১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মানবিক বাংলাদেশের প্রযুক্তি ভাবনা

  • রেজা সেলিম

আমরা যে মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি সেই বাংলাদেশের সংস্কৃতি এই ডিজিটাল যুগে কেমন থাকবে এই নিয়ে আমাদের ভাবনা আছে। দুশ্চিন্তাও আছে হয়তো আমাদের গানগুলো একদিন নদী-প্রান্তর ছাড়িয়ে গাওয়া শিল্পীর আবেগের কাছে আর প্রকৃতির কাছে থাকবে না, সবই চলে যাবে ইউটিউবের হাতে। আর প্রদর্শিত হবে টেলিভিশন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ আর মোবাইলের পর্দায়। প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই সংরক্ষণের কোন ক্ষতি নেই কিন্তু আমাদের ভাবনা আমাদের সংস্কৃতির হাজার বছরের দর্শন তখন যেন বাক্স বা যন্ত্রবন্দী বা গৃহবন্দী না হয়ে পড়ে!

ক্যাসেটের যুগের প্রথম দিকে তো তাই-ই হয়েছিল। গ্রামোফোন ছেড়ে সবাই গান শুনত ক্যাসেট প্লেয়ারে আর এখন তা প্রায় হারিয়েই গেছে। এসে যোগ হলো সিডি রম বা ডিভিডি। আজকাল মঞ্চের অনুষ্ঠানে নাচের সঙ্গের গান তো সিডি থেকেই বাজানো হয়। এনালগ সিনেমার যুগে লিপ মিলিয়ে গান যোগ করা হতো। এই যে প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবার চেষ্টা সেটা নতুন নয় কিন্তু সেখানে নিজেদের ‘স্বকীয়তা’ বলতে যা বুঝায় তা যেন অক্ষুণœ থাকে। অনেক ক্ষেত্রে গা ভাসিয়ে আমরা অক্ষুণ্ণ থাকার এই চিরকালের বৈশিষ্ট্য প্রায় হারিয়ে ফেলতে বসেছি। অনেকে একে নতুনের সঙ্গে পুরনোর দ্বন্দ্ব বলে দায়িত্ব এড়িয়ে যান আমার চোখে তা ঠিক নয়; কয়েকটি উদাহরণ দিলে হয়তো কারও কারও কাছে তা স্পষ্ট হবে।

ডাক পিয়ন বাড়ি এসে যে চিঠি দিয়ে যেত, আর আমরা দিনের পর দিন যার জন্য অপেক্ষা করতাম, সেই হাতে লেখা চিঠি তো হারিয়েই গেছে! চিঠির খামের যে সুবাসমাখা আবেগ তা নিয়ে নিয়েছে ই-মেইল। এখন ধুপ করে একটা মেইল আসে ইনবক্সে, আমরা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়ে দেই আর সঙ্গে সঙ্গে প্রাপকের কাছে তা পৌঁছে যায়। দশ-পনেরো বছর আগে কি সেটা ভাবা যেত? অবিশ্বাস্য ছিল তা। আমার মনে আছে ২০০০ সালে রামপালের গ্রামে আমরা যখন ইন্টারনেট আর ই-মেইলের গল্প করেছি তখন কেউ তা বিশ্বাস করতে পারেনি। আমার জাপানী সহকর্মী ইউকা ইয়ামাগুচি ঢাকায় আমার কাছে ই-মেইল পাঠিয়ে আবার তার উত্তর নিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই গ্রামবাসীকে দেখাত! এসব দেখে কী জানি কী ভেবেছে তাঁরা তখন, কিন্তু এখন বাস্তবতা এই যে, রামপালের কোন মানুষ আমাকে আর চিঠি দেয় না, প্রায় ১০০ ভাগ চিঠিই আমি পাই ই-মেইলে। ছেলেমেয়ের বিয়ের দাওয়াত বা কোন সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য একটা ফোন দিয়ে বলেন, ‘আমি মেইলে বিস্তারিত পাঠায়ে দিবানি’!

আমরা তো তা মেনে নিয়েছি বা গ্রহণ করেছি। এই যে পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয়া এটাই বাঙালী সংস্কৃতির ধর্ম (রিলিজিয়ন অর্থে নয়)। ডিজিটাল যুগে এসে আমরা যে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছি তার সঙ্গে আমাদের মিলিয়ে নিতে হবে আমার কাজ ও চিন্তা। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে যে দেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে সে প্রযুক্তির পরাধীনতা মেনে নেবে কেন?

কিন্তু অনেকেই সে উপায় বুঝতে পারেন না বা ই-রেডিনেসের যুগে আমরা তা অনুমান করে উঠতে পারিনি। পাকিস্তানী আমলে যখন রোমান হরফে বাংলা ব্যবহার করতে আমাদের বাধ্য করা হচ্ছিল, আমরা তো সগর্ভে প্রতিবাদ করে তা প্রত্যাখ্যান করেছিলাম; কিন্তু এখন আমরা এস এম এস করি রোমান হরফে, যাকে কেউ কেউ ‘বাংলিশ’ বলেন। আমাদের দেশের প্রযুক্তিবিদেরাও কিন্তু বসে নেই, তাঁরা এর প্রতিবাদ করেছেন ও বাংলায় যাতে আমরা সঠিক বানানে কম্পিউটার বা মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারি তার ব্যবস্থা করেছেন। এখন দেখতে হবে আমরা যেন তার সুপ্রযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করি। এ প্রসঙ্গে মানবিক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের একটি অনুষ্ঠানে দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন যা অতি স্মরণীয়- ‘ইদানীং বাংলা বলতে গিয়ে ইংরেজী বলার একটা বিচিত্র প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জানি না, অনেক ছেলে-মেয়ের মাঝে এখন এটা সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে গেছে। এভাবে কথা না বললে যেন তাদের মর্যাদাই থাকে না- এমন একটা ভাব।’ তিনি বলেন, ‘এই জায়গা থেকে আমাদের ছেলেমেয়েদের বেরিয়ে আসতে হবে। যখন যেটা বলবে সঠিকভাবেই উচ্চারণ করবে এবং বলবে’। তিনি ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট স্মরণ করে বলেন, ‘আমাদের ভাষার ওপর বার বার আঘাত এসেছে। এটাকে কখনও আরবি হরফে এবং কখনও রোমান হরফে লেখার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু বাঙালী কখনও তা মেনে নেয়নি। এটা হচ্ছে বাঙালীদের চরিত্র, অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা। এ জন্যই আমরা সবসময় বলি একুশ আমাদের শিখিয়েছে মাথা নত না করার। সেভাবে আমরা স্বাধীনতাও অর্জন করেছি এই সংগ্রামের পথ বেয়ে। অন্য ভাষার প্রতি তাঁর কোন বৈরিতা নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তবে, নিজের ভাষা আগে শিখতে হবে। সেই সঙ্গে অন্য ভাষাও আমরা শিখব।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অন্য ভাষা শিখতে হবে। কিন্তু মাতৃভাষাকে ভুললে চলবে না। এটাই হচ্ছে আমাদের কথা। ভাষা শিক্ষার মধ্যে আলাদা একটা মাধুর্য আছে। পৃথিবীতে একমাত্র মানব জাতিরই ভাষা আছে। তারাই কেবল বলতে পারে।’

এই যে বাঙালী মানব জাতির সুললিত বাংলা ভাষা তাকে প্রযুক্তি কখনই উল্টোপথে আমাদের টেনে নিতে পারে না। যেমন পারবেনা আমাদের স্বাজত্যবোধ, নিজেদের করে গড়ে তোলা অহিংস মানবতাবোধ, আমাদের হাসি কান্না আর অভিমানের জীবন এসব কেমন করে যন্ত্রবন্দী হবে? বাংলাদেশের প্রকৃতি, নদী আর ভাটিয়ালী সুর যেভাবেই ইউটিউবে বাজুক ওই যে তার ‘মাধুর্য’ তা কি সে যন্ত্রে ধারণ করতে পারে? আমাদের উঠোনের কোণে পা ছড়িয়ে পান খেতে খেতে দাদীর বিকেলের গল্প আর মায়ের হাসির আনন্দমাখা ভূবন আমলকী গাছের পাতা ছাড়িয়ে কেমন করে পরিবর্তনের হাওয়ায় মাটি ছেড়ে আকাশে উঠে যাবে? আমাদের লালন, আমাদের হাসন রাজা, আব্বাসউদ্দিন বা বিজয় সরকার আমাদের মানবিক বাংলাদেশের চর্চার মধ্যেই থাকতে হবে। একবার চর্চার আগলে শেষ করে যন্ত্রবন্দী করেই আমাদের কাজ শেষ হবার নয়। নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে আমাদের সুর যেন আমাদের ভাষার মতো সম্মানের সঙ্গেই অব্যাহত সমৃদ্ধির সঙ্গে পা চালাতে পারে সেই চেষ্টা আমাদের থাকতে হবে।

প্রিয়জনের ছবি কম্পিউটারে রেখে বা মোবাইলের ওয়ালপেপারে রেখেই আমাদের দায়িত্ব শেষ নয়। মনের মুকুরে যে ছবি তা তো হারিয়ে যাবে না। ৭৫ সালের পরে যখন বঙ্গবন্ধুর নাম নিশানা কোথাও ছিল না, একটা প্রজন্ম তার ছবি পর্যন্ত দেখেনি বা দেখতে দেয়া হয়নি, সেই বঙ্গবন্ধু তখন মানুষের মনের মুকুরেই ছিল, তা কি মুছে ফেলা গেছে? এটাই মানবিক বাংলাদেশের ধর্ম, আমরা ভালবাসার জাতি, আমাদের জাতীয় সঙ্গীত পর্যন্ত আমাদের ভালবাসার অঙ্গীকার জানাতে শেখায়। এখানে প্রযুক্তি আমাদের সহায়ক হয়েছে। আমরা বিস্মৃতির চেষ্টার প্রতিবাদ করেছি প্রযুক্তি দিয়েই যেখানে সব সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু আমরা যখন মিলিয়ে দেখলাম বাংলাদেশের প্রকৃতি বঙ্গবন্ধুকে ধারণ করেই প্রবহমান, আমাদের অকুতভয় মুক্তিযোদ্ধারা ধান ক্ষেতে বা কচুরিপানার জলে সাঁতরে দেশ মুক্ত করতে ব্যস্ত তখন বিশাল এক মানবিক বাংলাদেশের চিত্রই আমাদের বুক ভরে ফুটে উঠে। মুক্তিযুদ্ধের সেই ইতিহাস আমরা প্রযুক্তিতে ধারণ করে রেখেছি বটে কিন্তু মনের মুকুরে তার যে আবেগ তা কোনদিনও মুছে যাবার নয়। আর সেখানেই এই ইতিহাস আমাদের স্বাধীনতা সংস্কৃতি চেতনার ধর্ম হয়ে উঠেছে।

আমরা প্রযুক্তিকে স্বাধীন চিন্তা দিয়ে গ্রহণ করে আমাদের মতো করে বাগে এনে তাকে ব্যবহার করতে পারি সে সক্ষমতার প্রমাণ ইতোমধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশে আমরা দিয়েই ফেলেছি। এখন শুধু দেখতে হবে আমরা যেন প্রযুক্তির দাসে পরিণত না হয়ে যাই। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশ এখন এসব নিয়ে চিন্তা করছে ও ‘আর্কাইভ’ চেতনা থেকে বেরিয়ে এসে কেমন করে মানুষের মনে তার সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, আদর্শ ও জাতীয় চেতনার বিকাশ হ’তে পারে তার জন্যে গবেষণা করছে। রবোটিক্স জীবন আমাদের মৌলিক জীবনের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে কারণ এক সময় আমরা প্রযুক্তির বেশিরভাগ গবেষণা ও উদ্ভাবন করেছি স্নায়ুযুদ্ধের কৌশল ঠিক করতে। ফলে আমাদের মানবিক উদ্ভাবন সেখান ঠাঁই পেয়েছিল সামান্যই। আমরা যখন বুঝতে পেরেছি এটা আমাদের বিপরীত জীবনের অংশ হয়ে যাচ্ছে তখন কিছুটা সম্বিত ফিরে এসেছে এই বলে যে, প্রযুক্তি কেমন করে কল্যাণের জন্যে কাজ করতে পারে! ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত এক বইয়ে (কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস) স্টিফেন হকিংস যখন সময়ের একটা হিসাব করে উল্লেখ করলেন মহাকালের কোথাও এই ব্রহ্মাণ্ডের একটা জন্মলগ্ন আছে তখন থেকেই মূলত বিজ্ঞান গবেষণা হয়ে উঠেছে কল্যাণমুখী, প্রযুক্তি কেমন করে মানুষের কাছে যেতে পারে। ২০০৬ সালে এক ইন্টারনেট আলাপচারিতায় হকিংস বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগতভাবে বিশৃঙ্খল এই পৃথিবীতে, মানবজাতি কিভাবে আরও ১০০ বছর টিকে থাকবে?’ পরবর্তীতে তিনি বিষয়টি পরিষ্কার করে বলেন, ‘আমি এর উত্তর জানি না। এজন্যই আমি এই প্রশ্নটি করেছি, যাতে মানুষ এই বিষয় নিয়ে ভাবে এবং এখন আমরা যে সমস্যার সন্মুখীন হচ্ছি তা সম্পর্কে সতর্ক থাকে।’

মানবিক বাংলাদেশ গড়তে প্রযুক্তির সঙ্গে আমাদের ব্যবহারের ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক কী হবে এই নিয়ে যথেষ্ট ভাবনার বিষয় আছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের যে সফল পথ আমরা পাড়ি দিচ্ছি, এখন তার সকল সুফল মানুষের কাছে পৌঁছাবে কেমন করে যা আমাদের যন্ত্রের মধ্যে আটকে ফেলতে পারবে না, আমরা যেন সেই মানবিক পৃথিবী নির্মাণ করার গৌরব অর্জন করে নিতে পারি। এ নিয়ে এখন থেকেই আমাদের অনেক ভাবতে হবে।

লেখক : পরিচালক, আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্যে তথ্য-প্রযুক্তি প্রকল্প

rezasalimag@gmail.com