১৫ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইতিহাসের ইন্টারকন

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে তার নাম জড়িয়ে আছে। স্বাধিকার, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের নানা বাঁকে তার অস্তিত্ব মেলে। শত্রু-মিত্র উভয়ের ঘাঁটি হয়ে তার অবস্থান ছিল একাত্তর ও তার পূর্ব সময়ে। একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতের গণহত্যার সাক্ষী হয়ে রয়েছে যেমন, তেমনি গেরিলা যোদ্ধাদের হামলার শিকারও হয়েছিল। সে সময় বিশ্বজুড়ে তার নাম ছড়িয়ে পড়েছিল। বিদেশী সাংবাদিকরা এই স্থানেই ২৫ মার্চ থেকে বেশ ক’দিন অবস্থান নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি ও আলোকচিত্র তুলে তা বিদেশী মাধ্যমে পাঠিয়েছিলেন। বিশ্ববাসী জেনেছিল সে সুবাদে যে, বাংলাদেশে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী গণহত্যা চালাচ্ছে। একাত্তরে এই স্থানটি রেডক্রসের আওতাধীন থাকায় ছিল তা ‘নোয়ার জোন’। বিদেশী অতিথিরা ঢাকায় এলে এখানেই অবস্থান করতেন। এমনকি হানাদার সহযোগী ভুট্টোও মার্চে এখানেই থেকেছিলেন কয়েকদিন। ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরুর আগে এখান থেকেই ফিরে গিয়েছিলেন ঘাতকের তকমা নিয়ে পাকিস্তানে। নাম তার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল। সময়ের বিবর্তনে তার খোল নলচে বদলে গেলেও অস্তিত্ব সঙ্কট ঘটেনি। নতুনভাবে আবার তার আগমন ঘটছে দীর্ঘ বিরতির পর। স্বাধীনতা পরবর্তী এটাই ছিল দেশের প্রথম পাঁচ তারকা হোটেল। এরপর মালিকানা বদলে এর নাম হয় হোটেল শেরাটন। শেরাটনের সঙ্গে সরকারের চুক্তি বাতিলের পর এটি রূপসী বাংলা নামে পরিচালিত হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে নতুন করে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি হয়। দীর্ঘ সংস্কার কাজ শেষে হোটেলটির চেহারাই এখন বদলে ফেলা হয়েছে।

১৯৬৬ সালে হোটেলটির যাত্রা শুরু হয়। ওই সময় এটিই ছিল দেশের প্রথম আন্তর্জাতিক মানের পাঁচ তারকা হোটেল। চলে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত। এরপর স্টারউড কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হওয়ায় ১৯৮৩ থেকে ২০১১ পর্যন্ত ঢাকা শেরাটন হোটেল নামে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলে। শেরাটনের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ‘রূপসী বাংলা হোটেল’ নামে এটি পরিচালিত হয়। ২০১৩ সালে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি হয়। এই চুক্তির আওতায় ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে সংস্কারের জন্য হোটেলটি বন্ধ রাখা হয়। বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেডের (বিএসএল) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হোটেলটি বন্ধ হওয়ার পর দীর্ঘ চার বছর ধরে চলেছে সংস্কার কাজ। সাবেক শেরাটনের সেই সাজসজ্জার প্রায় সবই বদলে ফেলা হয়েছে। এখন চলছে শেষ সময়ের কারুকার্য। চলছে তুলির আঁচড়। দামী গ্লাসে ঢাকা পড়েছে ভবনের বাইরের দিক। ভেতরে যেন রাজপ্রাসাদের মহাবারামখানা। চোখ ধাঁধানো রঙের খেলা দেয়ালে দেয়ালে। অপরূপ সাজে-সজ্জিত হয়ে ফিরে আসছে অতীতের সব চিহ্ন মুছে ফেলে। হোটেল কর্তৃপক্ষের মতে, শুধু রূপ ও সাজ-সজ্জায় নয়, সুযোগ-সুবিধায়ও হোটেলটি হবে অনন্য। পুরো হোটেল ঢেলে সাজানো হয়েছে। তবে বাইরের পুরনো ভবনের কাঠামো ঠিক রাখা হয়েছে। হোটেলটির বাইরে মনোরম প্রকৃতির দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আগে মোট কক্ষ ছিল ২৭২টি। আয়তন বাড়ানোর ফলে কক্ষের সংখ্যা কমে হয়েছে ২২৬টি। আগে এটির বলরুম ছিল একদিকে। উইন্টার গার্ডেন নামে সবচেয়ে বড় হলরুমের অবস্থান ছিল আরেকদিকে। এখন দুটি এক করে দেয়া হয়েছে। হোটেলটির মূল ফটকও সরিয়ে দেয়া হয়েছে। বিশ্বের প্রায় এক শ’টি দেশে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল গ্রুপ হোটেল ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। এই গ্রুপের শীর্ষ ব্র্যান্ড হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল।

বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ এই হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল আগামীকাল বৃহস্পতিবার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর শুরু হবে এর বাণিজ্যিক কার্যক্রম। হোটেলটির অতীত স্মৃতি ধরে রাখার জন্য একটি জাদুঘর স্থাপন করা যেতে পারে। যা বাংলাদেশের ইতিহাসকে তুলে ধরতে পারে। বিষয়টি বিবেচনা করা হবে হয়ত।