২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গ্রেনেড হামলার ১৪ বছর

আজ ২১ আগস্ট। দিনটি ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার চতুর্দশ বর্ষ। বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতির ইতিহাসে বর্বরোচিত ও কলঙ্কিত দিন। ২০০৪ সালের এই দিনে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে দলটির মিছিলপূর্ব এক সমাবেশে এই হামলা চালানো হয়। হামলার মূল টার্গেট ছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। নৃশংস সেই হামলায় মহিলা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী আইভী রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। এতে দলটির কয়েক শ’ নেতাকর্মী ও সমর্থক আহত হন। এই হামলার শিকার বহুজন এখনও শরীরে ক্ষতচিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন। হামলায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেলেও তার শ্রবণেন্দ্রীয় গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ভিন্ন আদর্শ ও ভিন্ন মত থাকবে। সেই মত জনমুখী করতে রাজনৈতিক দলগুলো সভা-সমাবেশের মাধ্যমে তা তুলে ধরবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কোন দলকে নিশ্চিহ্ন করা বা দলটিকে নেতৃত্বশূন্য করার ষড়যন্ত্র কোন সভ্য সমাজে কাম্য হতে পারে না। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া যে এ ধরনের হামলা সম্ভব নয়, তাও এখন স্পষ্ট। তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকার এ ঘটনার পর তদন্তে দায়িত্বশীল ভূমিকা নেয়নি। বরং ঘটনার পর পরই সরকারের প্রভাবশালী মহল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি বিশেষ ভবনের সম্পৃক্ততার কথা, ঘটনার পর আলামত নষ্ট করা, এফবিআইএর তদন্ত দলকে সহযোগিতা না করার মতো অন্যায় কাজ করেছিল। এমনকি পরে প্রকৃত ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে জজ মিয়া নাটকের অবতারণা করেছিল তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। এমনকি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এমনটা বলেছিলেন যে, শেখ হাসিনা ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে এসেছিলেন। সংসদেও অনুরূপ মিথ্যাচার করে সরকারী দল। পরবর্তীকালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এই ঘটনার তদন্ত করে ২০০৮ সালের ২৯ অক্টোবর হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে জঙ্গী সংগঠন হরকত উল জিহাদ (হুজি) নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে আসামি করে দুটি পৃথক মামলা দায়ের করে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে আদালত এই বর্বরোচিত হত্যাকান্ডে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয়। পুনর্তদন্ত শেষে ২০১১ সালের তিন জুলাই আরও কয়েকজনকে অভিযুক্ত করে একটি সম্পূরক চার্জশীট আদালতে জমা দেয়া হয়। এতে অভিযুক্ত হিসেবে আরও অন্তর্ভুক্ত হয় বিএনপির তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর মহাসচিবসহ ত্রিশজন। ফলে আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় বায়ান্নজনে। ২০১১ সালের আগস্ট মাসে পলাতকদের বিরুদ্ধে আদালত দেশের জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়ার নির্দেশ প্রদান করে। বিজ্ঞাপন ছাপার পর কেউই আত্মসমর্পণ করেনি। বর্তমানে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণসহ আইনী প্রক্রিয়ার সব কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে। আসামি পক্ষের সাফাই সাক্ষী চলছে এবং তা শেষের দিকে। ধারণা করা হচ্ছে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে রায় হতে পারে। দেশবাসী অবশ্য এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের বিচারের রায় দ্রুত প্রত্যাশী।

যে সরকারই ক্ষমতায় থাক না কেন, তাদের উচিত দল-মতের উর্ধে উঠে দ্রুত এই বর্বরোচিত হামলার বিচার কাজ সম্পন্ন করা। এই হামলার নেপথ্যে কারা ছিল, হামলার উদ্দেশ্য কি ছিল, হামলায় ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেড কোথা থেকে এসেছে এবং এই ঘটনায় তৎকালীন সরকারের সম্পৃক্ততার তথ্য এখন অনেকটাই স্পষ্ট এবং দেশবাসী কম-বেশি অবহিত। সুতরাং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার। এ ধরনের বর্বর ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটুক এই প্রত্যাশা সবার। দেশে গণতন্ত্র বিকাশের জন্য সুষ্ঠু রাজনৈতিক চর্চার প্রয়োজন। বোমা বা গ্রেনেড দিয়ে কাউকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভাষা নয়। এমনকি পেট্রোলবোমা মেরে জীবন্ত মানুষ হত্যাও রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, এ ধরনের অপরাজনীতিতে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটে না। এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক ধারাকে কলুষিত করেছে। দেশবাসীর প্রত্যাশা অচিরেই গ্রেনেড হামলার রায় প্রকাশ এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। একই সঙ্গে পলাতকদের গ্রেফতারের ব্যবস্থা করে আইনের হাতে সোপর্দ করা হোক।