১৫ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জাতীয় নির্বাচন ও পরিবর্তন -স্বদেশ রায়

জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় জীবনে পরিবর্তন আসবে এটাই স্বাভাবিক। সাধারণ একটা ধারণা আছে, জাতীয় নির্বাচনের ভেতর দিয়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের পরিবর্তে আরেকটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলে সেটাই পরিবর্তন। সব সময়ে তা ঠিক নয়। বাস্তবে নির্বাচনে ওই দলটি কী ইশতেহার দিচ্ছে আর তারা বাস্তবায়ন করবে কিনা, অতীতে করেছে কিনা এটাই বড় বিষয়। ইশতেহার যদি প্রকৃত অর্থে পরিবর্তনের ও আধুনিকায়নের পক্ষে হয় তবেই সেটা নির্বাচনের মাধ্যমে ম্যান্ডেট পেয়ে পরিবর্তনের সনদ হিসেবে উপস্থিত হয়। যেমন আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জোটের বাইরে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির কোন দল ও নেতা নেই যাদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পরিচালনা করা সম্ভব। আওয়ামী লীগের জোটের বাইরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কিছু লোকের ছোট ছোট কিছু মধ্যপন্থী ও বামপন্থী দল আছে- এরা বাস্তবে জনবিচ্ছিন্ন কিছু মানুষ। অন্যদিকে এরা ছাড়া যে জামায়াত ও বিএনপি আছে তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের তো নয়, বরং মৌলবাদী শক্তি। রাষ্ট্র তাদের হাতে গেলে পরিবর্তন হবে তবে সেটা দেশকে এগিয়ে নেয়ার পরিবর্তন নয়, তার বদলে ধ্বংস হয়ে যাবার সম্ভাবনাই বেশি থাকবে। অথচ পাঁচ বছর পরে একটি জাতীয় নির্বাচনের ভেতর দিয়ে যদি দেশে পরিবর্তন না আসে তাহলে তা যেকোন রাষ্ট্র বা জনগোষ্ঠীর জন্যে ক্ষতির কারণ। পাঁচ বছরে একটি জাতীয় জীবনে অনেক পরিবর্তন আসে, আর বর্তমানের এই তথ্যপ্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের যুগে এ পরিবর্তন হয় অনেক বেশি। তাই সে পরিবর্তনকে যদি জাতীয় নির্বাচনের ভেতর দিয়ে উপলব্ধি ও রাষ্ট্রীয় কর্মকা-ের ধারায় যোগ করা না হয় তাহলে জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। জাতীয় নির্বাচনও অর্থবহ হয় না।

যেমন এ মুহূর্তে জাতির সামনে যে বিষয়গুলো মোটা দাগে এসেছে, তার প্রথমে আসে একটি মানসম্মত শিক্ষার বিষয় নিশ্চিত করা। এই মানসম্মত শিক্ষা অবশ্যই আধুনিক চিন্তা চেতনাসম্পন্ন এবং বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হতে হবে। আধুনিক চেতনাসম্পন্ন ও বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও। আমাদের মুক্তি সংগ্রামের অন্যতম চাহিদা ছিল আধুনিক শিক্ষা নিশ্চিত করা। মানসম্পন্ন শিক্ষা ছাড়া কখনই কোন আধুনিক শিক্ষা হয় না। অন্যদিকে আধুনিক চিন্তা চেতনায় সমৃদ্ধ শিক্ষিত ব্যক্তি ছাড়া কখনই এই মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার নেতৃত্ব দিতে পারেন না। এমনকি বর্তমান বিশ্বের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানোর মতো শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি ছাড়া এ নেতৃত্বভার নেয়া সম্ভবও নয়। বর্তমান মুহূর্তে বাংলাদেশে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা যে কতটা জরুরী হয়ে পড়েছে তা ব্যাখ্যার কোন প্রয়োজন নেই। তাই এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে কীভাবে এটা নিশ্চিত করা হবে তার অঙ্গীকার জাতি আশা করে। পাশাপাশি এটাও আশা করে যে, শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে জাতি একজন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, বর্তমান বিশ্বকে জানেন ও বোঝেন এমন ব্যক্তিকে পাবেন। তার অঙ্গীকারও জাতি নির্বাচনী ইশতেহারে আশা করে। কারণ, এখন দেশের প্রতিটি নাগরিককে প্রতিযোগিতা করতে হয় বিশ্ব ফোরামে। তাই প্রকৃত শিক্ষাই এখন প্রথম ও প্রধান বিষয়। গত দশ বছরে দেশের খাদ্য ও অন্যান্য সমস্যার সমাধান হয়েছে। জাতি নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। এখন তাকে বিশ্ব ফোরামে যেতে হবে। যার জন্য ভাল শিক্ষার বিকল্প কিছুই নেই। এটাই এখন জাতির প্রয়োজনের তালিকায় এক নম্বরে। এজন্য কে শিক্ষা ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেবেন সেটা অনেক বড় বিষয়। কোন বিশেষ দর্শনে এককভাবে বিশ্বাসী কোন ব্যক্তিকে কখনই শিক্ষার মতো একটি বহুমুখী জাতি গঠনের বিষয়ে নেতৃত্বে দেয়া উচিত নয়। কারণ, কোন বিশেষ দর্শনে অন্ধভাবে বিশ্বাসী হলে তারা এক ধরনের মৌলবাদী হয়ে যায়। তারা কখনই কোন আধুনিক চিন্তাকে গ্রহণ করতে পারে না। এ কারণে উদার চেতনায় সমৃদ্ধ শিক্ষিত ব্যক্তিকে শিক্ষা ক্ষেত্রের নেতৃত্ব দেয়া হবে এ নিশ্চয়তা আধুনিক চিন্তা ধারার রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে মানুষ আশা করে।

অন্যদিকে এই নির্বাচনের ইশতেহারের রূপরেখাটি স্পষ্ট হওয়া দরকার। যার ভেতর দিয়ে আধুনিক চিন্তাসম্পন্ন তরুণ প্রজন্ম দেখতে পায় রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা আছে। নির্মম সত্য হলো, দেশের দুটো বা তিনটা জেনারেশন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দেশের অনেক ক্ষেত্রে নেতৃত্বের অবস্থা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে যে জেনারেশন সোভিয়েতের বিপ্লবে ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অবদান রেখেছিল তাঁরা তাদের সেলফ লাইফ শেষ হয়ে যাবার পরেও রাষ্ট্র কাঠামোর প্রায় সকল স্তরের নেতৃত্ব আঁকড়ে রেখেছিল। পরবর্তী প্রজন্মের হাতে হস্তান্তর করেননি। তার পরিণাম ইতিহাস দেখেছে। বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন জোট নেতা শেখ হাসিনা একমাত্র এ সত্য উপলব্ধি করেন শুরু থেকে। কারণ, তিনি তাঁর পিতাকে দেখেছেন। এ উপমহাদেশের রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুই সব থেকে বেশি সজাগ ছিলেন নতুন প্রজন্মকে সামনে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে। যাতে কোন ক্রমেই নতুন প্রজন্মের মেধা ও গতিশক্তি নষ্ট না হয় সেটা তিনি খেয়াল করতেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী তিন থেকে চারটি প্রজন্মকে এখনই সর্বোচ্চভাবে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সকল স্তরে ব্যবহার করা প্রয়োজন। তাদের চিন্তা চেতনা ও গতি শক্তি দেশের কাজে এখনই ব্যবহার করার সুযোগ দিতে হবে।

রাষ্ট্রীয় কাঠামো বলতে শুধু সরকারী কাঠামো নয়, রাষ্ট্রের ভেতর সকল প্রকার কাজকে বুঝায়। কারণ, রাষ্ট্র এখন এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, ব্যক্তি জীবনকে এগিয়ে নেবার পথেও রাষ্ট্র যদি সহায়ক না হয় তাহলে একের পর এক বাধা আসে। বর্তমানের বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম অনেক বেশি গতিশীল। তাদেরকে যদি কেবল বাধা না দেয়া হয়, রাষ্ট্রের সিস্টেমগুলো যদি বর্তমানের যে প্রাগৈতিহাসিক অবস্থায় আছে এর বদলে আধুনিক করা হয়Ñ তাহলেই তারা নিজেরাই এগিয়ে যেতে পারবে। রাষ্ট্রের ভেতর রাষ্ট্রের নাগরিকরা যাতে বিনা বাধায় এগিয়ে যেতে পারে, তরুণ প্রজন্ম যেন তাদের সর্বোচ্চ গতিতে ছুটতে পারে, রাষ্ট্রের সিস্টেমকে সেটাই নিশ্চিত করতে হবে। এ কারণে জাতীয় নির্বাচনের আগে শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মসহ সকলেই আশা করে রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে এর সার্বিক রূপরেখা থাকতে হবে। গত দশ বছরে বাংলাদেশ যেখানে এগিয়ে গেছে এখন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ব্যাপক আধুনিকায়ন ছাড়া কোন মতেই দেশের সমগ্র তরুণ শ্রেণীকে ধারণ করা তাদের গতিকে রাষ্ট্রের গতির সঙ্গে মিলিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। তাই এবার নির্বাচনে অবশ্যই আধুনিক রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহার অনেক বেশি ভবিষ্যতমুখী হতে হবে। শেখ হাসিনার মতো আধুনিক রাষ্ট্রনায়কের দলকে অবশ্যই উন্নত ও পজিটিভ রাষ্ট্র গড়ার অঙ্গীকারনামা বা নির্বাচনী ইশতেহার জাতির সামনে, তরুণ প্রজন্মের সামনে আনতে হবে। যে ইশতেহারের ভেতর দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাবে রাষ্ট্র তার মানুষকে এগিয়ে যেতে শতভাগ সহায়ক, মোটেই বাধার বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে না।

যেমন আগে বলা হতো বা এখনও কেউ কেউ বলেন, রাষ্ট্র কর্মসংস্থান দেবে। এটা বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে খাপ খায় না। কারণ, এখন বিশ্ব ভিন্ন গতিতে এগুচ্ছে। এখন কর্মসংস্থানের কনসেপ্ট বদলে গেছে। এখন একটি সরকারী চাকরিকে কোন আধুনিক তরুণ প্রকৃত কর্মসংস্থান মনে করে না। বরং এখন রাষ্ট্রকে সেখানে আসতে হবে, যাতে দেশের মানুষ, দেশের তরুণ প্রজন্ম তাদের আইডিয়াগুলো, তাদের কনসেপ্টগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে বিনা বাধায়। পুরনো দিনের ধ্যান ধারণা নিয়ে রাষ্ট্র যাতে তাদের বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ কীভাবে দেশের তরুণ প্রজন্মের উদ্ভাবনীর পথগুলোর সহায়ক হবে এবং রাষ্ট্র নিজে কতটা উদ্ভাবনী রাষ্ট্র হবে- সেই চিন্তাধারা ও তার একটি পরিপূর্ণ রূপরেখা রাজনৈতিক দলকে জাতির সামনে আনতে হবে। নির্বাচনের আগে যেমন এগুলো উপস্থিত করা প্রয়োজন তেমনি নির্বাচনী ওই সব অঙ্গীকার যে বাস্তবায়িত হবে তার রূপরেখাও দিতে হবে। নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য একজন নেতাকে যে কত দৃঢ় হতে হয় তার প্রমাণ এদেশে শেখ হাসিনা। তাঁর নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল পদ্মা সেতু নির্মাণ। বিশ্ব ব্যাংক শুধু নয়, দেশের ভেতরের এক ঝাঁক ষড়যন্ত্রকারী, যারা সকলেই উচ্চ শিক্ষিত ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ক্ষমতাশালী- তারা সকলে এই পদ্মা সেতু যাতে না হয় সে লক্ষ্যে কাজ করেছিলেন। তারা একের পর এক ষড়যন্ত্র করেন। ওই সকল ষড়যন্ত্রকে মোকাবেলা করে, নিজ অর্থে আজ পদ্মা সেতু তৈরি করছেন শেখ হাসিনা। পদ্মা সেতু যে দেশের এক প্রান্তকে অন্য প্রান্তের সঙ্গে যোগ করে দিচ্ছে, এই যোগ করার কাজটি অনেক বড়। দেশের মানুষ এর ফল কী পাবে তা ইতোমধ্যে অনেক তথ্যসহ জেনেছে। দেশের বর্তমানের পাঁচ কোটি তরুণের একের হাত অপরের সঙ্গে যোগ করিয়ে দেবার কাজটি কিন্তু সহস্র সহস্র পদ্মা সেতু তৈরির সমান। সে কাজটি কীভাবে হবে, আগামী নির্বাচন যে দেশকে সেই পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাবে- এর রূপরেখা জাতিকে জানাতে হবে। মনে রাখতে হবে, আগামী পাঁচ বছর অনেক বেশি পরিবর্তনের সময়। বাস্তবে এটা যে পদ্মা সেতুর মতই মানব সেতু তৈরির পাঁচ বছর হবে- তার রূপরেখা জাতি নির্বাচনের আগে জানতে চায়। অঙ্গীকার চায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দলের কাছে, বাস্তবায়িত হবে এই মানব সেতু নির্মাণ।

swadeshroy@gmail.com