২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শেষের সেদিন হয় না যেন ভয়ঙ্কর

  • জাফর ওয়াজেদ

সিংহ যখন গর্জন করে উঠে, টের পাওয়া যায় বনের রাজা হুকুম জারি করছেন। সিংহ নাদে পশুকুল তটস্থপ্রায়। বুঝি কারও ওপর নাখোশ হয়েছেন সিংহ মহারাজ। রাজ্যজুড়ে তরঙ্গ ওঠে, আলোকের ঝলকালি চোখে আসে। এমন সিংহের গর্জন শোনা গেল ডক্টর কামাল হোসেনের কণ্ঠে। হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, ‘ভয় দেখিয়ে লাভ নেই।’ কিন্তু কে তাকে ভয় দেখাবে? তিনি নিজেই যেখানে অভয় হতে ভয়ের মাঝে হারিয়ে যেতে ভালবাসেন, সেখানে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠা বুঝি তার মজ্জাগত। সেই ১৯৮১ সালে বিএনপি প্রার্থী বিচারপতি সাত্তারের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট পদে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে ‘জঙ’ এর ময়দানে ছিলেন ডক্টর কামাল। বিএনপি মহল থেকে ষাট দশকের মোনেম খানের পান্ডা হিসেবে খ্যাত আবুল হাসানাতের হুমকি শুনেই লড়াই ময়দান ছেড়ে তিনি পালিয়ে গেলেন বিদেশে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বিনা বাক্য ব্যয়ে মাঠ ছেড়ে চলে যাবেন, এমনটা কারও ভাবনায় আসেনি। আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেক অনুনয় বিনয়ের পর তিনি ফিরে আসেন দেশে, নির্বাচনী মাঠে। কিন্তু তার সেই জলদগম্ভীর স্বর কেমন মিইয়ে যায়। বিড়ালের মিঁউ মিঁউ ধ্বনি শোনা যেত। সেই তিনি হেরে গেলেন, হয়ে গেলেন গায়েব। এমনিতে মাঝে মাঝে তিনি দেশে আসেন, এসেই বাকচাতুর্য ছড়িয়ে দিতে কুণ্ঠবোধ করেন না। দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য তার ভাবনা-চিন্তার পরিধি অত্যন্ত সীমিত। ভাষণে সারবস্তু তেমন বলে না, এবার জুলাই-আগস্ট মাসে তিনি অত্যন্ত সরব। উচ্চনিনাদে বলেছেনও শেষ নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত লড়বেন, মানুষের কথা বলবেন, অন্যয়ের প্রতিবাদ করবেন। শুনে যে কেউ আশাবাদী হতে পারেন। অশীতিপর মানবের কণ্ঠে সাহসী উচ্চারণ বিস্ময় জাগাবেই। তারুণ্যের বদলে যিনি সাহসের সঙ্গে সময়কে পাড়ি দিতে পারেননি, বয়সের ভাবে ন্যুব্জকালে তিনি লড়াইয়ের কথা যখন বলেন শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত, ধরে নেয়া যায় তিনি নতুন যৌবনের দূত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। হতেই পারেন। শরীর তাকে বাধ্যকে টেনে নিয়ে গেলেও মনের বয়স তাকে কাবু করেনি বুঝি। তাই তারুণ্যের তেজোদ্দীপ্ততা তাকে ‘জঙ’-এর ময়দানে টেনে নিয়ে এসেছে। আর এই আসার অর্থ তিনি মানুষের কথা বলবেন। তার এই মানুষ কারা? হতে পারে মূল দল থেকে ছিটকে পড়ার পর তিনি যেসব সুশীল আর প্রতিক্রিয়াশীলদের খপ্পরে পড়ে নিজেকে তাদের মধ্যে বিলীন করে দিয়েছেন, সেই মানুষের কথাই তিনি বলবেন। তার এই মানুষের তালিকায় কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর, রিক্সাচালক, দরিদ্র, অতিদরিদ্র, হতদরিদ্র, ছিন্নমূল, নদী সিকস্তি, ভূমিহীন, জেলে, তাঁতি, কামার, কুমোর, কসাই, ঠেলগাড়িওয়ালারা নেই। সমাজের নানা কিসিমের মানুষ ঠাঁই পায়নি। তার এই মানুষ সুশীল, গণবিচ্ছিন্ন, গণবিরোধী হওয়াটাই সঙ্গত। কারণ তিনি যাদের প্রতিনিধিত্ব করেন, তারা মূলত ষড়যন্ত্রেই প্রাণ পায়। তিনি মানুষের কথা বলবেন তাতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু এই মানুষের জাগরণ বা উত্তরণে তিনি নিজেকে উৎসর্গ করবেন, এমনটাও নয়। বলার জন্য হয়তো বলেছেন। কিন্তু আদৌতে তা নয়। তিনি ‘ইউটোপিয়ান’ ভাবনা থেকে তাদের কদর যাতে সমাজে বেড়ে উঠতে পারে, সেই দিকটিতেই সর্বাধিক খেয়াল রাখছেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ তিনি পড়ন্ত বেলায় এসে করার কথা বলেছেন। ‘ন্যায়বান’ মানুষ বলেই হয়তো অন্যায়ের ঘোর বিরোধী। কিন্তু তার দৃষ্টিতে নির্দিষ্ট হয় যে অন্যায়, বাস্তবের চোখে হয়তো তা নয়। রবীন্দ্রনাথের গান ও বাণী তার কণ্ঠে কখনও শোনা যায়নি। শোনা গেলে হয়তো গেয়ে উঠতেন, ‘ন্যায় অন্যায় জানিনে জানিনে, শুধু তোমারেই চিনি, তোমারেই জানি।’ আইনের মারপ্যাঁচে ডক্টর কামাল ন্যায়কে অন্যায় আর অন্যায়কে ন্যায়ে পর্যবসিতও করতে পারেন। এই দক্ষতা তার রয়েছে। তিনি বহুক্ষেত্রে তাই করেছেন। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর ‘টুঁ’ শব্দটিও উচ্চারণ করেননি। শেখ হাসিনার জবাববন্দীতে দেখতে পাই। বঙ্গবন্ধু সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডক্টর কামাল ওই সময় দেশের বাইরে ছিলেন।

হত্যাকা-ের পরদিন ১৬ আগস্ট ডক্টর কামালের সঙ্গে শেখ হাসিনার দেখা হয়। তিনি মন্ত্রীকে একটি বিবৃতি দিতে বললেন, কিন্তু তিনি তা দেননি। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ রেহানার ভাষ্য মতে, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড চেনা মানুষগুলোকে রাতারাতি বদলে দিয়েছিল। এদেরই একজন ডক্টর কামাল। ওই সময় তিনি জার্মানিতে এলেন। ঢাকার পরিস্থিতি নিয়ে তার কাছেও সঠিক কোন খবর নেই। ডক্টর কামালকে একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের অনুরোধ জানিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু তনয়া; যাতে বিশ্ব গণমাধ্যমকে প্রকৃত অবস্থা জানানো যায়। কূটনৈতিক মিশনগুলোকে ‘ডিফেন্ড’ করতে অনুরোধ জানান। কিন্তু তিনি সেই অনুরোধের গুরুত্ব দেননি। হয়ত ছোট মানুষ হিসেবে এই অনুরোধের কোন গুরুত্ব নেই বলেই তিনি ভেবেছিলেন। শেখ রেহানার মতে, তবে ওই সময় যদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল হোসেন একটি সংবাদ সম্মেলন করতেন, তখন পরিস্থিতি হয়ত অন্যরকম হতো। মানুষ যে এত দ্রুত বদলাতে পারে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তা প্রথম বুঝতে পেরেছেন। কামাল হোসেন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা যে অন্যায়, তা যদি উপলব্ধি করতেন, নিশ্চয় সেদিন প্রতিবাদ করতেন। তাই খুনীদের হতে যোজন যোজন দূরত্ব জার্মানিতে অবস্থান করা সত্ত্বেও কামাল হোসেন লড়াই করেননি। অন্যায়ের প্রতিবাদ করেননি। স্বরচিত ভয়ের আড়ালে নিজেকে ঢেকে নিয়ে চলে যান অক্সফোর্ডে। বঙ্গবন্ধু সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি বহির্বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারতেন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা। এর বিরুদ্ধে সারাবিশ্বকে সোচ্চার করতে পারতেন। কিন্তু তিনি সে পথ মাড়াননি। হয়ত বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাত ও হত্যার ষড়যন্ত্রীকারীদের সঙ্গে তার যোগাযোগ, যোগসাজশ ছিল; তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে নয়, সপক্ষে অবস্থান নিয়ে নীরব ছিলেন। নীরবতা যে সম্মতিরই লক্ষণ, সে তো বলাই বাহুল্য। অথচ এতকাল পর এসে নির্লজ্জভাবে বলতে পারেন, ‘আমি বঙ্গবন্ধুর একজন ক্ষুদ্র কর্মী। এ পরিচয়ে মরতে চাই।’ কিন্তু যে কর্মীটি তার নেতার নির্মম হত্যাকা-ের প্রতিবাদ জানায় না সমস্ত সুযোগও পরিবেশ বিদ্যমান থাকার পরও, সেই তিনি আজ গোধূলিবেলায় এসে বঙ্গবন্ধুর কর্মী পরিচয়কে প্রাধান্য দিচ্ছেন, তা আসলে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ বা প্রহসনেরই নামান্তর। এই বঙ্গবন্ধুর বদান্যতায় তিনি বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় বঙ্গবন্ধুর ছেড়ে দেয়া আসন থেকে সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী হতে পেরেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাকে অনেক উচ্চতায় আসীন করেছিলেন। আইনমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের কাজে নেতৃত্ব দানের কৃতিত্ব ছাড়া, তার ঝুলিতে আর কোন অবদানের কথা শোনা যায় না। দেখাও যায় না। আইনমন্ত্রী হতে তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়। আর সেই তিনি সিমলাতে যেয়ে ত্রিদেশীয় চুক্তিতে সই করে এলেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের শর্ত বাদ দিয়েই। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি যেসব ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে এসেছেন সেসব চাপা পড়ে যায়নি। আবার মূল্যায়তি হতে যাচ্ছে। বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হবে, পাকিস্তানের সঙ্গে তার একটা গোপন যোগসাজশ ছিল। সে কারণে দেখি ১৯৭১ সালে তিনি পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর মেজর জেনারেল মিট্টা খানের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি হতে তাজউদ্দিন, ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম একসঙ্গে বেরিয়ে এসে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর পেরিয়ে রায়েরবাজারের দিকে যাবার সময় ডক্টর কামাল গাড়ি থেকে নেমে এক আত্মীয়ের বাড়ি চলে যান। কদিন পর এক আত্মীয়ের মাধ্যমে তিনি মিট্টা খানের সঙ্গে যোগাযোগ করে সস্ত্রীক আত্মসমর্পণ করেন। তার স্ত্রী যেহেতু পাকিস্তানী এবং খ্যাতিমান আইনজীবীর কন্যা। সে সুবাদে সহজ হয়ে যায় পাকিস্তান চলে যাবার। সেখানে তিনি শ্বশুরালয়ে ছিলেন। দাবি করেন কারাগারে ছিলেন। কিন্তু একাত্তরে তার জেলে যাবার কথা ঘুণাক্ষরে পাকিস্তান, ভারত বা বিশ্ব গণমাধ্যমে উঠে আসেনি। আর তার জেলে যাবার কোন কার্যকারণও ছিল না। তার বিরুদ্ধে কোন মামলাও হয়নি। সবচে বিস্ময়কর, পাকিস্তানী কারামুক্ত বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিমানটি যখন পাকিস্তান ছেড়ে লন্ডনে যাবার পথে তখন ভুট্টো ডক্টর কামালকে সস্ত্রীক বিমানে চড়ান। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাদের ‘ট্যাগ’ করে দেয়া হলো। কিন্তু কেন দেয়া হলো। তার ব্যাখ্যা পাকিস্তানীরা জানে। আমরাও উপলব্ধি করতে পারি, এতকাল পরে এসে যে, যুদ্ধাপরাধীদের যাতে বিচার না হয়, বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের যাতে কনফেডারেশন হয় ভুট্টোর ফর্মুলা মোতাবেক এবং বাংলাদেশ যাতে রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়াতে না পারে, ডক্টর কামালকে সেই মিশনের দায়িত্ব দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিমানে করে পাঠানো হলো। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিমানটি লন্ডনে পৌঁছা, সেখানে অবস্থান, দিল্লীতে আসা পর্যন্ত কোন পর্বেই ডক্টর কামালের অবস্থান চিহ্নিত নেই। আজ যদি কেউ বলে পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা শিখিয়ে-পড়িয়ে কামালকে পাঠিয়েছিলেন। তাতে সন্দেহ নাও জাগতে পারে। যে আওয়ামী লীগের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে তিনি রাজধানীর মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছিলেন সেই আওয়ামী লীগই তার প্রতিপক্ষ গত দু’দশকের বেশি সময় ধরে। আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার ধ্বংস কামালই তার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একমাত্র ব্রতে পরিণত হয়েছে। এমন ব্রত আইএসআইএরও। শেখ হাসিনার বিনাশে তাই যে কোন তৎপরতায় তিনি জড়িয়ে পড়েন। নির্বাচনের বছরে নির্বাচন বিরোধী কোন গোপন তৎপরতার অংশ হিসেবে ডক্টর কামাল তার সহযোগীদের নিয়ে মাঠ গরম করতে চাইছেন। এই কাজে তিনি স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতের পৃষ্ঠপোষক বিএনপির সহযোগিতা পাচ্ছেন। বিএনপিও তাকে ব্যবহার করার মোক্ষম সুযোগটুকু পেয়েছে। ক্ষমতাসীন সরকারকে বিএনপির বলে বলীয়ান হয়ে হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছেন। এমনকি বিদায় নিয়ে বিদেশে চলে যাবার জন্য ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারিও জানিয়েছেন। ডক্টর কামাল নিজেকে নক্ষত্র ভাবেন। কিন্তু বাস্তবে নিজের আলোয় নয়, অপরের আলোয় আলোকিত হতে চান। নিজস্ব কোন আলো তার থেকে বিচ্ছুরিত হয় না। ভাল ভাল নীতিবাক্য উচ্চারণ করে তিনি প্রতিক্রিয়াশীল ও বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশবিরোধী শক্তির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছেন। সুবচন তার মুখে বেশ মানানসই হলেও তিনি নিজে সেসব বচনের ধারে-কাছে যান না। কোন রাজনৈতিক দায়িত্ব নেয়ারও নেই সক্ষমতা। তদুপরি তাকে কেন্দ্র করে বারে বারে গড়ে ওঠে বৃত্ত। কিন্তু সেই বৃত্ত বেশিদিন টেকে না। আর সাংগঠনিক বা দলীয় রাজনীতি করার ঘোষণা দিয়েও তিনি দল বহাল রেখে নিজেই নেতা সেজে আছেন। ২৮ বছর ধরে তিনি তার দলটির সভাপতি পদ আঁকড়ে আছেন। গণতন্ত্র চর্চাহীন ব্যক্তিবিশেষের খেয়াল-খুশির আখড়া যেন গণফোরাম। কামাল হোসেন বর্তমানে ষড়যন্ত্রকারীদের নেতায় পরিণত হয়ে যা করছেন, তা বুমেরাং হতে বাধ্য। তার শেষের দিনগুলো যেন ভয়ঙ্কর না হয়ে ওঠে।