২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সোশ্যাল ফোরাম ও মিডিয়ার একাংশ দেশে জঙ্গীদের প্রতিষ্ঠিত করছে -স্বদেশ রায়

কোটা আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলন দুটোই ছিল দৃশ্যত অরাজনৈতিক আন্দোলন। কোটা আন্দোলনের নেতৃত্বে যে ইসলামী ছাত্র শিবির ছিল এ নিয়ে এখন আর কারও কোন প্রশ্ন নেই। অন্যদিকে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে নিষ্পাপ শিশুদের ঢাল করে জামায়াত-শিবির ও বিএনপি-ছাত্রদলের কর্মীরা ঢুকে পড়ে। এদের ব্যাগে শুধু চাপাতি পাওয়া যায়নি, একটি ব্যাগে চারটি রিভলবারও পাওয়া যায়। এখানেই শেষ নয়, যারা দেশের অবৈধ অস্ত্র নিয়ে কাজ করেন বা খোঁজ-খবর রাখার চেষ্টা করেন তাদের মতে, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের নামে শেষের দু’দিনে যে সংখ্যক অবৈধ অস্ত্র জামায়াত-শিবির ও বিএনপি-ছাত্রদলের কর্মীদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে তার সংখ্যা অনেক বেশি। দেশে যে কোন মুহূর্তে এই অস্ত্র একটি বড় ধরনের নাশকতার পরিবেশ তৈরি করবে। ইতোমধ্যে কিছু পত্রপত্রিকার রিপোর্ট ও রাজনৈতিক নেতা বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে একটি বড় ধরনের নাশকতার ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা চলছে। এই নাশকতায় ওই অবৈধ অস্ত্র কাজ করবে। দেশে এ ধরনের নাশকতা ঘটার আগে সরকার কম্বিং অপারেশনের মাধ্যমে এ অস্ত্র উদ্ধার করতে সমর্থ হবে কি-না সেটাই এখন বড় প্রশ্ন?

তবে অদ্ভুত বিষয় হলো যাদের কাছে অস্ত্র পাওয়া যাচ্ছে, যাদের কাছে চাপাতি পাওয়া যাচ্ছে তাদেরকেই হিরো বানাচ্ছে দেশের মিডিয়ার একাংশ। এসব অস্ত্রধারীকে দমন করতে পুলিশের পাশাপাশি দেশের সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক কর্মীরাও জীবন বাজি রেখে নেমেছিল। ওই সব রাজনৈতিক কর্মী বা সাধারণ মানুষকে ধন্যবাদ না দিয়ে তাদের গু-া হিসেবে চিহ্নিত করল মিডিয়ার ওই অংশটি। তাদের কোন পরিচয় না জেনে এক শ্রেণীর পত্রিকা তাদের বার বারই ছাত্রলীগের গু-া হিসেবে চিহ্নিত করল। অন্যদিকে একেবারে নিশ্চুপ থাকল নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মধ্যে ঢুকে পড়া জামায়াত-শিবির ও বিএনপি-ছাত্রদলের কর্মীদের সশস্ত্র অবস্থান নিয়ে। তাদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়া গেল, চাপাতি পাওয়া গেল তা নিয়ে কোন রিপোর্ট নেই ওই সব পত্রিকা ও টেলিভিশনে। অথচ কোন পরিচয় না জেনে, নাম না জেনেÑ পুলিশের পাশাপাশি যে সব রাজনৈতিক কর্মী ওই সব দুর্বৃত্তকে ঠেকাতে নেমেছিলÑ তাদের ওই সব পত্রিকা ছাত্রলীগ হিসেবে চিনে ফেলল! তাদের ছাত্রলীগের গু-া হিসেবে উপস্থাপন করল মানুষের কাছে! অন্যদিকে ব্যাগে রিভলবার থাকা, চাপাতি হাতে থাকা ওই সব জঙ্গীকে তারা সাধারণ ছাত্র হিসেবেই দেখল! এই সব পত্রিকা ও সম্পাদকের কেউ কেউ ৯৬-২০০১-এ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে আওয়ামী লীগ নেতার হাতে থাকা মোবাইলকে রিভলবার বানিয়েছিলেন। যা নিয়ে সে সময়ে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বিস্তারিত লিখেছিলেন কিভাবে সে কাজটি ওই পত্রিকা ও সম্পাদক করেছিলেন।

এখন আবার মিডিয়ার একাংশকে দেখা যাচ্ছে ইসলামী ছাত্র শিবিরদের হিরো বানাচ্ছে। ইসলামী ছাত্র শিবিরের কর্মী গ্রেফতার হলে তাদের বাবা-মায়ের ইন্টারভিউ ছেপে, তা নিয়ে কান্নার রোল তুলে তারা জাতিকে বিভ্রান্ত করছে। কেউ কেউ তাদের জাতির হিরো বানাচ্ছে। সর্বশেষ ইসলামী ছাত্র শিবিরের বারো জন কর্মী গ্রেফতার হলে, তাদের ছবিসহ সংবাদপত্রে লিড নিউজ করে মায়াকান্না জুড়ে দিয়েছে কিছু পত্রিকা। বাস্তবে বর্তমান সরকারের অন্যতম একটি ব্যর্থতা হলো, তাদের আমলে এক শ্রেণীর পত্রপত্রিকা এভাবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত জঙ্গী সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের নেতা-কর্মীদের হিরো বানানোর সুযোগ পাচ্ছে নির্দ্বিধায়। বাংলাদেশে সামরিক শাসন আমলেও সামরিক শাসক সমর্থিত কোন পত্রিকাও ইসলামী ছাত্র শিবিরকে এইভাবে পজিটিভ কভারেজ দেয়ার কোন সাহস ও সুযোগ পায়নি। অথচ আজ মূল ধারার এ পত্রিকাগুলো জামায়াতের মুখপত্র সংগ্রাম ও নয়া দিগন্ত যে কাজ করতে পারেনি সেটাই করার সাহস ও সুযোগ পাচ্ছে। আর এই ব্যর্থতা শুধু সরকারের নয়, আমাদের দেশের এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীরও। তারাও তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন। সত্যি কথা বলতে কি, কোটা আন্দোলনের মাধ্যমে যে শিবিরের উত্থান ও রাজাকারকে জায়েজ করা হয়েছে এটা একমাত্র জাফর ইকবাল ছাড়া আর কোন বুদ্ধিজীবী লেখেননি। বরং বুদ্ধিজীবী নামধারী জামায়াত-বিএনপির শিক্ষক, সাংবাদিক ও এনজিও কর্মীরা ওই রাজাকার উত্থানকে জায়েজ করেছেন। এসব ক্ষেত্রে সরকারকে মনে হয়েছে অসহায়। তাদের পাশে যেন কেউ নেই। যাদের তারা মাথার মণি করে রাখেন তাদেরও দেখা গেছে বুদ্ধির প্যাঁচ কষে ওই রাজাকারীর পক্ষে লিখতে। তাদের এই সম্মিলিত চেষ্টার ফলে সমাজে ধীরে ধীরে রাজাকারী চেতনাই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

অন্যদিকে শেখ হাসিনার এই ডিজিটাল বাংলাদেশের সুযোগ সম্পূর্ণরূপে নিচ্ছে জামায়াত-শিবির। ডিজিটাল বাংলাদেশের ফলে আজ বাংলাদেশে সোশ্যাল ফোরাম অর্থাৎ ফেসবুক, টুইটার, লিঙ্কডিন, ইউটিউব প্রভৃতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দাপটে রাজত্ব করছে। এমনকি এই সোশ্যাল ফোরামকে মানুষ বিকল্প মিডিয়া বলে ভাবছে। অহরহ তাকে সোশ্যাল মিডিয়া বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমে প্রতি নিয়ত কীভাবে জামায়াত-শিবিরের ও বিএনপির পক্ষে প্রচার চলছে আর সরকারের বিরুদ্ধে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালী চেতনার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চলছে তা দেখার কেউ আছে বলে মনে হয় না। ২০১২ সালে একবার মাত্র শাহবাগকেন্দ্রিক মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সাইবার যোদ্ধা গড়ে ওঠার ফলে এই অপপ্রচারকে কোণঠাসা করতে পেরেছিল তরুণরা। কিন্তু তাদের ভেতর নানা রকম গোষ্ঠী কোন্দল তৈরি হওয়ার ফলে এবং বামপন্থীরা ক্রমান্বয়ে জামায়াত-শিবিরের দিকে ঝুঁকে পড়ার ফলে- সর্বোপরি সরকারী দলের উদাসীনতা ও অজ্ঞতার কারণে সেই সব সাইবার যোদ্ধা বিচ্ছিন্ন ও হতাশ হয়ে পড়েছে। নানান দিকে ছড়িয়ে পড়েছে তারা। নতুন করে তৈরি হয়নি নতুন সাইবার যোদ্ধা প্রজন্ম। অথচ এই শাহবাগ কেন্দ্রিক সাইবার যোদ্ধারা যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত অর্থাৎ জামায়াত-শিবিরের সেই বাঁশের কেল্লা এখন আরও বেশি শক্তিশালী। আর বাঁশের কেল্লাকে শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে মিডিয়ার একাংশ। বাঁশের কেল্লা যে অর্ধ সত্য ও মিথ্যা প্রচার করে সেগুলোই আবার বেশ ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে সংবাদ হিসেবে ছাপা হচ্ছে তাদের পত্রিকাগুলোতে। প্রচার হচ্ছে তাদের টেলিভিশনগুলোতে। আর তাতে মানুষও মনে করছে সোশ্যাল ফোরামে ওরা সত্য কথা বলছে। বাস্তবে এই পত্রিকা ও টেলিভিশনগুলো এবং বাঁশের কেল্লাসহ সোশ্যাল ফোরামের জামায়াত-শিবির ও বিএনপির গ্রুপগুলো মূলত একটি আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের ভেতর চলে। অর্থাৎ তাদের মিডিয়া ও সোশ্যাল ফোরাম পরিকল্পিতভাবে এ কাজটি করছে। তারা বুঝতে পেরেছে আওয়ামী লীগের দশ বছরের টানা শাসনে দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অনেক কিছু প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এগুলো যাতে প্রতিষ্ঠা না পায়, তরুণরা যাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, বাঙালী চেতনায় জেগে না ওঠে এ জন্য নানান পথে কাজ করছে তারা। তারই একটি অংশ হিসেবে অরাজনৈতিক ইস্যুকে সামনে রেখে রাজাকারী, আলবদরী চেতনাকে জাগ্রত করার কাজ করে যাচ্ছে। আর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে গু-া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে।

যে সব রাজনৈতিক কর্মী পুলিশের সঙ্গে নেমেছিল জামায়াত-শিবির ও বিএনপির কর্মীদের সশস্ত্র মহড়াকে রুখে দিতে তারা কেন তাদের সাহসী মানুষ না বলে গু-া হিসেবে চিহ্নিত করছে? কেন করছে তা যারা বিএনপির মূল্যায়ন কমিটির মিটিংয়ের খবর পেয়েছেন তারা জানেন। বিএনপি কোটা আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে সফলভাবে ঢুকে পড়তে পারলেও কেন শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে তার মূল্যায়ন করছে। তাদের বক্তব্য হলো, পুলিশের সঙ্গে যখনই রাজনৈতিক কর্মীরা নেমেছে, তাদের ভাষায় ছাত্রলীগ নেমেছে তখন আর তারা টিকে থাকতে পারেনি। আর এর থেকেই বোঝা যায়, দেশের এক শ্রেণীর পত্রিকায় ও টেলিভিশনে কেন সব সময় ছাত্রলীগকে গু-া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কারণ, এই ছাত্রলীগকে মানুষের সামনে ভিলেন হিসেবে দেখাতে না পারলে তাদের রাজকারী বা আলবদরী বিজয় সম্ভব হচ্ছে না। তাই নিরবচ্ছিন্নভাবে ওই পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনগুলো সব সময়ই ছাত্রলীগকে ভিলেন হিসেবে দেখাচ্ছে। আর তাদের সঙ্গে নেমেছে সোশ্যাল ফোরম।

অথচ এদের এই পরিকল্পিত যুদ্ধের বিপরীতে আওয়ামী লীগ বা স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তি সুসংগঠিত নয়। যদিও আওয়ামী লীগের এক প্রবীণ উপদেষ্টা বলেছেন, এবাবের নির্বাচনে সাইবার যুদ্ধ হবে সব থেকে বড় ফ্যাক্টর। তার এ উপলব্ধি সঠিক কিন্তু তারা কি দেখতে পাচ্ছেন, জামায়াত-বিএনপি সাইবার ফোরাম ও মিডিয়ার একাংশকে নিয়ে সম্মিলিত পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে এগুচ্ছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বা স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তি অনেকখানি অসহায়। মিডিয়ার একাংশ ও সোশ্যাল ফোরাম মিলে গত কয়েক মাস ধরে ইসলামী ছাত্র শিবিরের জঙ্গীদের প্রতিষ্ঠা করে যাচ্ছে অথচ তার বিপরীতে আওয়ামী লীগ কোন প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারেনি বা চেষ্টাও করেনি।

swadeshroy@gmail.com