১৫ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দুই জমিদারের তিন বাড়ি

  • রিফাত কান্তি সেন

এখন শরতকাল। আকাশে সাদা মেঘের খেলা। মাঝে মাঝে বৃষ্টি আবার কখনও থমকে যাওয়া ভাব। ক’দিন ধরেই ভাবছিলাম একটি পুরনো দিনের স্থাপত্যের সন্ধানে বেড় হব। বিশেষ করে পুরনো কোন জমিদারবাড়ি হলে মন্দ হয় না। কিন্তু কোথায় যাই ঠিক ভেবে পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ মনে হলো চাঁদপুরের কাছে একটা জায়গা আছে হরিপুর নামে সেখানে গেলে মন্দ হবে না। বিষয়টি সম্পর্কে বিষদ ধারণা দিলেন সাংবাদিক মাসুদ আলম মাসুদ ভাই। তিনি বেশ ক’বছর ধরেই মূল ধারার সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত তাই অনেক তথ্যই তার কাছে পাওয়া যায়। তাই চলে গেলাম তাঁর অফিসে। ঘুম থেকে উঠেই রওনা দেয়ার কথা থাকলে ও বৃষ্টির কারণে আমি বাড়ি থেকে সময় মতো বেড় হতে পারিনি। প্রথমেই পৌঁছালাম চাঁদপুর। মাসুদ ভাইকে সঙ্গে নিয়ে কোন এক রাজার বাড়িতে ঘুরতে যাব বলে মন স্থির করলাম। তিনি ঠিক করলেন হরিপুর জমিদার বাড়িতে যাবেন। আমি আর দ্বিমত পোষণ করলাম না। আমাদের সঙ্গে যুক্ত হলেনÑ তানভীর ও। তানভীরের বাড়ি হরিপুরের দিকে যেতেই পরে। দুটি বাইক নিয়ে আমাদের বেড়িয়ে পড়া। পথে পথে হাসি, ঠাট্টা গান আহা এ যেন মধুর এক ক্ষণ । যেতে যেতে মাসুদ ভাই বলছিল যে কোন মুহূর্তে বাইকের তেল শেষ হয়ে যেতে পারে। একটু ভয় ছিল গ্রামীণ রাস্তা তেল শেষ হয়ে গেলে আমাদের যে কী দুর্ভোগ পোহাতে হবে তা সৃষ্টিকর্তাই ভাল জানেন। তবু আমাদের এগিয়ে চলা। যেতে যেতে প্রাকৃতিক দৃশ্য আমাদের মন ভরিয়ে দেয়। দুদিকে সবুজ গাছের সারি আহা এ যেন অনাবিল এক আনন্দ। হরিপুর চৌধুরী বাড়িতে যাওয়ার পূর্বে মাসুদ ভাই বললেন হরিপুর গ্রামের আগেই নাকি ফরক্কাবাদ নামে একটি জায়গা আছে সেখানে রাজার বাড়ি এবং রানীর হাট নামে দুইটি জমিদারবাড়ি রয়েছে যেখানে জমিদারদের অস্তিত্ব এখন নেই। জমিদারদের বংশধরদের ও তেমন কোন খবরাখবর নেই। তবে বিশালাকার বাড়িটি নাকি জমিদাররা বিক্রি করে গেছেন এবং সেখানে বর্তমান মালিকরা বসবাস করেন। বাড়িতে ঢুকতেই আমরা অবাক হয়ে গেলাম, আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা, আমড়া, বেল, কলা, কমলা, আকড় গাছ, মন্ডফল, কামরাঙা, চালতা, বড়ই, আম, কি ফলের গাছ সেখানে নেই! রয়েছে অর্জুন,

লজ্জাবতীর মতো ঔষুধি বৃক্ষ। লজ্জাবতীর লাজুকভাবে সত্যি মনে শিহরণ জাগায়। আমি অনেকক্ষণ লজ্জাবতী গাছগুলো নিয়ে মজা করলাম। প্রকৃতি যে এত সুন্দর বুঝতে পারিনি আগে কখনও। সবুজ পাতার ফাঁকে উঁকি মারে পাখি। বনজ, ঔষুধি কী গাছ নেই! বাড়িটিতে। শুনলাম সে বাড়িতে দুজন হেকিম ও আছেন। তাই তো এত ঔষুধি আর ফলজ গাছের সমারহ। জমিদারদের সর্বশেষ বংশধর সুরেশ চন্দ্র রায় থেকে ক্রয় সূত্রে মালিক যারা এখন ওই বাড়িতে বসবাস করেন তাদেরই একজন মুকবুল পাটওয়ারী। আমাদের খুব আপ্যায়ন করলেন। নিজেদের গাছের আমড়া খেতে দিলেন। কলা, বিস্কুট আরও কত কী! খাওয়ার ফাঁকে মাসুদ ভাই গল্প জুড়ে দিলেন তার সঙ্গে। এর ফাঁকে তানভীর ছবি তোলা নিয়ে ব্যস্ত। আমি কিন্তু খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত। আমরা তিনজন খেয়েই আবার ছুটলাম হরিপুরের উদ্দেশে। পথিমধ্যে ফরক্কাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিন হাওলাদার স্যারের সঙ্গে তার অফিসে দেখা করি। ওনার কাছ থেকে রাজার বাড়ি, রানীর বাড়ি সমন্ধে কিছু তথ্য নিয়েছি। তিনি জানালেন, শতবর্ষী একজন শিক্ষক আছেন যিনি কি-না ১৯৫৯ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন, তার কাছে গেলেই নামকি সব তথ্য পাওয়া যাবে। নাম তাঁর শ্রী বিজয় চন্দ্র দে। এলাকার মানুষ তাকে তথ্য ভা-ার হিসেবেই জানেন। মেধা শক্তি তাঁর খুবই প্রখর। শুনেই ভাবলাম উনিই সঠিক তথ্য আমাদের দিতে পারবেন রাজা-রানীর বাড়ি সমন্ধে। ছুটে গেলাম তার বাড়ি। গিয়ে দেখি বার্ধক্য ধরা দিয়েছে গুণী এই ব্যক্তিকে। কিন্তু এখনও তার কথা বলার ধরন, স্মরণশক্তি খুবই ভাল। তিনি আমাদের জানালেন, সাড়ে চার শ’ বছর পূর্বে পশ্চিমবঙ্গের কানপুরের অন্তর্গত ফরাক্কাবাদ নামক স্থান হইতে প্রয়াত গগন চন্দ্র সিংহ রায় নামক একজন ঐতিহাসিক রাজা পূর্ববঙ্গে একটি ঔপনিবেশ স্থাপন করার জন্য এদেশে আসিয়াছিলেন। অতপর ওই গগন চন্দ্র সিংহ রায় মহোদয় ৯নং বালিয়া ইউপি অধীন ফরক্কাবাদ নামক স্থানে বসতি স্থাপন করেন। সুরেশ চন্দ্র সিংহ রায় ছিলেন জমিদারদের শেষ পোষ্য জমিদার। স্বাধীনতার পরই তিনি কলকাতায় আত্মীয়দের বাড়িতে স্ট্রোক করে মারা যান। তিনি বলেন, জমিদারদের বেশ সুনাম ছিল। কারো অনিষ্ঠ চিন্তা তাঁরা করত না। একবার নাকি এক অত্যাচারী জমিাদার তার পুত্রের জন্য ফরক্কাবাদের জমিদার কন্যাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। প্রজাদের সঙ্গে তাদের আচরণ ছিল বন্ধুত্বসুলভ।

যাই হোক, অবশেষে আমরা পৌঁছালাম হরিপুর চৌধুরী বাড়ি। চৌধুরী বাড়িটিকে অনেকেই জমিদার বাড়ি ও বলে থাকেন। আমরা চৌধুরী বাড়ির প্রথম ফটক দিয়ে প্রবেশ করলাম চৌধুরী বাড়িতে। বিশালাকার অট্টালিকা, কারুকার্য খচিত দালান, দৃষ্টিনন্দন সব স্থাপত্যশৈলী যে কারও নজর কারার মতো। এত বিশাল বাড়ি অথচ আমরা প্রবেশ করার পর কারও কোন সাড়া-শব্দ পাচ্ছিলাম না। পরে জানতে পারি চৌধুরী পরিবারের অনেকেই এখন সেখানে থাকেন না। হয়ত কখনও কখনও ঘুরতে আসেন। এত বিশাল বাড়ি, এতগুলো দালান সবই পরে আছে সবই নিথর দেহের মতো। বাড়িতে ঢুকেই দেখা মিলল বেশ ক’টি কারুকার্য খচিত অট্টালিকার। অট্টালিাকাগুলোতে খচিত রয়েছে চৌধুরীদের নাম ফলক। মুহাম্মদ রাজা, শহীদ মঞ্জিল, মতি মহল, এলাহী বক্স। তবে অট্টলিকার সংখ্যা ছয়টি। সবগুলোই দৃষ্টিনন্দন, শৈল্পিক ছোয়া পড়েছে বাড়িটিতে। ওই চৌধুরী বাড়ির প্রথম জমিদার ছিলেন তনু চৌধুরী। ব্রিটিশ শাসন বিলুপ্তের পর তাদের রাজত্ব চলে যায়। বর্তমানে চৌধুরী বংশের ৪র্থ বংশধররা সে বাড়িটিতে থাকেন। ইকবাল বাহার চৌধুরী ৪নং বংশধরদের মধ্যে একজন। তিনি আমাদের তথ্যগুলো দিলেন। তিনি জানালেন, ‘চাঁদপুরের ঐতিহাসিক চৌধুরী ঘাটলাও চৌধুরীদের আমলের করা।’ বাড়িতে ঢোকার মূল ফটকের পাশে রয়েছে শান বাঁধানো ঘাটলা। রয়েছে বিশালাকার দীঘি। মূল প্রবেশের পথের কাছেই রয়েছে কাচারি ঘর। ছোট-বড় মিলিয়ে বেশ কটি পুকুর। চৌধুরীরা ছিলেন শিক্ষানুরাগী। তাই তো বাড়ি পাশেই গড়ে তুলেছিলেন, গাজীপুর ছোরিয়া ফাজিল (ডিগ্রী) মাদ্রাসা, চৌধুরী বাড়ি হাফেজিয়া মাদ্রাসা, চৌধুরী বাড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্প উইথ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। বাড়ির পাশেই রয়েছে কবরস্থান। সেখানে গিয়ে দেখতে পাই কবলগুলোতে খচিত করে চৌধুরীর পূর্বপুরুষদের নাম লেখা রয়েছে। শে^ত পাথরে আকড়ে আছে তাঁদের পূর্বপুরুষদের নামগুলো। বর্তমানে বাড়িটিতে জমিদারদের ৭টি পরিবার বসবাস করছে। তারা খুবই মিশুক। আমাদের খুব আতিথেয়তা দেখিয়েছে। কখনও ভোলার মতো নয়। এর পর আমরা পুরো বাড়িটি ঘুরে ঘুরে দেখলাম। ইচ্ছে মতো ছবি তুললাম। শূটিংয়ের জন্য চমৎকার একটি স্থান হবে এটি। অতঃপর সন্ধ্যায় বাড়ি ফেলার পালা। সারাদিন ঘোরাঘুরি করে ক্লান্তির ছায়া যেন নিজের ওপর পরল এমনটা মনে হচ্ছিল।

কীভাবে যাবেন : নৌপথ, সড়কপথ, রেলপথ তিনিটি মাধ্যমেই চাঁদপুর আসা যায়। চাঁদপুর জেলা সদরের ১২নং চান্দ্র ইউনিয়নের হরিপুর গ্রামে, হরিপুর জমিদার বাড়িটির অবস্থান। যে কেউ চাঁদপুর শহরে এসে সিএনজিযোগে চলে যেতে পারেন হরিপুর জমিদার বাড়িতে। ভাড়া পরবে লঞ্চযোগে ঢাকার সদর ঘাট থেকে চাঁদপুর আসতে জনপ্রতি ১০০ টাকা ডেকে করে। এছাড়া প্রথম শ্রেণী লঞ্চ ভেদে ২৫০ থেকে ৩০০। কেবিন সিঙ্গেল ৪০০, এসি ৫০০- ডাবল কেবিন ৮০০, এসি ৯০০। সেখান থেকে সিএনজি ভাড়া করার ব্যবস্থা রয়েছে। চৌধুরী বাড়িতে যেতে খরচ পড়বে পরবে ১৫০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে।