১৫ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রেক্ষাগৃহগুলো এখন জাদুঘরে পরিণত!

  • মিলন মাহমুদ রবি

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বলতে অবিভক্ত বঙ্গ (১৯৪৭ পর্যন্ত) থেকে শুরু করে পূর্ব পাকিস্তান এবং ১৯৭১ সালের পর স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে বোঝায়। পৃথিবীর অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও (তদানীন্তন পূর্ববঙ্গ) ১৮৯০-এর দশকে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী শুরু হয়েছিল। চলচ্চিত্রের উৎপত্তি ১৯১০-এর দশকে হলেও এখানে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নিয়ে আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে ১৯৫০- দশকেই। প্রায় ৫০ বছরের মতো সময় লেগেছে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিবেশের সঙ্গে চলচ্চিত্রের খাপ খাইয়ে নিতে। ১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশে প্রতি বছরে গড়ে ৮০টির মতো পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মুক্তি পেত। আর ২০০৪ সালের হিসাব মতে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতে বছরে গড়ে প্রায় ১০০টির মতো চলচ্চিত্র মুক্তি পেত। এ হিসেবে দেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে বেশ বড় শিল্পই বলা যেতে পারে। আর বিনোদন কেন্দ্র বলতে এক সময়ে সিনেমা হলগুলোকে প্রাধান্য দেয়া হতো। আজ সেই সিনেমা হলগুলোতে দর্শকখরা চলছে। দর্শকসংখ্যা কমে যাওয়ায় ছবি চালিয়ে খরচ ওঠানো হলমালিকদের জন্য এখন খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে সিনেমা হলগুলো যেন এখন পরিত্যাক্ত জাদুঘরের মতো! ব্যবসায়ীকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ক্রমাগত লোকসান দিতে দিতে অনেকেই একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ করে দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ কুল কিনারা হারিয়ে বন্ধ করার চিন্তা করছেন। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির হিসেবে অনুযায়ী, ঢাকাসহ সারাদেশে মোট ১ হাজার ৪৩৫টি সিনেমা হল চালু আছে। দেশে ২০১১ সালেও চালু সিনেমা হলের সংখ্যা ৬১৮টি। ২০১০ সালেও এ সংখ্যা ছিল ৭২২টি। ২০১২ সালের পর এই পর্যন্ত একের পর এক সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, জামালপুর, চট্টগ্রাম রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর বিভাগে একের পর সিনেমা হল বন্ধ হয়েছে। সারাদেশে বন্ধ হওয়া সিনেমা হলগুলোর মালিকরা কেউ কেউ গোডাউন হিসেবে ভাড়া দিয়েছে। কোথাও কোথাও তৈরি হয়েছে সুপার শপ। এছাড়া ঢাকা মহানগরে বন্ধ হয়েছে ২০ টিরও বেশি। এর মধ্যে ঢাকাতে অধিকাংশ হল ভেঙ্গে বিপণিবিতান নির্মাণ হয়েছে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের (ডিসিসি) হিসাব অনুযায়ী, রাজধানীতে এখন চালু আছে এমন সিনেমা হলের সংখ্যা ২৮টি।

বন্ধ হতে যাওয়া তেমনই একটি সিনেমা হলের সরেজমিনে গিয়ে দেখা মেলে, সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া থানায় অবস্থিত ‘জোনাকি সিনেমা’ হল, ১৯৮৩ সালে নির্মাণ করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আতিয়ার রহমান। সাংস্কৃতিমনা মানুষ ছিলেন তিনি। একসঙ্গে ৫০০ আসনের ব্যবস্থা আছে হলটিতে। তাঁর স্বপ্ন ছিল চলচ্চিত্রশিল্প ব্যবসা করার। তাই তিনি সেই সময়ে নিজ গ্রামে নির্মাণ করেন হলটি। বেশ ভালো ব্যবসাও জমিয়েছিলেন তিনি। আতিয়ার রহমানের পর ব্যবসার দায়িত্ব পালন করেন তার চার ছেলে। তবে বর্তমানে পুরোপুরি দেখাশোনা করছেন মেঝো ছেলে মো. শাহজাহান কবির ডাবলু। বাবার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে তিনি প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বর্তমানে বেহাল দশা হলটির। ভাল ছবি মুক্তি না পাওয়ায়, সারাদিনে কোন দর্শকদের আনাগোনা না থাকায় বসেই দিন পার করছেন হল মালিকসহ স্টাফরা। কোনকোন দিন ১০-১৫ জন দর্শক নিয়েই চালানো হয় শো। কিছু খরচ উঠলে সে বেলায় চলে! না হয় অসহায়ের মতো বসেই থাকতে হয়। এমন অবস্থায় মাস শেষে স্টাফদের বেতন দেয়াই দায় হয়ে পরে। ডাবলু জানান, বর্তমানে আমরা হল মালিকরা চাহিদা মতো ছবি পাচ্ছি না। তাছাড়া ছবির গল্প ও মান ভাল না হওয়ায় দর্শকদের চাহিদা তেমন একটা মেলে না। তাই দর্শকখরা থাকে মাসব্যাপী। আর দর্শক এখন খুবই রুচিশীল, ইন্টারনেটে দেশ-বিদেশের ভাল ভাল ছবি ঘরে বসেই আরাম আয়েশ করে দেখতে পাওয়ায় হলে গিয়ে ছবি দেখতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তবে যৌথ প্রযোজনার কিছু ছবি গল্প ও নির্মাণ ভাল হওয়ায় কিছু দর্শকের দেখা পাওয়া গেছে। তাছাড়া চলচ্চিত্র ব্যবসার সঙ্গে কিছু অসাধু লোক জড়িয়ে পড়ায় এ শিল্প ধ্বংসের দারপ্রান্তে প্রায়। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একটু ভিন্নতা খুঁজতে চায় দর্শক। এছাড়া চলচ্চিত্রে এখন আগের মতো ভাল শিল্পীও তৈরি হচ্ছে না। অভিনয়ের দিক থেকে তেমন পারদর্শী না হওয়ায় দর্শকের মনের খোরাক তেমন মেটে না। তিনি বলেন, দর্শক ছাড়া হলগুলোর কোন মূল্য নেই। দর্শক ঘিরেই সবকিছু আমাদের। এখনও ব্যবসাটা ধরে রেখেছি সোনালী দিন ফিরে পাবার আসায়। সিনেমা শিল্পকে মেরুদ-- সোজা করে দাঁড়ানো সুযোগ দিতে এ শিল্পের ওপর থেকে সব ধরনের ভ্যাট, টাক্স প্রত্যাহার করার কথা জানিয়েছেন সিনেমা হল মালিক। আর ভাল ছবি নির্মাণ করতে এই শিল্পের ওপর নজর বাড়ানোর দাবিও জানান। এ অবস্থায় দেশের মানুষের বিনোদনের প্রাচীন ও জনপ্রিয় এ খাতকে রক্ষা করার জন্য সরকারী সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। এ শিল্পে সরকারের প্রচেষ্টা ও পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে এ খাতের অস্তিত্ব একসময় বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।

হল বন্ধের নেপথ্যে

মানুষ এখন হলে গিয়ে ছবি দেখে না। সিনে কমপ্লেক্সে পরিবেশ ভাল থাকায় কিছু দর্শক দেখা যায়। এছাড়া আকাশপ্রযুক্তি মুক্ত হওয়ায় মানুষ এখন ঘরে বসেই দেশ-বিদেশের ছবি নিজের মনমতো দেখার সুযোগ পাচ্ছেন।

সবার ঘরে ঘরে ক্যাবল নেটওয়ার্ক সংযোগ থাকায় টিভি খুলেই পছন্দের মতো বাংলা, হিন্দী ও ইংরেজী ছবি সব ঘরে বসেই দর্শক আরাম-আয়েশে সেগুলো দেখতে পাচ্ছেন। আর বাসার কাজের ফাঁকে গৃহিণীরা দেখছেন পছন্দের সব ছবি আর চ্যানেল। এছাড়া মুঠো ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করে সবার আগে সব কিছু দেখতে পাচ্ছেন। সিনেমা হল বন্ধের কারণ হিসেবে হল মালিকরা মূলত কমসংখ্যক আর ভাল মানের চলচ্চিত্র মুক্তি পাওয়াকেও গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন।