১৯ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

“ হায় হোসাইন -হায় হোসাইন ” মাতমে সৈয়দপুরের তাজিয়া মিছিল

 “ হায় হোসাইন -হায় হোসাইন ” মাতমে সৈয়দপুরের তাজিয়া মিছিল

স্টাফ রিপোর্টার, নীলফামারী ॥ পবিত্র আশুরা উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এবারও নীলফামারীর উর্দুভাষী শহর সৈয়দপুর বাসী মেতে উঠবে। এ সময় বুক চাপড়ে “হায় হোসাইন- হায় হোসাইন” বলে মাতম করবেন অংশগ্রহণকারীরা। তাজিয়া মিছিলের জন্য সৈয়দপুরে সকল প্রকার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।

আরবি ৭ তারিখে রাত ১১টার দিকে ইমামবাড়ায় বসানো হয় তাজিয়া। এবং মহররম মাসের ১০ তারিখ পর্যন্ত দলবেঁধে প্রত্যেক ইমামবাড়ায় ইয়া হোসাইন ইয়া হোসাইন বলে কাসিদা পাঠ করেন থাকেন পাইকওয়ালারা।দিনটি মুসলিম উম্মাহর কাছে শোক ও ত্যাগের দিন হিসেবে পরিচিত হলেও সৈয়দপুরে আশুরা পালনে শিয়া ও সুন্নী সম্প্রদায়ের একটি অংশ আলাদা আলাদাভাবে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে তাদের তরিকানুযায়ী পালন করে থাকেন পবিত্র আশুরা। মহররম মাস এলেই তাজিয়ার নগরীতে রূপান্তরিত হয় নীলফামারীর সৈয়দপুর। অবাঙালি অধ্যুষিত জনপদ হওয়ায় প্রতি বছর ভিন্ন অত্যান্ত জাঁকজমকভাবে পালিত হয়ে থাকে পবিত্র আশুরার সকল আনুষ্ঠানিকতা।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে সৈয়দপুর থানার ওসি শাহজাহান পাশা জানান, তিন বছর আগে সৈয়দপুরে প্রতীকী কারবালার খাদেম হাসনাইন মাস্টারকে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা করেছিল জঙ্গিরা।সে অনুসারে উভয় সম্প্রদায়ের আশুরার আনুষ্ঠানিকতায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। নিরাপত্তার খাতিরে এবারও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন প্রকার চাকু ছোরা অস্ত্র বহনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য পুলিশের পাশাপাশি র্যাব ও বিজিবি টহলও থাকবে।এদিকে সকল আনুষ্ঠাকিতা সুষ্ঠুভাবে স¤পন্ন করতে শহরের বিভিন্ন ইমামবাড়ার জিম্মাদার খলিফাদের সাথে বৈঠক করেছে উপজেলা প্রশাসন ও সৈয়দপুর থানা পুলিশ।

সৈয়দপুর শহরে ৬৪টির অধিক ইমামবাড়া থাকায় অনেকটা তখন তাজিয়ার শহরে রূপান্তরিত হয়েছে শহরটি। শহরের মুন্সিপাড়ার জোড়াপুকুর ইমামবাড়ায় বসেছে মেলা, তৈরি করা হয়েছে বড় বড় তোরণ।রঙিন কাপড়ে বানানো তোরণের গায়ে জ্বলছে হরেক রংয়ের বাতি। ইমামবাড়াগুলোতে মানতকারীদের জটলা, পাইকবাঁধার সাথে চলছে ফাতেহা পাঠ। এভাবে বিভিন্ন মহল্লার প্রতিটি ইমামবাড়ায় তাজিয়া বানানো হচ্ছে। রয়েছে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা। একসাথে তালে তালে বাজানো হচ্ছে ঢোল। সুন্নী সম্প্রদায়ের একটি অংশ এভাবে শহরের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করেন বড় বড় তোরণ।শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোয় চলে ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলা, তলোয়ার ও আগুনের বিভিন্ন ধরনের খেলা। একই সঙ্গে মুখে উচ্চারিত “হায় হোসাইন- হায় হোসাইন”।কেউবা অঝোর নয়নে কাঁদেন আর ইমাম হোসেনের শাহাদতকে স্মরণ করে মার্সিয়া পাঠ করেন।

সারারাত ঢোল বাজনা, তাজিয়া মিছিল, লাঠি খেলা, ইমাম হোসেনের ঘোড়ার প্রতিকৃতি হিসাবে মানত করে পাইকবাঁধা, ইমামবাড়ায় ফাতেহা পাঠ, নিশান চড়ানো হয়ে থাকে। শহরের অনেক জায়গায় আবার কাসিদা পাঠের জন্য ঝর্না খেলার আসরও বসে। সব মিলে মহররম মাসের আনুষ্ঠানিকতা পালনে সৈয়দপুর পেয়ে আসছে এক আলাদা পরিচিতি। আর এসব আনুষ্ঠানিকতা দেখতে আশপাশের শহর থেকে ছুটে আসেন প্রচুর মানুষ।

সৈয়দপুর হাতিখানায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় প্রতীকী কারবালার আয়োজক কমিটির সদস্য জাভেদ (৪৫) জানান, মহরমের ৭ তারিখে কারবালা থেকে কিছু মাটি শহরের প্রতিটি ইমামবাড়ায় নিয়ে যান সেখানকার খলিফারা।বিশেষ নিয়ম অনুযায়ী সে মাটি একটি পাত্রে করে তাজিয়ার নিচে সংরক্ষিত রাখা হয়। এরপর তাজিয়াকে কেন্দ্র করে চলে অন্যান্য রীতিনীতি। শহর জুড়েই দর্শনার্থীদের ভিড় থাকে। তারা দেখতে আসেন, দোয়া পড়েন, ভক্তি করেন।মহরমের ১০ তারিখ অর্থাৎ আশুরার দিন মাটি যেখান থেকে আনা হয়েছিল সেখানেই রেখে আসা হয়। সে মাটি রাখার জন্যও যেতে হয় শোকাবহ মিছিল সহকারে। কারও কারও শরীর রঙিন রশি, জরির ফিতা এবং ছোট ছোট ঘুণ্টির মালা দিয়ে পেঁচানো।প্রত্যেকের মাথা সাদা ও সবুজ কাপড়ের টুকরো দিয়ে ঢাকা। হাতে লাল সবুজ আর সাদা রংয়ের পতাকা। হাজার হাজার লোকের মিছিলে প্রতীকী কারবলায় তখন তিল পরিমাণ জায়গা থাকে না। পরে শেষ মোনাজাতের মাধ্যমে শেষ হয় সুন্নী সম্প্রদায়ের একটি অংশের এ আনুষ্ঠানিকতা।এদিকে শিয়া সম্প্রদায় সৈয়দপুরে তাদের মার্কাজ পাবর্তীপুর রোডে অবস্থিত শিয়া মসজিদ থেকে বের করে থাকে শোক শোভাযাত্রা। মাতম করে হায় হুসাইন হায় হুসাইন বলে তাদের এই শোক মিছিলে অংশগ্রহণ করেন

সৈয়দপুরের বিভিন্ন শিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন সহ নীলফামারী, রংপুর, দিনাজপুরের শিয়া সম্প্রদায় লোকেরা। এবং তাদের সাথে যোগ দেন বিভিন্ন সম্প্রদায়ে মানুষ।শোক মিছিলে নওহা, কাসিদা, মর্সিয়া, শোকগাথা ও ইমাম হোসাইনের জীবনী পাঠসহ এ সময় কালেমা খচিত বিভিন্ন পতাকা বহন করে শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা। সৈয়দপুর শিয়া সম্প্রদায়ের নেতা ও সৈয়দপুর শিয়া মসজিদস্থ আঞ্জুমানে আব্বাসীয়ার সেক্রেটারি সৈয়দ শাহিদ হোসেন রেজভী জানান, প্রতি বছর এ কেন্দ্রীয় মসজিদে মাতমে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিয়া সম্প্রদায় যোগ দেন।বিশাল এ শোক শোভাযাত্রাটি দেখতে পার্বতীপুর রোডে জমায়েত হন শহরের অনেক মানুষ।

নির্বাচিত সংবাদ