১৬ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইতিহাসের রোজ গার্ডেন

সুগন্ধি গোলাপের আঙ্গিনায় তার সৌন্দর্য ম্গ্ধুতায় আবিষ্ট করে রেখে দিত দর্শনার্থী মাত্র। ইতিহাসের উজ্জ্বল দিগন্তকে ধারণ করে রাখা প্রাসাদের আঙিনা জুড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের দুর্লভ সব গোলাপ গাছেরা পুষ্পিত ইমেজ ধারণ করত। গোলাপ বাগান সমৃদ্ধ প্রাসাদ হবার কারণে নাম ধারণ করে ‘রোজ গার্ডেন’। দেশ তখন ইংরেজ শাসনাধীন। ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্যায়ের কালে এই ভবন নির্মিত হয়। ১৯৩০ সালে ঢাকার এক বিত্তবান ব্যবসায়ী বাইশ বিঘা জমির ওপর এই গার্ডেনের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের দুর্লভ সব গোলাপ গাছে সুশোভিত করেন এ উদ্যানটি। অপমানের প্রতিশোধ নিতেই তার এই বাগানবাড়ি নির্মাণ। উনিশ শতকে বলধার জামিদার নরেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী নির্মিত বলধা গার্ডেনে নিয়মিত গানের আসর বসত। উচ্চবিত্তদের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত এই বাগান বাড়িতে বিশ্বের সব দুর্লভ প্রজাতির গাছ-গাছড়া ছিল। বিনা আমন্ত্রণে হৃষিকেশ দাস সেই অনুষ্ঠানে গিয়ে বিতারিত হন সনাতন হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী নিম্নবর্গের হওয়ায়। বঞ্চনা ও অপমান থেকে একই রকম বাগানবাড়ি নির্মাণ করে এক ধরনের প্রতিশোধ গ্রহণ করেন যেন। কিন্তু ঋণের দায়ে হৃষিকেশ তার আত্মসম্মানের প্রতীক এই বাগানবাড়িটি ১৯৩৬ সালে ব্যবসায়ী খান বাহাদুর মৌলভী কাজী আবদুর রশিদের কাছে বিক্রি করে দেন। বংশ পরম্পরায় বাড়িটির মালিকানা তারই উত্তরসূরিদের ওপর বর্তায়। সত্তর সালে বাড়িটি ‘লিজ’ দেয়া হয় বেঙ্গল স্টুডিওকে। এখানেই শুরু হয় সিনেমার শূটিং। বাংলা সিনেমায় রাজা, বাদশা বা জমিদার বাড়ি হিসেবে এই প্রাসাদটিকে দেখা যেত। ১৯৮৯ সালে প্রতœতত্ত্ব বিভাগ রোজ গার্ডেনকে সংরক্ষিত ভবন বলে ঘোষণা করে। ১৯৯৩ সালে বাড়িটির অধিকার ফিরে পান কাজী পরিবারের উত্তরসূরিরা।

রোজ গার্ডেন পরিচিত হয়ে ওঠে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়া দল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠার স্মৃতি বিজড়িত স্থান হিসেবে। রাজধানীর টিকাটুলির ঐতিহাসিক এই ভবনটি নির্মাণ শৈলীর অভিনবত্বে অনন্য। এর ভিত্তির ওপর ছয়টি বিভিন্ন উচ্চতার খাঁজকাটা থাম রয়েছে। এগুলোর শীর্ষাংশ লতাপাতার নক্সা করা। এ ছয়টি থামকে নিয়ে নির্মিত সম্পূর্ণ অট্টালিকাটি পাঁচটি অংশে বিভক্ত। ভবনের মধ্যভাগের তিনটি অংশের প্রবেশদ্বারের ওপরের খিলানগুলো ঢালাই করা এবং অর্ধবৃত্তাকারের। ভবনটির সকল প্রবেশদ্বার কাঠ, রঙিন বেলজিয়াম কাঁচ ও লোহার সমন্বয়ে তৈরি। সেগুলো জটিল জ্যামিতিক নকশা, লতাপাতা ও বিভিন্ন প্রাণীর মোটিফে অলঙ্কৃত। প্রায় সাত হাজার বর্গফুট আয়তনের সুউচ্চ প্রাচীর বেষ্টিত পশ্চিমমুখী এই অট্টালিকাটি প্রায় পঁয়তাল্লিশ ফুট উঁচু। শ্বেত পাথরের মূর্তি, কৃত্রিম ফোয়ারা, ঝরনা, শান বাঁধানো পুকুর ও অনন্য স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত ভাস্কর্য- এক রাজকীয় বাগানবাড়ি এটা এর স্থাপত্যকে বলা হয় মাস্টারপিস। মুঘল স্থাপত্য, ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ, লোকজ ও ইউরোপীয় স্থাপত্যেও চমৎকার সম্মিলন ঘটেছে রোজ গার্ডেনের স্থাপত্য ব্যাকরণে। আওয়ামী লীগের জন্মের সাক্ষী হিসেবে যেমন ইতিহাসের অংশ। তেমনি স্থাপত্যশৈলী হিসাবেও এটি সংরক্ষণের দাবিদার।

এর পশ্চিম বাহু এবং উত্তর বাহুর মধ্যবর্তী অংশে দুটি মূল ফটক আছে। প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য পশ্চিম দিকের ফটক ব্যবহার হয়। এর বিস্তৃত বর্ণনা দেয়া সম্ভব নয় ভিন্ন পরিসরে।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবদুল হাশেমের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের একাংশের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন টিকাটুলীর কেএম দাস লেন রোডের রোজ গার্ডেন প্যালেসে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। ২৩ ও ২৪ জুন রোজ গার্ডেনে নতুন দল গঠনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে এক সম্মেলনের আহ্বান করা হয়। মওলানা ভাসানীকে সভাপতি, শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক, শেখ মুজিবুর রহমানকে যুগ্ম সম্পাদক করে নয়া দল প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের যাত্রা শুরু হয়েছিল যে স্থান থেকে, সেই ঐতিহাসিক রোজগার্ডেন অবশেষে সরকার কিনে নিয়েছে। সরকারী ক্রয় আইন অনুযায়ী ৩৩১ কোটি ৭০ লাখ টাকার বিনিময়ে বর্তমান মালিকের কাছ থেকে এ স্থাপনটি ক্রয় করা হয়েছে। ঐতিহাসিক বিবেচনা করে এটিকে একটি জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়েছে। নগর ভবনে যে জাদুঘর রয়েছে তা এখানে স্থানান্তর করা হচ্ছে। ভবনের মূল কাঠামো ঠিক রেখে তা সংস্কার করার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার আহ্বানে এটি সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এভাবে অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণের আওতায় আসবে বলে আশা জাগে।