২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দগদগে আগুনে পোড়া লোহা পিটিয়ে বানানো হয় দা ছুরি চাপাতি

দগদগে আগুনে পোড়া লোহা পিটিয়ে বানানো হয় দা ছুরি চাপাতি
  • ঠংঠং শব্দে মুখর কামারপাড়া

জনকণ্ঠ ফিচার ॥ ঈদ-উল-আজহার পশু জবাই থেকে শুরু করে কোরবানির মাংস বানাতে ছুরি, চাপাতি, দা, বটি ও কুড়াল অত্যাবশ্যক। কোরবানির আগে এসব উপকরণ হাতের কাছে না থাকলেই নয়। আর মাত্র তিন দিন পরই কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে কয়লার দগদগে আগুনে লোহাকে পুড়িয়ে পিটিয়ে এগুলো নতুনভাবে তৈরি করতে ও পুরনোগুলো শাণ দিতে এখন মহাব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন জেলার কামাররা।

ইতোমধ্যে পশুর হাটের মতো জমে উঠেছে দা-ছুরি ও চাপাতির বাজার। কামারপাড়ার লোহা পেটানোর শব্দই জানিয়ে দিচ্ছে কোরবানি ঈদের আগমনী বার্তা। সারাবছর কামাররা অলস সময় কাটালেও কোরবানি ঈদের আগে তাদের থাকে মহাব্যস্ততা। ঈদকে সামনে রেখে এসব মালামালের চাহিদা পূরণ করতে এখন কোন কামারের চোখেই ঘুম নেই। দিন-রাত সমানতালে তারা কাজ করছেন। ফলে গরম লোহা পেটানোর ‘ঠং ঠং’ শব্দে মুখরিত হয়ে উঠেছে নগরীর কামারপট্টিগুলো।

বরিশাল থেকে খোকন আহম্মেদ হীরা জানান, নগরীর কামারপট্টির কামারদের এখন দম ফেলার সময় নেই। একের পর এক ক্রেতা এসে দোকানে ভিড় করছেন। ফলে দোকান ছেড়ে যাওয়ারও কোন উপায় নেই। তাই সকাল, দুপুর ও রাতের খাবার তারা (কামার) দোকানে বসেই সেরে নিচ্ছেন। পুরনো দুটি দা, একটি বটি ও একটি ছুরিতে শাণ দেয়ার জন্য কামাররা তিনশ’ পঞ্চাশ টাকা রাখছেন। অন্য সময়ে এর মজুরি ছিল দেড়শ’ টাকা। আর নতুন একটি ছুরি ৩৫০ থেকে চারশ’ টাকা, বিভিন্ন সাইজের চাকু ৫০ থেকে একশ’ টাকা, বটি দুই থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি করছেন। ক্রেতারা জানান, অন্য সময়ের চেয়ে এখন দ্বিগুণ দাম রাখা হচ্ছে।

কোরবানিদাতা পরিবারের সদস্যরা কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত কসাই ও মৌসুমি কসাইরা নিজেদের চাহিদামতো দা, ছুরি, চাকু, চাপাতি, কুড়াল, বটি বানাতে সবাই ছুটছেন কামারদের কাছে। বরিশাল নগরীর হাটখোলা, নতুন বাজার, বাংলাবাজার, নথুল্লাবাদ সেন্ট্রাল পয়েন্ট মার্কেট, পলাশপুর বৌবাজার বেলতলা, তালতলী বাজার, সদর উপজেলার চরকাউয়া, সাহেবেরহাট, লাহারহাটসহ ছোট-বড় সকল হাটের কামাররা এখন মহাব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।

কামাররা জানান, এ পেশায় অধিক পরিশ্রম। শ্রম অনুযায়ী তারা এর যথাযথ মূল্য পান না। কারণ লোহার বাজারে দাম বেশি। জীবিকা নির্বাহে কষ্ট হলেও শুধু পরিবারের ঐতিহ্য ধরে রাখতে অধিকাংশ কামার এ পেশাটিকে এখনও আঁকড়ে রেখেছেন। কোরবানির পশুর জন্য ধারালো দা, বটি, চাকু, চাপাতিসহ অন্য সামগ্রীর বেশি প্রয়োজন হওয়ায় সকলেই এখন ছুটছেন কামারদের কাছে। ফলে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে জমজমাট হয়ে উঠেছে কামারপাড়া।

পলাশপুর বৌবাজারের কামার বিপুল কর্মকার বলেন, এবারের ঈদের চাহিদায় দিনরাতে ২০ থেকে ৩০টি কাজে গড়ে প্রতিদিন তিনি খরচ বাদে এক থেকে দেড় হাজার টাকা আয় করছেন। তিনি আরও জানান, একটি বড় দা পাঁচ কেজির লোহা দিয়ে তৈরি করে মজুরিসহ সাতশ’ টাকা, কুড়াল এক কেজির দুই থেকে আড়াইশ’ টাকা, চাপাতি প্রকার ভেদে চার থেকে পাঁচশ’ টাকা, বড় ছুরি ওজন মতে তিন থেকে সাড়ে ছয়শ’ টাকা, কুড়াল তিন থেকে চারশ’ টাকা দরে বিক্রি করছেন।

কামারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোরবানির ঈদের সময় তাদের যে বেচাকেনা হয় তা আর অন্য কোন সময় হয় না। তাই এ ঈদের আগে পেশাজীবী কামারদের সচ্ছল হওয়ার মোক্ষম সময়। এ কারণে অনেক কামার পূর্ব থেকেই ধারালো এসব মালামাল মজুদ করে ঈদের সময় বিভিন্ন হাট-বাজারে বিক্রি করে থাকেন।

মুন্সীগঞ্জ ॥ মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল জানান, মুন্সীগঞ্জের কামারপাড়াগুলো টুং-টাং শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে। ব্যস্ত সময় পার করছেন এখন কামার শিল্পীরা। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের সবকটি কামারপাড়ায় চলছে কোরবানির পশু জবাই, মাংস কাটা এবং চামড়া ছিলানোর কাজে ব্যবহৃত চাপাতি, দা, ছুরি আর বটি তৈরির ও ধার দেয়ার কাজ। আর এ কাজে নিয়োজিত শিল্পীদের এখন নাওয়া-খাওয়া ও ঘুম প্রায় হারাম হয়ে উঠেছে। ক্রেতাদের চাহিদামতো তৈরি করতে শিল্পীরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তাদের নিজ হাতে লোহা পিটিয়ে ঠুং ঠাং শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে প্রতিটি কামারপাড়া।

সরেজমিন জেলার বিভিন্ন হাটবাজারে গিয়ে দেখা যায়, কামার শিল্পীরা অনেক ব্যস্ত সময় পার করছেন। দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছে ততই যেন তাদের ব্যস্ততা বেড়েই চলছে। নিজেদের তৈরি এসব পণ্য জেলার বিভিন্ন হাটবাজারে সরবরাহ করছেন তারা। সিরাজদিখান বাজারের কামার শিল্পী সাধন দাস বলেন, সারা বছর তৈরি করা পশু জবাইয়ের এসব পণ্য ঈদ মৌসুম ছাড়া বিক্রি হয় না। তাই ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ততা বেড়েই চলছে।

নওগাঁ ॥ বিশ্বজিৎ মনি জানান, ক্রমে ক্রমে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী কামার শিল্প। আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার, প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব, কারিগরদের মজুরি বৃদ্ধি, তৈরি পণ্যসামগ্রীর বিক্রয় মূল্য কম, কয়লার মূল্য বৃদ্ধি, বিদেশ থেকে বড় বড় ব্যবসায়ীদের স্টিল সামগ্রী আমদানি, চরম আর্থিক সঙ্কট, উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা কম ও বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে এ শিল্প আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। তার পরেও আসন্ন ঈদ-উল-আজহাকে সামনে রেখে উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে কামারপট্টিতে দেশী প্রযুক্তির ছুরি, কাটারি, বটি, দা ও কুঠার বানাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কর্মকার সম্প্রদায়ের মানুষ।

সরেজমিনে কামার পল্লী ও হাট-বাজারগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, কয়লার আগুনে লাল টকটকে তেতে ওঠা লোহায় হাতুড়ি দিয়ে দু’দিক থেকে ইচ্ছামতো পেটাচ্ছেন কামাররা। লোহায় হাতুড়ি পেটায় ছড়াচ্ছে আগুনের স্ফুলিঙ্গ। লাল রং ফিকে হয়ে এলে পানিতে ভিজিয়ে আবারও পেটানো হচ্ছে। কেউ বা শাণ দিয়ে ধার দিচ্ছে ছুরি-কাটারি। রেত দিয়ে কেউ আরও ধারালো করছে দা কিংবা বটি। এখন ২৪ ঘণ্টা টুং-টাং শব্দ লেগেই আছে।

নির্বাচিত সংবাদ