২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রশ্নবিদ্ধ কলরেট

দেশে মোবাইল কোম্পানিগুলো একচেটিয়া ব্যবসা করে আসছে দীর্ঘদিন থেকে। এক্ষেত্রে গ্রাহক সেবা প্রাধান্য পায়নি কখনই। নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিটিআরসিও তাদের ওপর কোন খবরদারি তো দূরের কথা, দেখভালের ব্যবস্থাও ছিল না বললেই চলে। ফলে গ্রাহকরা প্রায় বঞ্চিত থেকে গেছে আধুনিক যোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তির সুযোগ-সুবিধা থেকে। এই সুযোগে মোবাইল কোম্পানিগুলো ফুলেফেঁপে ক্রমশ পরিণত হয়েছে মহীরুহে। সেক্ষেত্রে মুনাফার অনুপাতে সরকারের ঘরে যে রাজস্ব জমা পড়েছে আশাব্যঞ্জক হারে, তাও নয়। বরং অবৈধ ভিওআইপিসহ অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে গ্রাহকদের পকেট থেকে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে লাখো কোটি টাকা। এই দুর্নীতি-অনিয়ম যে এখনও বন্ধ হয়েছে, এমন বলা যাবে না। এত বিতর্ক ও আলাপ-আলোচনার মধ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি গত ১৪ আগস্ট মধ্যরাত থেকে অফনেট-অননেট বিভাজন তুলে দিয়ে সর্বনিম্ন অভিন্ন কলরেট নির্ধারণ করে দিয়েছে প্রতি মিনিট ৪৫ পয়সা করে। আর সর্বোচ্চ কলচার্জ নির্ধারণ করে দেয় প্রতি মিনিট দুই টাকা। তবে অভিজ্ঞ এবং ওয়াকিফহালদের মতে, বিটিআরসির এই সিদ্ধান্ত গ্রাহকদের বঞ্চিত করে প্রকারান্তরে কোম্পানিগুলোর মুনাফা অর্জনের পথই প্রশস্ত করে দেয়া হয়েছে। এর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রশস্ত করা হয়েছে সরকারের আয় বৃদ্ধির।

বাংলাদেশ মোবাইল ফোন গ্রাহক এ্যাসোসিয়েশনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে ধরা পড়েছে শুভঙ্করের এই ফাঁক ও ফাঁকি। মোবাইলে অননেট ও অফনেটের বিভাজন উঠে যাওয়ায় অফনেট কলচার্জ যতটা কমবে বলে আশা করা হয়েছিল, বাস্তবে তা হয়নি। বিভিন্ন অপারেটরের নতুন নতুন অফার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে আগের অফনেটের মতো উচ্চহারের কলচার্জ বহাল আছে। আবার সর্বনিম্ন কলচার্জ আগে যেখানে অপারেটরভেদে প্রতি মিনিট ৩০ পয়সা থেকে ৩৯ পয়সা ছিল, তা বেড়ে হয়েছে ৫৬ পয়সা থেকে ৬১ পয়সা। অনুরূপ এসএমএস করার ক্ষেত্রেও ব্যয় বেড়েছে; এর সঙ্গে ভ্যাট এসডি (সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি) ও সারচার্জ সংযুক্ত হয়ে। অর্থাৎ এর সঙ্গে প্রায় ২১ শতাংশ ভ্যাট, এসডি ও ওএসসি যোগ হচ্ছে। প্রায় সব অপারেটরের ক্ষেত্রেই একই অবস্থা। অপারেটর ও অফারভেদে এসব সর্বনিম্ন কলচার্জ প্রতি মিনিট ৪৮ পয়সা থেকে ৬২ পয়সা পর্যন্ত। আর সর্বোচ্চ হচ্ছে এক টাকা ৩০ পয়সা পর্যন্ত। মজার বিষয় হলো, অপারেটরদের পক্ষ থেকেও স্বীকার করা হচ্ছে দর বৃদ্ধির বিষয়টি। আগে প্রতি মাসে আরপু (এভারেজ রেভিনিউ পার ইউজার) ছিল গড়ে ১২২ টাকা। নতুন কলচার্জে তা ১৩০ থেকে ১৩২ টাকা হতে পারে। এর সঙ্গে সমন্বয় করে বাড়বে সরকারের আয়। বিশ্লেষকদের মতে, গ্রাহকের স্বার্থ বিবেচনা না করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির এহেন একতরফা সিদ্ধান্ত নেয়া আদৌ সঠিক ও সমীচীন হয়নি। প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়নের সঙ্গে এই খাতের সেবার খরচও কমছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশে ঘটছে ঠিক তার উল্টো। জনস্বার্থ বিবেচনায় মোবাইল গ্রাহকদের ব্যয় বাড়ানোর বিষয়টি ঠিক তো নয়ই, সমর্থনযোগ্যও নয়। বিটিআরসি বরং জনগুরুত্বসম্পন্ন বিবেচনায় এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে জনমত যাচাই তথা গণশুনানির আয়োজন করতে পারত। তবে সময় বোধকরি এখনও শেষ হয়ে যায়নি।

সার্বিক অর্থে একটি আধুনিক ও উন্নত ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলা বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ স্বউদ্যোগে পৃথিবীর কক্ষপথে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট তথা টেলিযোগাযোগ উপগ্রহ স্থাপন করেছে। সেটি কাজও শুরু করেছে। সেই অবস্থায় দেশবাসী সঙ্গত কারণেই আশা করে কলরেট কমিয়ে আনার, বাড়ার নয়। দেশে মোবাইল ফোন গ্রাহকের সংখ্যা যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। এই অগ্রগতিকে ব্যাহত করা আদৌ সমীচীন হবে না।