১৫ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিপুল কর্মসংস্থান ॥ নয় খাতে উজ্জ্বল সম্ভাবনা

  • দু’বছরে ৫ লাখ শিক্ষার্থীর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চাকরি

এম শাহজাহান ॥ সম্পূর্ণ সরকারী খরচে প্রশিক্ষণ দিয়ে বেকারদের চাকরি দেয়া হবে। দেশের শীর্ষ নয়টি খাতে বিপুল মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মিড-লেভেলের কর্মকর্তা বা সুপারভাইজর থেকে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যবস্থাপনা পদে চাকরি মিলবে সরকারী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। আগামী দুই বছরের মধ্যে ৫ লাখ শিক্ষার্থীকে সরকারের স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রামের (সেইপ) আওতায় প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরি দেয়া হবে। পর্যায়ক্রমে ১৫ লাখ শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরির সুযোগ তৈরি করে দেয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য।

জানা গেছে, কর্মসংস্থান বাড়াতে রফতানিমুখী পোশাক খাতসহ অন্যান্য সেক্টরের শীর্ষ ব্যবস্থাপনা পদে বিদেশীদের নিয়োগ দেয়ার প্রবণতা হ্রাস করার কার্যক্রম গ্রহণ করতে যাচ্ছে সরকার। এজন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারী খাতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরি দেয়া হবে। দেশের গার্মেন্টস, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, নির্মাণ শিল্প, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, জাহাজ নির্মাণ শিল্প, চামড়া ও পাদুকা শিল্প, ট্যুরিজম এ্যান্ড হসপিটালিটি, এ্যাগ্রো ফুড প্রসেসিং, নার্সিং টেকনোলজির মতো নয়টি খাতে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর চাকরির সুযোগ রয়েছে। বিদেশেও এসব খাতে বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। কিন্তু রফতানিমুখী খাতগুলোর শীর্ষ পদগুলোতে বিদেশীদের চাকরির সুযোগ থাকলেও অভিজ্ঞতার অভাবে এদেশের শিক্ষার্থীরা চাকরি নিতে পারছে না।

পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান যেমন গার্মেন্ট, কম্পোজিট টেক্সটাইল মিল, ওভেন ও নিটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি, সোয়েটার ফ্যাক্টরি, বায়িং হাউস, মার্চেন্ডাইজিং কোম্পানি মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ বিদেশী কাজ করেন এদেশে। এই সংখ্যা প্রতিবছর বাড়ছে। এর ফলে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা বাইরে চলে যাচ্ছে। অথচ প্রতিবছর দেশের শ্রম বাজারে যুক্ত হচ্ছে ২০ লাখ মানুষ। ফলে বেকারের সংখ্যা বাড়লেও সেভাবে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। এই বাস্তবতায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের সেইপ প্রকল্পের আওতায় এখন থেকে সদ্য অনার্স-মাস্টার্স এবং এমবিএ পাস করা শিক্ষার্থীদের সরকারী খরচে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। বিশেষ করে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং, আইটি ও লেদার টেকনোলজি থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরি দেয়া হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোঃ আজিজুল আলম জনকণ্ঠকে বলেন, কর্মসংস্থান একটি বড় সমস্যা। গত এক দশক ধরে কর্মসংস্থানের জন্য বিভিন্নমুখী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু সেইভাবে কর্মসংস্থান বাড়েনি। সরকারী চাকরিতে শূন্য পদগুলোতে নিয়োগ হচ্ছে। কিন্তু এই নিয়োগ নিয়ে দেশের বেকারত্ব দূর করা করা সম্ভব নয়। এজন্য বেসরকারী খাতে কর্মসংস্থান প্রয়োজন। অভিজ্ঞতা না থাকায় বেসরকারী খাতের শীর্ষ পদগুলোতে দেশের ছেলে-মেয়েরা সুযোগ নিতে পারছে না। দক্ষ মানবসম্পদের অভাবে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ কর্মক্ষম ব্যক্তি শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ কারণে সরকারীভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে এবার চাকরি সুযোগ তৈরি করে দেয়া হবে।

এদিকে, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এর আগের বাজেটে ১৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থানে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নামক একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার ঘোষণা দেন। এ ধরনের একটি কর্তৃপক্ষ বা ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এনএসডিএ) গঠন করে মানবসম্পদ উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপের ঘোষণাও দেয়া হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ৫ কোটি ৮৭ লাখ শ্রমশক্তি বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত রয়েছে। এর মধ্যে ব্যবস্থাপক, টেকনিশিয়ান, সহায়ক কর্মী, সেবা ও বিপণন কর্মী, কৃষি, বন ও মৎস্য খাতে দক্ষ কর্মী, কারুশিল্পে নিয়োজিত কর্মী, প্লান্ট ও মেশিন অপারেটর ও যন্ত্রাংশ সংযোজনকারী অন্যান্য প্রাথমিক পেশায় রয়েছেন। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিয়োজিত রয়েছেন ৭০ লাখের মতো বাংলাদেশী। এসব শ্রমিকের আয় বাড়াতে দক্ষতা উন্নয়নে জরুরী হয়ে পড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে সেইপ প্রকল্পের মনিটরিং এ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন স্পেশালিস্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য এই প্রকল্পের আওতায় সমাজের অনগ্রসর যুব সম্প্রদায়কে কাজের সুযোগ তৈরি করে দেয়া। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মিড-লেভেলের কর্মকর্তা বা সুপারভাইজর, আরও দক্ষ হতে পারবে। যাদের কাজ করার মানসিকতা, শারীরিক শক্তি ও সামর্থ্য রয়েছে অথচ বেকার এমন তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলা হবে। শুধু তাই নয়, এখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা যারা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন তাদেরকেও সরকারী খরচে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলা হবে।

জানা গেছে, সরকারী অর্থায়নে বর্তমান ৯টি সেক্টরে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে মার্চেন্ডাইজিং, মিড-লেভেল সুপারভাইজর, এ্যাপারেল মার্চেন্ডাইজিং, ওভেন মেশিন ও নিট মেশিন চালনা, মান নিয়ন্ত্রণ ও টেক্সটাইল টেস্টিং, ফায়ার সেফটি এ্যান্ড কমপ্লায়েন্স, উইভিং টেকনোলজি ও নিটিং টেকনোলজি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।

এছাড়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের বিষয়গুলো হলো গ্রাফিকস ডিজাইন, ওয়েব ডিজাইন, ওয়েব এ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট ও সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট। নির্মাণ শিল্পের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো হলো-ম্যাসনারি, প্লাম্বিং ও পাইপ ফিটিং, রড বাইন্ডিং এ্যান্ড ফ্যাব্রিকেশন। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের বিষয়গুলো হলো-রেফ্রিজারেশন এ্যান্ড এয়ারকন্ডিশনিং, মেশিন টুলস অপারেশন, লেদ মেশিন পরিচালনা, অটোমোবাইল মেকানিক, মোবাইল সার্ভিসিং, ইলেকট্রিক্যাল ইনস্টলেশন এ্যান্ড মেইনটেন্যান্স। চামড়া ও পাদুকা শিল্পের বিষয়গুলো হলো-সেলাই পরিচালনা, কাটিং অপারেশন, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট এ্যান্ড লজিস্টিকস। জাহাজ নির্মাণ শিল্পের বিষয়গুলো হলো-ওয়েল্ডিং ও সিএনসি মেশিন অপারেশন। এ্যাগ্রো ফুড প্রসেসিংয়ের বিষয়গুলো হলো- প্রোডাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং আপগ্রেডিং, উৎপাদন বৃদ্ধির কৌশল ও টোটাল রেকায়ালিটি ম্যানেজমেন্ট। ট্যুরিজম এ্যান্ড হসপিটালিটির বিষয়গুলো হলো-ফুড এ্যান্ড বেভারেজ প্রোডাকশন, ফুড এ্যান্ড বেভারেজ সার্ভিস ও হাউসকিপিং।

জানা গেছে, রূপকল্প-২১ এবং এসডিজি বাস্তবায়নসহ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নে মানবসম্পদের দক্ষতা, জ্ঞান ও উদ্ভাবনী শক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে গত অর্থবছরের বাজেটেই মানবসম্পদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) গঠনের প্রস্তাব করা হয়। একই সঙ্গে কর্তৃপক্ষ পরিচালনার জন্য জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন তহবিল (এনএইচআরডিএফ) গঠন করে তাতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দেরও প্রস্তাব করা হয়। নিরাপদ ও উন্নত কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনই এ তহবিলের লক্ষ্য। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সামষ্টিক অর্থনীতি অনু বিভাগের স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এ তহবিল গঠন করা হয়েছে। তহবিল গঠনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, প্রাক-নিয়োগ ও কর্মকালীন প্রশিক্ষণ এবং নারী, সুবিধাবঞ্চিত ও বেকার জনগোষ্ঠীর প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হবে এ তহবিল। এ ছাড়া প্রশিক্ষণ প্রদানকারীদের অর্থায়নের জন্য অর্থ সংগ্রহ ও বিতরণের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে এ তহবিল কাজ করবে। এতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শক্তিশালী হবে, বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে, শিক্ষা ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের সঙ্গে যোগসূত্র প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে প্রশিক্ষণ-সংক্রান্ত সেবা পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে।