১৫ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লেগুনার বিকল্প কী

প্রবাদ রয়েছে, জুতা পরার আগে পেরেক সারাই করে নিতে হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এ দেশে তা প্রযোজ্য। মাথাব্যথা সারানোর জন্য মাথা কেটে ফেলা যে সমাধান নয়, তেমনি দুর্ঘটনার মূল কারণ উদ্ঘাটন না করে এক ধরনের যান চলাচল বন্ধ কোন সমাধান এনে দিতে পারে না। তদুপরি বিকল্প ব্যবস্থা না নিয়ে বিদ্যমান ব্যবস্থার আকস্মিক বন্ধ করার মধ্যে সমাধান নয়। বরং দুর্ভোগই টেনে আনা হয়। এতদিন ধরে চলে আসা ব্যবস্থাকে হঠাৎ বেআইনী বলার মাজেজাই বা কি তা স্পষ্ট নয়। রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কতিপয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যাকে ইতিবাচক বলা যায়। কিন্তু নি¤œ ও মধ্যবিত্তের পরিবহন লেগুনা বন্ধের আগে বিকল্প বাহনের কোন ব্যবস্থা তারা করেনি। ফলে এই বাহনের যাত্রীরা তিতিবিরক্ত যেমন, তেমনি সরকারের প্রতিও ক্ষুব্ধ। নির্বাচনকে সামনে রেখে এমন সিদ্ধান্ত কতটা গণমুখী সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। এতদিন চলাচলের পর এখন এসে পুলিশ কর্তৃপক্ষ বলছেন, সড়কে দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ লেগুনা। রাজধানীতে এতদিন যারা লেগুনা চালিয়েছে, তারা অবৈধভাবে চালিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এতদিন রাজধানীতে এই যানটি অবৈধভাবে চলাচল করেছে কেমন করে? তার চেয়েও বড় কথা, রাজধানীতে গণপরিবহনের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। সেখানে হিউম্যান হলার বা লেগুনা তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত কতটা সঙ্গত? হঠাৎ তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ায় তার একটা বিরূপ প্রভাব অবশ্যই পড়েছে। ঢাকায় এমন অনেক সড়ক আছে, যেখানে লেগুনা বা হিউম্যান হলারই একমাত্র গণপরিবহন। লেগুনার মতো যানবাহন, যেগুলোর বেশির ভাগেরই ফিটনেস নেই, চালকের আসনে অপ্রাপ্ত বয়স্করাÑ এমন বাহন তুলে দেয়া অবশ্যই সঙ্গত। কিন্তু তার আগে বিকল্প নিয়ে ভাবাটা ছিল জরুরী। বিকল্প বাহনের ব্যবস্থা না করে হিউম্যান হলার জাতীয় বাহন তুলে দেয়ায় জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া যে হয়েছে তা রাস্তায় দাঁড়ালেই স্পষ্ট হয়। লেগুনার মতো ছোট যান শুধু রাজধানীতেই নয়, মহাসড়কেও বিশৃঙ্খলা বাড়াচ্ছে। কিন্তু এসব বাহনের ওপর মানুষ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সুতরাং বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বিকল্প বাহনের বিষয়টি ভাবতে হতো। তাতে মানুষের ভোগান্তি বাড়ত না।

এটা অবশ্য বাস্তব যে, রাজধানীর সড়কে নৈরাজ্যের অন্যতম কারণ লেগুনা। এগুলোর চলার অনুমতি নেই। গণপরিবহনের তীব্র সঙ্কট ও সব রাস্তায় বাস চলাচল না থাকায় যাত্রীদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল এই মাধ্যম। ঝুঁকি সত্ত্বেও দ্রুত গন্তব্যে যেতে এটিতে সওয়ার হতেন নগরীর মধ্যবিত্ত-নি¤œবিত্ত মানুষ। দীর্ঘদিনের অভ্যস্ত মানুষ বিকল্প যানবাহন খুঁজছে। কিন্তু পাচ্ছে না। ফার্মগেট আনন্দ সিনেমা হলের সামনে থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত অর্ধশতাধিক লেগুনা চলাচল করত। এসবের যাত্রী অধিকাংশই শিক্ষার্থী। যাতায়াত খরচ সেখানে পড়ত আসা-যাওয়া ২৪ টাকা। এখন সেখানে রিক্সায় ভাড়া দিতে হচ্ছে দুই শ’ টাকা। ফার্মগেট থেকে মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, মিরপুর পথে দেড় শতাধিক লেগুনা চলাচল করত। হিউম্যান হলারের নিবন্ধনদাতা বিআরটিএর হিসাবমতে তাদের নিবন্ধিত হলারের সংখ্যা পাঁচ হাজার ১৫৬টি। চীনের তৈরি লেগুনা ব্র্যান্ডের নামে বেশি পরিচিত হলেও টাটা, অশোক লেল্যান্ড, মাহেন্দ্রসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের হিউম্যান হলার চলছে। ঢাকার বিভিন্ন রুটে হলার চলাচলের অনুমতি বা রুট পারমিট দিয়েছে আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি বা মেট্রো আরটিসি। ঢাকা মহানগর পুলিশ, কমিশনার পদাধিকার বলে এর প্রধান। চলতি বছর পর্যন্ত এই কমিটি চার হাজার ৪৬৪টি হিউম্যান হলার চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। ১৫৯ রুটে এগুলো চলাচল করত। এসব গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সার্টিফিকেট দিয়েছে বিআরটিএ। তবে ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়া হতো না। পরিবহন ক্ষেত্রে নৈরাজ্য নিরসনে লেগুনার সার্ভিস বন্ধ করা বাস্তবসম্মত হলেও এর বিকল্প যানের ব্যবস্থা দ্রুত করার দায়িত্বটিও কর্তৃপক্ষের। তাই তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবেন, যাতে মানুষের চলাচলের ক্ষেত্র হয় সুগম।