১৮ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তিস্তার ভাঙনে বিলীন গঙ্গাচড়ার শংকরদহ বিকল্প আশ্রয়ের খোঁজে ৩০০ পরিবার

তিস্তার ভাঙনে বিলীন গঙ্গাচড়ার শংকরদহ বিকল্প আশ্রয়ের খোঁজে ৩০০ পরিবার

নিজস্ব সংবাদদাতা, রংপুর ॥ একটি বাঁধের অভাবে তিস্তার ভাঙনে বিলীন হচ্ছে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার দূর্গম চর শংকরদহ। এই চরের অনেক মানুষ এখন সহায় সম্বলহীন, গৃহহারা। মাথা গোঁজার ঠাই টুকুও তাদের নেই। অথচ ক’দিন আগেও তাদের ঘর-বাড়ি, জায়গা-জমি, হাল-গরু সবই ছিল। চরটিকে ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষা করার ব্যবস্থা না নেয়া হলে দ্রুতই এটি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে।

এই চরের বাসিন্দা অফিজ মিয়া। বয়স ৬৫। কোন কিছুরই অভাব ছিলনা তার। ছিল গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু ও পুকুর ভরা মাছ। জমি ছিল প্রায় ৭০ বিঘার(৩৩শতকে ১ বিঘা) মত। কিন্তু ৪/৫ বছরে জায়গা জমি, ঘরবাড়ি সবই গেছে রাক্ষুসী তিস্তার পেটে। বর্তমানে তিনি লালমনিরহাট জেলার কাকিনায় অন্যের জমিতে বসবাস করছেন। একই গ্রামের মোক্তার আলী। তিনিও ছিলেন সচ্ছল গৃহস্থ। জমি ছিল ১৫ বিঘা ।

কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তিনিও এখন নিঃস্ব। বর্তমানে আদর্শ গ্রামের পশ্চিম পার্শ্বে অন্যের জমিতে পরিবার-পরিজন নিয়ে কোনরকমে বসবাস করছেন। এই চরের রুহুল আমিনের ছিল প্রায় ৪০ বিঘা জমি। বর্তমানে তিনি সর্বস্বান্ত হয়ে বিনবিনা স্কুলের মাঠে আশ্রয় নিয়েছেন। অফিজ, মোক্তার ও রুহুল আমিনের মতো চর শংকরদহ গ্রামের শত শত পরিবার এখন তিস্তার ভাঙনে নিঃস্ব। গত ৪/৫ বছরে কয়েক দফা বন্যায় তিস্তর ভাঙনে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের শংকরদহ গ্রামটি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে।

একমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ, আশ্রয়ণ, পুকুরসহ ৩শ পরিবারের বাড়িঘর তিস্তায় বিলীন হয়েছে। এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শংকরদহ চর এখন বিরানভূমি। মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামটি। ক্ষয় হচ্ছে প্রতিদিন।

সরেজমিনে শংকরদহ গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নতুনভাবে নির্মিত শংকরদহ আদর্শগ্রামে যাওয়ার একমাত্র রাস্তাটি বন্যায় ভেঙে গেছে। লোকজনের একমাত্র ভরসা নৌকা। বন্যার পানি নেমে গেলেও শুরু হয়েছে তিস্তার ভয়াবহ ভাঙন। চোখের সামনে ঘরবাড়ি, গাছপালা, বাঁশঝাড়সহ তিস্তায় বিলীন হচ্ছে শংকরদহ গ্রাম।

ইতোমধ্যে এলাকার একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শংকরদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। প্রবল বন্যার কারণে লোকজন ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির কিছুই রক্ষা করতে পারেনি। শংকরদহ আশ্রয়ণ কেন্দ্রটিসহ পুকুর ও মসজিদটি আর নেই। সবমিলে বিধ্বস্ত শংকরদহ গ্রাম।

গঙ্গাচড়ার মহিপুরে লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদ থেকে গঙাচড়া শেখ হাসিনা সেতু পেরিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিম দিকে দুর্গম চর শংকরদহ। ওই চওে যাওয়ার পথে দেখা যায়, বন্যার পানি কমে গেলেও সেখানে লোক চলাচলের কোনো পথ নেই। কয়েকদিনের প্রবল বন্যায় রাস্তা-ঘাট ভেঙে গেছে। কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও কোমর পানি পেরিয়ে পৌঁছতে হয় শংকরদহ এলাকায়। চোখে পড়ে সর্বস্বান্ত লোকজন থালা-বাসন, হাঁস-মুরগি ও কাঁথা-বালিশসহ ভাঙনের কবল থেকে রক্ষা করা সংসারের জিনিসপত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নদীর কিনারায়। নৌকা এলেই তারা চলে যাবে শংকরদহর মায়া ত্যাগ করে অন্য কোনো এলাকায়।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শংকরদহ আশ্রয়ণ কেন্দ্রে থাকতো ৩০টি পরিবার। আশ্রয়ণ কেন্দ্রটি ভেঙে যাওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করছেন। অনেকের সাথে কথা বলে জানা গেলো, ওই গ্রামের ফজলু, নুরজামাল, স্বপন, হাফিজার থাকে নদীর ধামুর এলাকার বাঁধের পাড়ে। জলিল থাকে চেংডোবা, দেলদার থাকে গান্নারপাড়ে। এরকমভাবে ভাঙন কবলিত পরিবারগুলো উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থান করছেন। এলাকার ইউপি সদস্য আব্দুল মোন্নাফ জানান, শংকরদহ গ্রামে প্রায় ৪০০ পরিবারের বাস ছিল। এবারের বন্যা ও তিস্তার ভাঙনের কারণে ৩০০ পরিবারই এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। ভাঙন আতঙ্কে বাকি পরিবারগুলোও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন।

লক্ষ্মীটারী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, তিস্তার ভাঙনে স্কুল, মসজিদ ও আশ্রয়ণ কেন্দ্র কিছুই নেই। শংকরদহ এলাকাটি এখন বিরাণভূমি। এর সামনে দিয়ে বাঁধ না দিলে শংকরদহে বাকি অংশটুকুসহ বিস্তীর্ণ এলাকা তিস্তার পেটে যাবে। সেই সাথে হুমকির মুখে পড়বে মহিপুর-কাকিনায় নব নির্মিত গঙাচড়া শেখ হাসিনা সেতু। পানি উন্নয়ন বোর্ডেও নির্বাহী প্রকেীশলী মেহেদী হাসান বলেন, চরটি রক্ষা করতে হলে বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। কিন্তু এখন বর্ষা মৌসুম । তাই বাধঁ নির্মাণের কাজ করা যাবে না। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। শুষ্ক মৌসুমে প্রকল্প গ্রহণ করে শংকরদহ বাধ নির্মাণ করা হবে ।