১৬ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লালন স্মৃতিভূমে

  • শংকর লাল দাশ

আকাশ কালো করা জ্যৈষ্ঠের দিন। সকাল থেকে বৃষ্টি। কখনও ইলশে গুড়ি আবার কখনও ভারি। কখনওবা পিঠ পোড়ানো রোদ। এরই মধ্যে ছুট। সকাল থেকেই প্রস্তুতি। ঘরে মাধুরীর হালকা অনুযোগ না গেলেই কি নয়! বেলা ২টায় যখন পটুয়াখালীর রামনাবাদ নদীর পশ্চিম পাড় থেকে মাইক্রোতে চড়ে বসি। তখনও আকাশ থেকে ঝরছে দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি। সঙ্গী পাঁচ জন। সবাই সংবাদকর্মী। ইত্তেফাক প্রতিনিধি সীমিত কুমার দত্ত মলয়, সংবাদের মুশফিকুর রহমান রিচার্ড, সমকালের মোঃ কাওসার ও আজকের অর্থনীতির মাসুদুর রহমান মাসুদ। সঙ্গে সুহৃদ সরকারী কর্মকর্তা তপন কুমার ঘোষ। বাদুরা বাজার পর্যন্ত ভাঙ্গাচোড়া এবরো থেবরো সতেরো কিলোমিটার সড়ক পাড়ি দিতেই এক ঘণ্টা। ঝাঁকুনিতে মেজাজ বিগরে যায়! শাঁখারিয়ার মোড় পেরুতেই কুয়াকাটা-বরিশালের মসৃণ সড়ক। দুটো ফেরিসহ ষাট কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে যখন বরিশাল পৌঁছি ঘড়িতে তখন বিকেল সাড়ে পাঁচটা। হালকা নাস্তা সেরে আবার লম্বা ছুট। এবার লক্ষ্য ফরিদপুর। পথে মাদারীপুর জেলার টেকেরহাট নেমে রাস্তার পাশের খোলা চায়ের দোকানে কিছুক্ষণের আড্ডা। সঙ্গে রুটি আর ডিম ভাজা। কাওসারের পেটে যেন রাক্ষুসে ক্ষুধা। গরুর মাংস তার চাই। রুটির সঙ্গে গরুর মাংসের ভূরিভোজ। কাওসারের পেটের দিকে তাকিয়ে সবাই একচোট হেসে ওঠে।

রাত ৮টায় ফরিদপুর ছাড়িয়ে এবার রাজবাড়ির পথে। রাত ৯টার দিকে রাজবাড়ির মোড়ে পৌঁছতেই সবাইকে চায়ের নেশায় পেয়ে বসে। কিন্তু থামার উপায় নেই। পথ অনেক পড়ে আছে। কুষ্টিয়া অনেক দূর। অনেক পথ। ড্রাইভার ইমরান একটু আমতা আমতা করেন। নিজেরাও বুঝতে পারি। তাই চায়ের নেশা শিকেয় তুলে ছুটে চলি সামনে।

দুটো কাঁটা যখন ঠিক ঘড়ির মধ্যখানটায় অর্থাৎ রাত বারোটা। তখন আমাদের মাইক্রো কুষ্টিয়া জেলা সদরের রেললাইন অতিক্রম করে। আগে কখনও কুষ্টিয়ায় যাইনি। কিছুই চিনি না। সময়ের ব্যস্ততায় এখানকার হোটেল সম্পর্কে তেমন খোঁজখবর নেয়া হয়নি। দু’পাশের বাড়িঘরের আলো এসে পড়ে রাস্তায়। সে আলোয় রাস্তার পাশে একজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে গাড়ি থামিয়ে হোটেলের কথা জিজ্ঞেস করতেই দেখিয়ে দিলেন চারতলা একটি ভবন। হোটেল পদ্মা। কুষ্টিয়া শহরের বড় বাজারের চওড়া সড়ক ঘেঁষে দাঁড়ানো হোটেল পদ্মাকে দুর থেকে দেখে বেশ ভালোই মনে হলো। দোতলায় কাউন্টারে দাঁড়িয়ে চাহিদার কথা জানাতেই ম্যানেজার একটু অপেক্ষা করার কথা বলে ভেতরে গেলেন। ফিরলেন বেশ খানিকক্ষণ পরে। তিনটি রূমের চাবি এগিয়ে দিলেন। মাঝখানে মাইক্রো ড্রাইভার ইমরানকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিলাম আমরা প্রায় চার শ কিলোমিটার পথ পেছনে ফেলে এসেছি।

একটানা দীর্ঘ পথ ছুটে চলায় ক্লান্তি এসে ভর করে। খুব তাড়াতাড়ি গোসল সেরে একপেট খেয়ে লম্বা ঘুমের চিন্তায় রুমে ঢুকেই চক্ষু চড়কে ওঠে। অপ্রশস্ত কক্ষ। ছোট খাট। হাত-পা মেলে ধরারও উপায় নেই। বিছানার অবস্থাও তথৈবচ। মুহূর্তেই মন খারাপ। মলয় বলে ওঠে, দাদা-এ নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই। এখন অনেক রাত। এ মূহুর্তে কিছু করার নেই। রাতটা কোনরকমে কাটিয়ে কাল সকালে অন্য হোটেলের খোঁজ নেব। চলেন তার চেয়ে গোসলটা সেরে নেই।

কিন্তু একি! জামা-কাপড় পাল্টে বাথরূমে ঢুকেই আরেক প্রস্থ অবাক হওয়ার পালা। ঝরনা থেকে পানি পড়েনা। । নিরূপায় হয়ে রিচার্ডের বাথররূম ঢুকে পড়ি। না, এটির অবস্থাও তেমন ভাল না। বালতি দিয়ে কোনমতে গোসলটা সেরে সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি রাস্তায়।

সবুজ গাছের পাতার ঝিরিঝিরি বাতাস আর আকাশে চাঁদের স্নিগ্ধ আলো মুহূর্তেই মন ভাল করে দেয়। ইচ্ছে করে একটু হাঁটাহাঁটি করি। কিন্তু পেটের ক্ষুধার কাছে চাঁদের আলো সুকান্তের ভাষায় ‘রুটি’ হয়ে ধরা দেয়। কোথায় খাবারের ভাল হোটেল মিলবে এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে বড় বাজারের মোড়ের দিকে এগোই। দেখা ইজিবাইকের এক ড্রাইভারের সঙ্গে। জানালেন-‘সামনেই মদনপুর চৌরাস্তা। ওখানে হোটেল জাহাঙ্গীর খুব ভাল হোটেল। ইচ্ছে করলে হেঁটে যেতে পারেন। মিনিট পনেরো লাগবে। আমার গাড়িতেও যেতে পারেন। জনপ্রতি ভাড়া তিন টাকা।’

রাত দুপুরে কুষ্টিয়া শহরে অবাক হওয়ার মতো অভিজ্ঞতা। দেশের কোথাও জনপ্রতি তিন টাকা ভাড়া চালু আছে এটা আমাদের সকলকেই অবাক করে। যেখানে রিক্সাচালকরাও দশ টাকার কমে কাউকে তোলে না। সেখানে ভাড়া মাত্র তিন টাকা। বর্তমান অগ্নিমূল্যের বাজারে এটি ভাবতে পারি না। মলয়ের টানাটানিতে আর হাটা হয় না। সবাই চড়ে বসি ইজিবাইকে। পাঁচ-সাত মিনিটে পৌঁছে যাই হোটেল জাহাঙ্গীরে। বেশ বড় হোটেল। খাবার সার্ভ করতে আসা বয় জানাল হোটেলটি দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা খোলা থাকে। এখান থেকে সারাদেশে গাড়ি চলাচল করে। দিনরাত প্রচুর মানুষ আনাগোনা করে। এ সুবাদে হোটেলটি খোলা রাখা হয়।

কোনমতে কিছু খেয়ে দেয়ে আবার একই গাড়িতে ফিরে আসি হোটেলে। হোটেলের চৌকিতে চিৎপটাং হতেই আক্কেল গুরুম। প্রচন্ড গরম। ঝাঁকে ঝাঁকে মশা। তারওপরে মিনিটে মিনিটে বিদ্যুতের ভেলকি। মাথার ওপরে ফ্যান না চলতেই বন্ধ হয়ে পড়ে। গরমে সবাই হাঁসফাঁস করে উঠি। রুমে থাকাটাই অসহ্য হয়। মলয়, কাওসার, রিচার্ড, মাসুদ বসে পড়ে তাস নিয়ে। আর আমি টিমটিমে আলোয় বইয়ের পাতায় খুঁজে ফিরি কুষ্টিয়ার ইতিহাস।

খুব প্রাচীন জনপদ কুষ্টিয়া। সম্রাট শাহজাহানের আমলে গড়াই নদীর দক্ষিণ তীরে নদীবন্দর হিসেবে গড়ে ওঠে কুষ্টিয়া। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শহরটিকে নীলকরদের কাজে ব্যবহার করেছিল। অবিভক্ত বাংলায় কুষ্টিয়া ছিল নদীয়া জেলার আওতাধীন একটি অঞ্চল। ১৭৭২ সালে ব্রিটিশরা কুষ্টিয়াকে নিয়ে প্রথম নদীয়া জেলা সৃষ্টি করে। কুষ্টিয়া সদর, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা মহকুমা নিয়ে ১৯৪৭ সালে কুষ্টিয়া আলাদা জেলা হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা পৃথক জেলার মর্যাদা লাভ করে। শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে কুষ্টিয়া অনেক এগিয়ে। এখানে যেমন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দীর্ঘকাল অবস্থান করেছেন। তেমনি লালন, মীর মোশাররফ, জলধর সেন, সুরেন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য, কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের মতো অনেক মহাত্মাও জন্ম নিয়েছেন। অর্থনীতিতেও কুষ্টিয়া বরাবরই এগিয়ে। ১৯১৯ সালে এখানে মোহিনী মিল প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আগে পড়ে এখানে আরও অসংখ্য শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৮৬০ সালে কুষ্টিয়ার সঙ্গে সরাসরি কলকাতার রেল যোগাযোগ স্থাপিত হয়।

আগে থেকেই জানি কুষ্টিয়ায় দেখার মতো অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং নিদর্শন রয়েছে। কিন্তু এর কতগুলো দেখার সুযোগ হবে এনিয়ে প্রথম থেকেই একটু দ্বিধায় ছিলাম। যাহোক, খুব সকালে মলয় আর কাওসারের ডাকাডাকিতে উঠে পড়ি বিছানা ছেড়ে। হাত-মুখ ধুয়ে বেরিয়ে পড়ি রাস্তায়। ঘোষের রেস্তরাঁয় নাস্তার টেবিলে আলাপ স্থানীয় এক ভদ্রলোকের সঙ্গে। তিনিই দেখিয়ে দিলেন থাকার জন্য মোটামুটি ভদ্র মানের হোটেল প্রীতম।

গড়াই পাড়ের পাঁচতলা হোটেলটি দেখে সবার পছন্দ হয়। দ্রুত রূমের বুকিং দিয়ে আগের হোটেল ফিরি বাক্স পেটরা নিতে। সাগর পাড়ের মানুষ আমরা। গড়াই দেখে নদী বলে ভাবতে মন সায় দেয় না। তবুও শান্ত এই নদীর পাড়ের হোটেলের রুমগুলো আমাদের বেশ মনে ধরে। ম্যানেজারের কাউন্টারের সামনে ডান প্যাসেজের মাথায় দু’পাশে দুটি রুম। অনেক খোলামেলা। পানির কষ্ট নেই। হোটেলের নিজস্ব জেনারেটর। নেই বিদ্যুতের ভাবনা। সময় নিয়ে তাই গোসলপর্বটা সেরে ফেলি।