২৩ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্মরণ ॥ শহীদ নজরুল ইসলাম স্মরণে

  • কাজী আমিনূর রহমান

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে যে সব বুদ্ধিজীবী ভবিষ্যত প্রজন্মের সুখ ও সমৃদ্ধির জন্য নিজেদের আত্মাহুতি দিয়েছেন তাদের মধ্যে প্রকৌশলী মুহম্মদ নজরুল ইসলাম একটি অনন্য নাম। ১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তারিখে আমরা এই মহান দেশপ্রেমিককে চিরতরে হারাই। দেশপ্রেমের যে মহান আদর্শকে সামনে রেখে শহীদ নজরুল তার নিজের জীবন উৎসর্গ করে গেছেন তা আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে এমনিতর কাজে এগিয়ে আসতে উৎসাহ ও প্রেরণা যোগাবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

শহীদ নজরুলের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ১৯৫৪ সালে। আমি তখন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ১৯৫৬ সালে আমি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক পরীক্ষায় পাস করে চাকরি নিয়ে ঢাকা ত্যাগ করি এবং দীর্ঘ ১২ বছর পর যখন ঢাকায় ফিরে আসি তখন আমার প্রকৌশলী নজরুলের সঙ্গে পুনর্মিলন ঘটে। আমরা দু’জনই তখন ঢাকায়, ওয়াপদার বিদ্যুত বিভাগে কর্মরত।

তারপর ঊনসত্তরের আন্দোলনের দিনগুলো, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন এবং পঁচিশে মার্চের ভয়াল রাতÑ এগুলো সবই এখন স্মৃতির অতল গহ্বরে। আমি একাত্তরের ২৯ মার্চ পরিবারবর্গ নিয়ে অত্যন্ত বিপদের ঝুঁকি নিয়ে নিজের গ্রামে রেখে মে মাসে আবার ঢাকায় ফিরে আসি এবং কাজে যোগদান করি। তারপর থেকে মাঝে মাঝে নজরুলের সঙ্গে দেখা হতো। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে কোন কিছু করা যায় কিনা তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হতো। এরই মধ্যে আমাদের আর এক সহপাঠী প্রকৌশলী চৌধুরী এবাদুল হকের অস্বাভাবিক মৃত্যু আমাদের খুবই নাড়া দেয়। অবাঙালীরা তাকে দিনাজপুর হাসপাতালে জবাই করে হত্যা করে। তার অপরাধ তিনি একজন বাঙালী। উল্লেখ্য, প্রকৌশলী চৌধুরী এবাদুল হক তখন দিনাজপুরের বিদ্যুত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

প্রকৌশলী নজরুলকে দেখে মনে হতো তিনি যে কোন পরিকল্পনা প্রণয়নে ব্যস্ত এবং চিন্তামগ্ন। আমি এবং প্রকৌশলী সৈয়দ কামরুল আলম দু’জনই তখন বিদ্যুত বিভাগের হেড অফিসে কর্মরত। নজরুল আমাদের দু’জনের সঙ্গেই মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। যেমন, কি করে অতি সহজে ট্রান্সমিশন লাইনের টাওয়ার ধ্বংস করা যায় অথবা গ্রিড উপকেন্দ্রগুলোকে কি করে সহজে অকেজো করে দেয়া যায়। এরই মাঝে একদিন তার কাছে একটি কাগজ দেখে আমি খুব ভয় পেয়ে যাই। তখন বুঝতে পারি যে, কত গভীরভাবে নজরুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করে ফেলেছেন। দেখলাম মেজর হায়দারের (মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারের পক্ষে, আর্মির চিঠিপত্র যে কায়দায় লেখা হয়, ঠিক তেমনিভাবে) একটি চিঠি যা বস্তুত একটি আপীলÑ অর্থ ও অন্যান্য বস্তু সামগ্রী দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের আহ্বান। আমি নজরুলের মতো সাহসী ছিলাম না। তাই ভয় পেয়েছিলাম। এরপর নজরুল তার পৈত্রিক বাসাবাড়ি হাটখোলায় নিয়ে যান আমাকে এবং সৈয়দ কামরুল আলমকে। তখনই প্রথম চাক্ষুস দেখলাম কয়েক মুক্তিযোদ্ধাকে। এরপর আরও কিছু সময় পেরিয়ে গেল। দেখতে দেখতে দিন, মাসÑ তারপর এলো জুলাই মাস। আমি কয়েক দিনের ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। ফিরলাম ২০ জুলাই বিকেলে। তখন আমি পরিবাগ ওয়াপদা অফিসার্স কোয়ার্টার্সে থাকি একা। মাগরিবের সময়, হঠাৎ ঢ্যা ঢ্যা ঢ্যা শব্দ। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তিন দিক থেকে বোমা বিস্ফোরণের বিকট আওয়াজ এবং ঢাকা শহরের বিদ্যুত সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ে ও মুহূর্তে ঢাকা শহর সম্পূর্ণ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। আমরা তখনও বুঝিনি যে, এই পরিকল্পনার পেছনে নজরুলের সক্রিয় হাত ছিল।

সেদিন ছিল খুব সম্ভব ২২ জুলাই। অফিসে গিয়ে শুনলাম ঢাকা বিদ্যুত সরবরাহের সহকারী প্রকৌশলী সিরাজুল হককে মিলিটারিরা ধরে নিয়ে গেছে উলন, খিলগাঁও এবং কমলাপুর বিদ্যুত উপকেন্দ্রে বিস্ফোরণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ওইদিনই বিকেলে নজরুলের সঙ্গে আমার এবং সৈয়দ কামরুল আলমের সাক্ষাত ঘটে। নানা কথার মাঝে আমরা নজরুলকে জানাই যে, প্রকৌশলী সিরাজুল হককে মিলিটারি ধরে নিয়ে গেছে। এই খবর শুনে নজরুল খুবই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি তৎক্ষণাৎ আত্মগোপন করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তখন টেলিফোনে তার স্ত্রী বা পরিবারের অন্য কারোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাননি কারণ তাতে তাঁর ও তাঁর পরিবারবর্গের জীবনের ঝুঁকি বাড়তে পারে। পরিবাগ ওয়াপদা কোয়ার্টার্স তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বলে মনে হয়েছিল আমার, তাই নজরুলকে আপাতত আমার সঙ্গে থাকার আহ্বান জানাই। কিন্তু কোনমতেই তাকে আশ্বস্ত করা গেল না। পরে আমরা জানতে পারি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি বেশ গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং এ কারণেই তিনি স্থির বিশ্বাসী ছিলেন মিলিটারির হাতে ধরা পড়লে তাঁর জীবন রক্ষা পাওয়ার কোন উপায় থাকবে না। এ জন্যই আমাদের কোন আশ্বাসই তাঁর কাছে যথেষ্ট ছিল না। সেদিন আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে, সেই হবে আমাদের শেষ সাক্ষাত। নিয়তির কি নিষ্ঠুর পরিহাস, তাঁকে বিদায় সম্ভাষণও জানাতে পারিনি। খুবই তাড়াহুড়ো করে তিনি আমাদের কাছ থেকে বিদায় নেন। এরপর খবর পাই প্রকৌশলী নজরুল সীমানা পেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্পে যোগদান করেছেন। আমরাও প্রাত্যহিক কাজকর্মে নিজেদের নিয়োজিত করি। স্বাধীন বাংলা বেতারের অনুষ্ঠানমালা শুনি আর আল্লাহর কাছে মোনাজাত করি যেন শীঘ্রই আমাদের ওই অমানিশার অবসান হয়। তারপর হঠাৎ এলো সেই মর্মান্তিক খবর যে, নজরুল ইসলাম আর আমাদের মাঝে নেই। ১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তারিখে আমাদের কাছে থেকে চিরবিদায় নিয়ে ইহলোক ত্যাগ করেছেন। আজ তাঁর স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে অনেক কথাই মনে পড়ছে। প্রশ্ন জাগেÑ যে আদর্শের জন্য শহীদ নজরুল তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন সেই আদর্শ কি আজও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে?

লেখক : ব্যবস্থাপক, আটলান্টা এন্টারপ্রাইজ