২৩ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিন্ন নীতিমালা

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগে অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়টি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। মঙ্গলবার শিক্ষামন্ত্রীর সভাপতিত্বে ইউজিসির এক কর্মশালায় ৪০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের উপস্থিতিতে এই বিষয়ে মতৈক্য হয়। এর ভিত্তিতে চূড়ান্ত করা হবে অভিন্ন নীতিমালা, যাতে করে সব সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে একই সময় নিয়োগ ও পদোন্নতি হতে পারে। তদুপরি যোগ্য শিক্ষক নিয়োগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা প্রচলনের পরামর্শও দিয়েছেন উপাচার্যবৃন্দ। বর্তমানে একেক বিশ্ববিদ্যালয়ে একেক নিয়ম কার্যকর রয়েছে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রদানের ক্ষেত্রে। সে ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতিসহ অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগও ওঠে প্রায়ই। প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়া মেধাবী প্রার্থীকে বাদ দিয়ে এমনকি সাধারণ মানের প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়া হয়। প্রস্তাবিত উচ্চশিক্ষা কমিশন অথবা ইউজিসির মাধ্যমে অভিন্ন নীতিমালার ভিত্তিতে প্রকৃত মেধাবীদের নিয়োগ ও পদোন্নতি দিলে এই অভিযোগ থাকবে না আগামীতে। তাতে শিক্ষার মানও বাড়বে।

দেশে শিক্ষার মানের অবনতি হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে ক্রমশ। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেস্কোর ‘গ্লোবাল ফ্লো অব টারসিয়ারি লেভেল অব স্টুডেন্টস’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে ৬০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার ১৩৯। এক বছরের ব্যবধানে এই সংখ্যা বেড়েছে ৮২ শতাংশ। বিদেশগামী শিক্ষার্থীর হার বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞরা বলছেন, ২০১৭ সালে এই সংখ্যা লক্ষাধিক হতে পারে। দেশে মানসম্মত উচ্চশিক্ষার সুযোগ কম। ভর্তি জটিলতাসহ সেশনজটও আছে। তদুপরি সর্বাধুনিক শিক্ষা ও বৈশ্বিক সুবিধাপ্রাপ্তিও সীমিত। বাংলাদেশের অনেক উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রী এবং সনদও বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং চাকরিস্থলে গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে মেধাবী ও সচ্ছল পরিবারের সন্তানরা স্বভাবতই উচ্চ শিক্ষার নিমিত্ত ছুটছেন বিদেশের নানা নামী-দামী বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে। এক্ষেত্রে এমনকি মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন এবং প্রতিবেশী দেশ ভারতকেও বেছে নিচ্ছে তারা। উচ্চ শিক্ষার নিমিত্ত বিদেশ গমনেচ্ছু শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করা যাবে না কিছুতেই। যেহেতু দেশে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ সীমিত। ব্যয়ও একেবারে কম নয়। দেশে ৪০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন সংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি নয়। অথচ কম-বেশি উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন দেখে থাকে ৮ লাখের বেশি শিক্ষার্থী। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও তাদের এই স্বপ্ন পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে সঙ্গত কারণেই বহির্বিশ্বে পড়তে যেতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে দিন দিন। গত বছর ৬০ হাজার শিক্ষার্থীর বিদেশে যাওয়ার মাধ্যমে ব্যয় বাবদ ৬ হাজার কোটি টাকাও চলে গেছে দেশের বাইরে। তাদের অধিকাংশ আবার দেশেও ফিরছে না। ফলে মেধা ও অর্থ পাচারÑ দুটোই হচ্ছে সমান তালে। অথচ দেশে উচ্চ শিক্ষার ভাল সুযোগ-সুবিধা পেলে এবং পরবর্তী জীবনে চাকরি অথবা ব্যবসার নিশ্চয়তা থাকলে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী নিশ্চয়ই পাড়ি জমাত না বিদেশে। এ বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক মহল, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের সবিশেষ ভাববার আছে বৈকি।

একদা প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বিশ্বের খ্যাতনামা হাজারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায়ও খুঁজে পাওয়া যাবে না। বুয়েট, ঢামেকের তো প্রশ্নই ওঠে না। উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণাকে ঘিরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মানের ক্রমাবনতি ঘটছে ক্রমশ। কেন এমনটি হচ্ছে তা দেখারও কেউ নেই। শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে সরকারী অনুদানের পরিমাণও নগণ্য। শিক্ষা খাতে বার্ষিক সরকারী বরাদ্দের অধিকাংশই চলে যায় শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও অবকাঠামো উন্নয়নে। শিক্ষাক্ষেত্রে নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ও গবেষকদের সংখ্যাও খুব কম। প্রকৃত মেধাবীরা বৃত্তি নিয়ে চলে যান বাইরে। উচ্চবিত্তের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করে থাকে বিদেশে। সুতরাং দেশের অবনতিশীল শিক্ষা এবং তার মান নিয়ে কেউই মাথা ঘামাচ্ছেন নাÑনা সরকার, না সংশ্লিষ্টরা। এই অমানিশার অবসান কবে ঘটবে, কে জানে!