১৪ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সুচিকিৎসা দাবিতে বিএনপির অনশন

খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সুচিকিৎসা দাবিতে বিএনপির অনশন
  • তাকে ছাড়া দেশে কোন নির্বাচন হবে না ॥ মোশাররফ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে সরকার অন্যায়ভাবে মামলায় সাজা দিয়ে কারাগারে আটকে রেখেছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। বুধবার দুপুরে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে কারাবন্দী খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবিতে বিএনপি আয়োজিত প্রতীকী অনশন কর্মসূচীতে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ অভিযোগ করেন। দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির একমাত্র পথ রাজপথ। তাই আন্দোলনের মাধ্যমেই খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে। মুক্ত খালেদা জিয়া ছাড়া এ দেশে কোন নির্বাচন হবে না।

সকাল ১০টা থেকে শুরু হয় বিএনপির পূর্ব ঘোষিত প্রতীকী অনশন কর্মসূচী। শেষ হয় দুপুর ১২টার কিছু পর। রাজধানীর বাইরেও বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে এ কর্মসূচী পালন করা হয়। এতে বিএনপি, এর অঙ্গসংগঠন ও ২০ দলীয় জোটের শরিক দলের নেতাকর্মীও অংশ নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমেদ বিএনপির সিনিয়র নেতাদের পানি পান করিয়ে অনশন ভঙ্গ করান। এদিকে অনশন কর্মসূচীতে অংশ নিতে এসে বিএনপির ২২ কর্মী পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে বলে দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

সরকারকে উদ্দেশ করে ড. মোশাররফ বলেন, মূল মামলায় জামিন হওয়ার পরও সরকার খালেদা জিয়াকে কারাগারে বন্দী করে রেখেছে। খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে। তিনি কারাগারে অসুস্থ, তাকে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। যেহেতু তিনি কারাগারে আছেন, তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু চিকিৎসকরা বার বার পরামর্শ দেয়ার পরও সরকার কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

আমরা তার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করছি। খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া দেশের গণতন্ত্র মুক্ত হবে না। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আগামী সংসদে তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চায় দেশের মানুষ।

খন্দকার মোশাররফ বলেন, সরকার আবার ষড়যন্ত্র করছে ৫ জানুয়ারি মার্কা নির্বাচন করতে। কিন্তু আমরা বলতে চাই, দেশে আর ৫ জানুয়ারি মার্কা ভোটারবিহীন কোন নির্বাচন হতে দেব না। তাই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে, নির্বাচনকালে সেনা মোতায়েন করতে হবে ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। তিনি বলেন, আজকে সব দল ঐক্যবদ্ধ। তারা গণতন্ত্রের মা খালেদা জিয়ার মুক্তি চায়। গোটা দেশ সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ।

ড. মোশাররফ বলেন, সরকার আতঙ্কিত হয়ে এখন বিএনপি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা দিচ্ছে। লাখ লাখ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করছে। কয়েক দিন আগে প্রেসক্লাবের সামনে আমাদের মানববন্ধন শেষে বিনা কারণে নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করেছে। এসব করছে সরকার ক্ষমতা হারানোর ভয়ে। প্রশাসনের উদ্দেশে তিনি বলেন, এ সরকারের সময় শেষ। এখনই নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখুন, আপনারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। তাই আপনাদের জনগণের সেবা করতে হবে। আপনারা আওয়ামী লীগের কর্মচারী নন। তাই সরকারের কথায় জনগণের ওপর নির্যাতন করবেন না, গ্রেফতার করবেন না। আপনারা জনগণের সেবক, জনগণের পক্ষে অবস্থান নিন।

খন্দকার মোশাররফ বলেন, যেসব রাজনৈতিক দল জাতীয় ঐক্য গঠন প্রক্রিয়ায় কাজ করছে তারাও বলেছে, দেশী-বিদেশী বন্ধুরাষ্ট্রগুলোও বলেছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। আর খালেদা জিয়াকে ছাড়া, বিএনপিকে ছাড়া অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে না। তাই স্পষ্ট করে বলতে চাই, সরকার যতই ষড়যন্ত্র করুক না কেন, ২০১৪ সালের মতো একতরফা নির্বাচন দেশে আর হতে দেয়া হবে না।

সরকার ও পুলিশ বাহিনীকে উদ্দেশ করে ড. মোশাররফ বলেন, আপনাদের সময় শেষ। মামলা-গ্রেফতার করে বিএনপির দাবি আদায়ের আন্দোলন দমন করা যাবে না। আপনারা যারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, তারা আওয়ামী লীগের কর্মচারী নন। যারা এখনও আওয়ামী লীগের কথায় কাজ করছেন, তাদেরও কিন্তু আগামীতে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাই অযথা বিএনপির নেতাকর্মীদের হয়রানি, গ্রেফতার ও মামলা করবেন না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, সময় আসছে, বেশি দেরি নেই। এমন কর্মসূচী দেয়া হবে, যে কর্মসূচীতে এই সরকারের নৌকা ভেসে যাবে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া নির্জন কারাগারে আছেন। তাকে একটি পরিত্যক্ত কক্ষে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। সরকার চায় না খালেদা জিয়া মুক্তি পাক। আইনী প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার মুক্তি হবে বলে অন্তত আমার মনে হয় না। তাই খালেদা জিয়ার মুক্তির একমাত্র পথ হলো রাজপথের আন্দোলন। আমরা খালেদা জিয়াকে আন্দোলনের মাধ্যমেই কারামুক্ত করব। দলের নেতাকর্মীর উদ্দেশে মওদুদ বলেন, সময় মাত্র মাসখানেক। আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। এবার রাজপথে নেমে অভীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছানোয় শেষ পর্যন্ত থাকতে হবে। এ সরকারকে বিদায় করতে হবে। স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, এ সরকার সুষ্ঠু নির্বাচনে ভয় পায় তাই সরকার ভয়ে কম্পমান। তবে শেখ হাসিনার অধীনে কোন নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে না।

বিএনপির আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, খালেদা জিয়া কারাগারে অসুস্থ। তাকে সুস্থ করতে সরকারের কোন প্রচেষ্টা নেই। বরং খালেদা জিয়াকে জেলখানায় তিলে তিলে মারার ষড়যন্ত্র করছে সরকার। খালেদা জিয়া কারাগারের ভেতরে অবস্থিত আদালতে উপস্থিত হয়ে বলেছেন ‘আমি অসুস্থ। বার বার হাজিরা দিতে আসতে পারব না। এখানে ন্যায়বিচার হয় না। তাই, যা ইচ্ছে সাজা দেন। আমি আর আসতে পারব না।’ কাজেই নেত্রীর বার্তার প্রতি সমর্থন জানিয়ে আমরাও বলছি এই আদালতের রায় আমরা মানি না। দেশের জনগণও মানে না। আর খালেদা জিয়াকে ছাড়া দেশে কোনও নির্বাচন হতে পারে না। ওয়ান-ইলেভেনের সময় যারা ষড়যন্ত্র করেছিল তারা অনেকে এখন ভাল হয়ে গেছে। খালেদা জিয়া ছাড়া দলের যারা নির্বাচনে যেতে চায় তাদের সমুচিত জবাব দিতে দলীয় নেতাকর্মীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে কেউ যদি আড়ালে-আবডালে নির্বাচনে যাওয়ার চেষ্টা করে তাদের সমুচিত জবাব দেয়া হবে।

বিএনপির আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, এই দেশের কোটি কোটি মানুষ খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করে আগামী দিনে দেশের চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করবেন। আরও এক স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই গণতান্ত্রিক লড়াই চলবে। সেই লড়াইয়ের অংশ হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেবে বিএনপি। বিজয়ী হয়ে খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী করব।

বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেছেন, গণতন্ত্র আজ ভূলুণ্ঠিত। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে গণতন্ত্রের জন্ম হয়েছিল, জনগণ তাদের সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে যে গণতন্ত্র এনেছিল, সে গণতন্ত্র আজকে ভেস্তে গেছে। সেই গণতন্ত্রকে উদ্ধার করার জন্য আগামী নির্বাচন হলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ নির্বাচনকে অর্থপূর্ণ করতে হলে, প্রথমেই সংসদ ভেঙ্গে দিতে হবে। দ্বিতীয় হলো, বিভিন্নভাবে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে ৭৮ হাজার মামলা করা হয়েছে। ২০ লাখ লোককে এই মামলায় জড়ানো হয়েছে । এই ২০ লাখ লোককে মুক্তি দিতে হবে।

এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, নির্বাচনের জন্য খালেদার মুক্তি অত্যন্ত জরুরী। ত্যাগ -তিতিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে যারা গ্রেফতার হয়েছেন তাদেরও মুক্ত করতে হবে। তৃতীয় হলো, নির্বাচন পরিচালনা করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণটা সেসব কর্মকর্তার হাতে দিতে হবে, যেন নির্ভয়ে তারা দায়িত্ব পালন করতে পারে। খালেদা জিয়ার মুক্তির মাধ্যমে, আমরা যা হারিয়েছি তারই নেতৃত্বে সেই গণতন্ত্র যেন পুনরুদ্ধার হয়।

অনশনে অংশ নিয়ে জামায়াতের নায়েবে আমির মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে চাচ্ছেন। তাকে কারাগারে রেখে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। সেজন্য মামলায় জামিন পাওয়ার পরও তাকে মুক্তি দেয়া হচ্ছে না। আমাদের বক্তব্য খুব পরিষ্কার, খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে দেশে কোন নির্বাচন হবে না। নির্বাচন হতে দেবে না জনগণ। তিনি বলেন, সরকার বিএনপিসহ বিরোধীদলের নেতাকর্মীর ওপর জুলুম করছে। জেলের ভেতর আদালত বসিয়ে খালেদা জিয়ার ওপর নির্যাতন করা হচ্ছে। খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ রাজপথে সব আন্দোলন কর্মসূচীতে বিএনপির পাশে থাকবে জামায়াত।

অনশন কর্মসূচীতে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, সেলিমা রহমান, মোঃ শাজাহান, আব্দুল আউয়াল মিন্টু, ডাঃ এ জেড এম জাহিদ হোসেন, আহমেদ আজম খান, রুহুল আলম চৌধুরী, নিতাই রায় চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক, আমান উল্লাহ আমান, আবুল খায়ের ভুঁইয়া, মিজানুর রহমান মিনু, আতাউর রহমান ঢালী, আবদুস সালাম, হাবিবুর রহমান হাবিব, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, ইমরান সালেহ প্রিন্স, প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদ, স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক শিরিন সুলতানা, মুক্তিযোদ্ধা দলের সাধারণ সম্পাদক সাদেক আহমদ খান প্রমুখ। এদিকে একই সময়ে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান করে অনশন কর্মসূচী পালন করেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।