১৬ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নারিকেল আঁশ

অপ্রচলিত পণ্য নারিকেলের ছোবড়ার আঁশের কদর যে বিদেশ বিভূঁইতেও রয়েছে তা ছিল সবার ধারণার বাইরে। এর যে নানা ব্যবহার রয়েছে, অজানা ছিল অনেকেরই কাছে। সেই ছোবড়ার আঁশের তৈরি পণ্য এখন বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। এ জন্য দেশের কয়েকটি স্থানে গড়ে উঠছে ‘ন্যাচারাল ফাইবার’ থেকে রফতানি পণ্য তৈরির কারখানা। বৈদেশিক রফতানি পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত নারিকেলের ছোবড়া মেশিনের সাহায্যে গুঁড়া ও আঁশ পৃথক করে সেই আঁশ দিয়ে যন্ত্রের সাহায্যে তৈরি করা হচ্ছে তোশকের (ম্যাট্রেস) ভেতরের অংশ, যা ‘কয়ার ফেস্ট’ নামে পরিচিত। নারিকেলের ছোবড়ার পাশাপাশি ছোবড়ার গুঁড়াকে প্রক্রিয়াজাত করে রফতানির জন্য তৈরি করা হচ্ছে। এটি দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রথম রফতানি শুরু হয়। দেশী কারখানাগুলো ২০০৫ সাল থেকে ম্যাট্রেস তৈরির কাঁচামাল তৈরি করে আসছে। এই কাঁচামাল দেশের কয়েকটি খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানের ম্যাট্রেস উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে। আর নারিকেলের আঁশ থেকে উৎপাদিত গুঁড়া রোদে শুকিয়ে বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে চাপ দিয়ে ‘কয়ারপিট, ব্লক এবং গ্রো’ ব্যাগ তৈরি করা হচ্ছে। দেশের বাজারে কয়ার ফেস্টের চাহিদা মেটানোর পর এখন নতুন পণ্য কয়ারপিট র‌্যাপিং পেপারে মুড়ে রফতানি করা হয়। বিভিন্ন দেশে গবাদিপশু পালন খামারে ও কৃষি কাজে মাটির বিকল্প হিসেবে কয়ারপিটের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাগানের মাটির ‘কন্ডিশনার’ জৈবসারসহ বিভিন্ন কাজে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর চাহিদা রয়েছে। একসময় নারিকেল তেল তৈরির কারখানায় উৎপাদিত ছোবড়া শুধু জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এর যে আরও ব্যবহার রয়েছে তা ছিল অজানা। লাভজনকভাবে এই ছোবড়ার ব্যবহার ব্যক্তি উদ্যোগে শুরু হয়। পশ্চিমবঙ্গে, ‘কয়ার ফেস্ট’ তৈরির একাধিক কারখানা রয়েছে। বাংলাদেশে কয়ারপিটের চাহিদাও তৈরি হয়েছে। পণ্যটির পানি শোষণ ক্ষমতা ব্যাপক। তাই ভেড়া, ঘোড়া, গরু ও শূকর পালনের খামারের মেঝেতে ব্যবহৃত হয়। যাতে মলমূত্র শুষে নিতে পারে। পরে ব্যবহৃত কয়ারপিট জৈবসার হিসেবে কৃষিকাজে ব্যবহার করা হয়। তা ছাড়া ফসলের চারা উৎপাদনেও এটি ব্যবহার করা হয়। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সারাবিশ্বে নারিকেলের আঁশের উৎপাদন বছরে সাড়ে তিন লাখ মেট্রিক টন। এর নব্বই ভাগই যোগান দেয় ভারত ও শ্রীলঙ্কা।

বাংলাদেশ এখন এই খাতে নতুন সংযোজিত নাম। বিপুল পরিমাণে রফতানি করার সক্ষমতা তৈরি করতে হলে দেশজুড়ে কারখানা স্থাপন করা যেতে পারে। বিশেষ করে নারিকেলের ব্যাপক উৎপাদন হয়, এমন অঞ্চলেই গড়ে তোলা যায় কারখানা। প্রচলিত পণ্যের তালিকায় থাকা নারিকেলের ছোবড়া এখন রফতানিমুখী শিল্পে পরিণত হয়েছে। উৎপাদিত আঁশ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে গেজেটে নারিকেলের ছোবড়াকে বিশেষ উন্নয়নমূলক খাত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি নারিকেলের ছোবড়ার আঁশনির্ভর শিল্পকে জাতীয় শিল্পনীতি-২০১৬-এর অগ্রাধিকার খাত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়, যা ৮ মার্চ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। অপ্রচলিত হলেও সরকার এই পণ্য রফতানির মূল্যের বিপরীতে ২০ শতাংশ অর্থ ভর্তুকি বা নগদ সহায়তা প্রদানের পদক্ষেপ নিয়েছে। নারিকেলের ছোবড়ার সাহায্যে কী কী পণ্য তৈরি করা যায় সে নিয়ে গবেষণা জরুরী। দেশে নারিকেল শিল্পের ভবিষ্যত সম্ভাবনার কারণে নারিকেল চাষীরা নারিকেলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ও সার্বিক সহযোগিতা পেলে এই শিল্পের এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের যেমন সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে, যা অর্থনীতিতে সুফল বয়ে আনবে।