঐ নিষিদ্ধ গাছের কাছে গেলেন এবং ঐ গাছের লাল টসটসে ফল সংগ্রহ করে খেতে উদ্যত হন। আল্লাহর হুকুম অমান্য করার জন্য তাঁদেরকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়ে পৃথিবীতে পাঠানো হয়। হযরত আদম আলায়হিস সালামকে অবতরণ করানো হয় শ্রীলঙ্কার একটি পাহাড়ের চূড়ায় এবং মা হাওয়াকে অবতরণ করানো হয় লোহিত সাগরের তীরে মরুময় একটি স্থানে। সে স্থানের নাম জেদ্দা। তখনও মানব সভ্যতার বিকাশ ঘটেবি। সেই আলাদা আলাদা প্রায় দেড় হাজার মাইলের দূরত্বে তাঁদের এই ভুলের জন্য তওবা এশতেগফার করতে থাকেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর ধরে তাঁরা আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করেন। এই বলে : হে আমাদের রব আমরা আমাদের নফসের ওপর জুলুম করেছি, আপনি যদি ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন তা হলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাব। এরপর তাঁরা হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর উসিলা দিয়ে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ তাঁদের তওবা কবুল করলেন এবং দু’জনকে মক্কা থেকে পনেরো কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত আরাফাত ময়দানে একত্রিত করলেন। আরাফাত দীর্ঘ সাড়ে তিন হাজার বছর পরে। দু’জন মুখোমুখি হলেন। দু’জনের মধ্যে নতুন করে পরিচয় হলো। আদমকে (আলায়হাস সালাম) বললেন আপনি কে? আদম আলায়হাস সালাম বললেন আমি মৃত্তিকা থেকে উত্থিত আদম। হাওয়া আলায়হিসসালাম বললেন, আমি নর পিঞ্জর থেকে সৃষ্ট হাওয়া। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো তাঁরা দ্রুত পায়ে পশ্চিমের দিকে এগিয়ে গেলেন। তিন মাইল এসে পাহাড় বেষ্টিত মুযদালিফা নামক স্থানে রাত যাপন করলেন। মুযদালিফা মানে নিকট থেকে নিকটতর হওয়া। সেই রাতেই তাঁরা প্রজনন ক্রিয় সম্পন্ন করলেন। সেদিনকার সকাল তাঁদের কাছে ছিল অত্যন্ত মধুময়। সকালে তাঁরা এক অজানা ইঙ্গিতে পশ্চিমের দিকে অগ্রসর হলেন এবং প্রায় আট মাইল পশ্চিমে এসে পাহাড় বেষ্টিত বাক্কা উপত্যকায় এসে বসতি স্থাপন করলেন। তাঁদের সন্তান-সন্তুতি জোড়ায় জোড়ায় হতে লাগল। এক জোড়া মেয়ে এবং অন্য জোড়া ছেলের সঙ্গে বিয়ে সম্পর্ক স্থাপনের রীতি চালু হলো। কিন্তু এ ব্যাপারে বাদ সাধলেন আদমপুত্র কাবিল। তিনি চাইলেন তাঁর যমজ বোন আকলিমাকে বিয়ে করতে। রীতি অনুযায়ী আকলিমার বিয়ে হবার কথা হাবিলের সঙ্গে কিন্তু জেদ ধরে বসলেন কাবিল। আদম (আঃ) তখন দুই পুত্রকে বললেন তোমরা কুরবানি দাও যার কুরবানি আল্লাহ কবুল করবেন তাঁর সঙ্গে আকলিমার বিয়ে হবে। তখন হাবিল একটা মোটাতাজা দুম্বা কুরবানির উদ্দেশ্যে পাহাড়ের ওপর রেখে আসলেন এবং কাবিল কিছু ফশল একইভাবে পাহারের ওপর রেখে আসলেন। এমন সময় আকাশ থেকে বিদ্যুত বর্ষণ হয়ে হাবিলের রেখে আসা দুম্বা উড়ে ছাই হয়ে গেল। এতে প্রমাণিত হলো আল্লাহ্ হাবিলের কুরবানি কবুল করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই হাবিলের সঙ্গেই আকলিমার বিয়ে হওয়ার কথা কিন্তু কাবিল তা মানতে রাজি হলো না। সে হাবিলকে গোপন স্থানে নিয়ে গিয়ে পাথর মেরে হত্যা করল। মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম হত্যাকা- সংগঠিত হলো একজন নারীকে কেন্দ্র করে। তার সঙ্গে কুরবানির রীতি উচ্চকিত হলো।

ঈদ-উল-আজহার সঙ্গেও আত্ম কুরবানির চেতনা অনুরণিত হয়েছে।

মুসলিম জাতির জনক হযরত ইব্রাহিম আলায়হিস সালামের প্রথম স্ত্রী ফিলিস্তিনি কন্যা সারার গর্ভে কোন সন্তান না হওয়ায় হযরত ইব্রাহিম আলায়হিস সালাম মিসরীয় কন্যা হাজেরা আলায় হাসসালামকে বিয়ে করে আনলেন। তখন ইব্রাহিম—— বয়স আশি বছরের উর্ধে। তিনি একটি পুত্র সন্তানের জন্য আল্লাহর নিকট মোনাজাত করলেন, আল্লাহ তার দোয়া কবুল করলেন। একটি নেক পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করলে তার নাম রাখা হলো ঈসমাইল কিন্তু আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে শিশুপত্রসহ মা হাজেরাকে হাজার মাইল দূরে বাক্কা উপত্যকায় রেখে এলেন। এখানে সেই বিরান ভূমিতে হযরত ঈসমাইল আলায়হাসসালাম মায়ের তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠতে লাগলেন। একদিন ইব্রাহিম আলায়হাসসালাম স্বপ্নে দেখলেন তিনি তার পুত্র ঈসমাইলকে যবেহ করছেন তিনি মক্কায় এসে বালকপুত্র ঈসমাইলকে এই স্বপ্নের কথা বললেন, হযরত ঈসমাইল আলায়হিসসাল্লাম বললেন আব্বা, আপনি স্বপ্নে যা দেখেছেন সেটাই করুন ইনশাল্লাহ আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। তখন ইব্রাহিম আলায়হিসসালাম কাবা শরীফ থেকে তিন মাইল পূর্বে পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে মিনা নামক স্থানে এলেন পথিমধ্যে তিনটি স্থানে শয়তান তাদেরকে এই যবেহ না করার জন্য প্ররোচিত করতে লাগল। তারা তখন পাথর ছুঁড়ে শয়তানকে তাড়িয়ে দিল। মিনাতে এসে ইব্রাহিম আলায়হিসসালাম পুত্র ঈসমাইলকে কাত করে শুইয়ে তাঁর গলায় ছুরি চালালেন কিন্তু আল্লাহর তরফ থেকে অহি এলো হে ইব্রাহিম তুমি ক্ষান্ত হও, তুমি তো স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করে ফেলেছ। এটা ছিল পরীক্ষা। আল্লাহর নির্দেশে জান্নাত থেকে একটি দুম্বা অবতীর্ণ হলো এবং সেই দুম্বা ঈসমাইলের বিনিময়ে কুরবানি দেয়া হলো এবং এটা একটা বিধান হিসেবে বলবত হলো, সেই কুরবানির অনুরণন ঘটে ঈদ-উল আজহাতে পশু কোরবানির মাধ্যমে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন ‘ওরে হত্যা নয়, এ সত্যগ্রহ শক্তির উদ্বোধন।’

উচ্চবিত হয় ঈদ-উল-আজহার আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও বিরাটত্ব।

আল্লাহ আকবর, আল্লাহ আকবর লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ আল্লাহু আকবর আল্লাহু আকবর অলিল্লাহিল হামদÑ আল্লাহ মহান আল্লাহ মহান আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। আল্লাহ মহান আল্লাহ মহান এবং যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহরই জন্য।

এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৮৪ খ্রিঃ বর্তমান লেখক স্টিমারে হজ গমনের কালে শ্রীলঙ্কা দেখতে যান যার চূড়ায় হযরত আদম (আঃ) জান্নাত থেকে অবতরণ করেছিলেন সেই পাহারের নাম খ্রীস্টানরা বলেন, এ্যাডামস পিক, হিন্দু ও বৌদ্ধরা বলেন, শ্রী শ্রী পাদম আর মুসলমানরা বলেন, বাবা আদম পাদম। ২০০৬ খ্রীঃ বর্তমান লেখক স্ত্রী মায়া ও একমাত্র পুত্র মিঠুকে সঙ্গে নিয়ে হজে যান। জেদ্দাতে এই সময় এসে মা হাওয়া আলায়হাসলামের মাজার যিয়ারত করেন। মাজায়ের দেয়ালে লেখা আছে মাক্বিরা উন্মুনা হাওয়া।

লেখক : পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ

উপদেষ্টা ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহাম্মদ (সা.)

নির্বাচিত সংবাদ