২১ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিমল করের ‘সুধাময়’

  • খুরশীদ আলম বাবু

বাংলা কথাসাহিত্যে বিমল কর এক বহুল আলোচিত ব্যক্তিত্ব। চল্লিশের শেষাশেষিতে তাঁর উত্থান ঘটলেও আসলে পঞ্চাশ দশকেই মোটামুটিভাবে প্রতিশ্রুতিশীল গল্পকার হিসেবে সমালোচকদের কাছ থেকে সমীহও স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছিলেন। আর এই দশকেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন তরুণ গল্পকারদের পরীক্ষিত দিশারী, ছোটগল্প- নতুন রীতি আন্দোলনের তাত্ত্বিক অভিভাবক হিসেবে সম্পাদনা করেছিলেন বহুল আলোচিত গল্পসংকলন। নতুন চেতনা প্রবাহের গল্পমালার উদগাতা হিসেবে সেই সময় সাহিত্য জগতে যে আলোড়ন উঠেছিল, তার উচ্ছ্বাস এখনো বাংলা কথাসাহিত্যের জগতে মিলিয়ে যায়নি। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে বারবার খেয়াল করে দেখা গেছে এই আন্দোলন এখন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকারদের একটি প্রিয় বিষয়। পঞ্চাশের দশকে তার এই আন্দোলন দুটি কারণে বিখ্যাত হয়ে আছে, প্রথমত: পূর্বজ অগ্রজ লেখকদের ঘটনা প্রধান কিংবা চরিত্র প্রধানের রীতি অগ্রাহ্য করে গল্পের ভেতরদেশে প্রবেশ করলেন আন্তবাস্তবতার রহস্যময় বেদনাময় পর্ব এবং তাঁর গল্পের নায়ক-নায়িকারা স্বাভাবিক আট দশটা বাঙালী মহিলাদের মত ব্যথা-বেদনার পথিক নন, আর পাশাপশি গল্পের নায়করা মনের মধ্যে ডুব দিয়ে তন্নতন্ন করে অনুসন্ধান চালাতে থাকে বেঁচে থাকা জীবনের আত্ম বিশ্লেষণে। এই কারণে তাঁর গল্পের বারবার অপরিহার্যভাবে উঠে আসে মৃত্যুর মতো অসামান্য রহস্যময় শক্তিশালী বস্তু। যার সামনে আমরা সবাই অসহায়। মৃত্যু তাঁর প্রায় গল্পে একটা বিরাট ভূমিকা না রেখে পারে না। আর একথা কেনা জানে মৃত্যু চেতনা একজন লেখকের সৃজনশীলতাকে অখ- সত্যের দিকে নিয়ে যায়। বলা বাহুল্য : শিল্পের মাহাত্মকে করে গভীর ও সৌন্দর্যম-িত। আর সেই কারণে তার গল্পের মধ্যে মধ্যে অযথা তথাকথিত বাস্তবতা খুঁজতে গেলে ব্যর্থ হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর তাঁর গল্পের সর্বাঙ্গে জড়িয়ে থাকে এক ধরনের বিষণœতাবোধ, যে বিষণœতাবোধ অবশ্য অকারণ নয়। এর নায়ক নায়িকারা সামাজিক পরিবেশে এক ধরনের ব্যর্থ মানুষ। সামাজিক পরিবেশের মধ্যে ব্যর্থ হয়ে কিংবা তাল মেলাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে শেষাবধি মৃত্যুকেই বেছে নেই। তাঁর প্রথম বহুল আলোচিত গল্প ‘আত্মজা’ গল্পে দেখা যায়, পিতা মেয়ের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কাছাকাছি আসে, তাদের সম্পর্ক গাঢ় থেকে গাঢ়তর হতে থাকে। আর সেটাকে স্ত্রী যুথিকা সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। ফলশ্রুতিতে স্বামী হিমাংসু অর্থাৎ পুতুলের পিতা শেষাবধি আত্মহত্যা করে বসেন। বিমল কর তাঁর সাহিত্য জীবনের শুরুতে তাঁর অগ্রজ কথাসাহিত্যিক সুবোধ ঘোষের একান্ত অনুসারী ছিলেন। অবশ্য তার সমসাময়িক আরেক তরুণ কথাসাহিত্যিক সন্তোষ ঘোষ মনে করতেন বিমল কর সুবোধ ঘোষ ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাঝামাঝি পর্যায়ে অবস্থান করছেন; পরে বিমল তাঁর এক লেখায় স্বয়ং স্বীকার করেছেন যে, তিনি এই দুই অমর গুণী শিল্পীর কোন কিছুই অনুসরণ করতে পারেননি। আসলে বিমল কর-এর কোন গল্পই করুণ সরল রেখায় পূর্ণ বলয়িত হয়নি। গল্পে তার ঘটনা কোন সময় সামান্য থাকলেও চিন্তাবোধ গল্পের ঘটনাকে করে তোলে অসামান্য। আর এখানেই বিমল করের উপার্জিত হয়েছে সাফল্যের স্বাতন্ত্র্যময়তা। বলা বাহুল্য তিনি আমাদের কালের শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পীদের একজন।

বিমল কর তার প্রথম প্রকাশিত গল্পের নাম মনে রাখতে না পারলেও দ্বিতীয় গল্প ‘অম্বিকানাথেন মুক্তি’ ১৯৪৪ সালে ‘প্রবর্তক’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল এটা তাঁর মনে রাখার কথা বলেছেন ।

শোনা যাক সেই ঘটনার বিবরণ স্বয়ং গল্পকার বিমল করের একটি স্মৃতিচারণমূলক লেখা থেকে :Ñ

‘আমার দ্বিতীয় গল্পটির কথা মনে আছে, নাম ‘অম্বিকানাথের মুক্তি’ ১৯৪৪ সালে নাগাদ ছাপা হয়েছিল। সেই সংখ্যায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসের কিস্তি ছিলো বোধ হয়। (সূত্র : আমার লেখা : বিমলরের গল্প সংগ্রহ; প্রথম প্রকাশ-মহালয়া-১৩৮৭, পৃ. ১৯)”

উল্লেখ্য, এই সময় বিমল কর আসানসোলে এ্যামুনেশন প্রোডাশন ডিপার্টমেন্টে চাকরি করতেন। এর পরেও বিমল করের বেশ কয়েকটি গল্প ‘দেশ’সহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এগুলোর মধ্যে ‘ইদুর; ‘বরফ সাহেবের মেয়ে’ গল্পের নাম উল্লেখযোগ্য। ‘বরফ সাহেবের মেয়ে’ প্রথম প্রকাশিত হয় দেশ পত্রিকায়। কিন্তু বিমল কর আলোচিত হলেন ‘আত্মজা’ গল্পের জন্য। বিমল কর সেই অনুভূতি জানাচ্ছেন এই ভাবে :Ñ

‘আত্মজা’ গল্পটি সেই সময় কিছু তর্ক-বিতর্কের অবতারণা করেছিল, খ্যাতি ও অখ্যাতি দুইই দিয়েছিল লেখককে, তবু বোধ হয় ওই লেখাটি আমায় সে সময় বিশেষভাবে চিহ্নিহ্নত করেছিল। (সূত্র : আমার লেখা : বিমলরের গল্প সংগ্রহ; প্রথম প্রকাশ-মহালয়া-১৩৮৭, পৃ.২০)’

বিমল করে জন্ম কলকাতায় নয়; আসানসোলে। এই জন্য তার গল্পে কলকাতার উপস্থিতি খুব কম এসেছে। কলেজ জীবন পৌঁছাবার আগ পর্যন্ত তাঁর কিশোরবেলা কেটেছে আসানসোলে, কালিপাহাড়ি, বরাকর ও কুলটি অঞ্চলে। পড়াশোনার জন্য চলে আসেন কলকাতায়। বিমল কর লেখক হবেন এই রকম বাসনা তার প্রথম জীবনে ছিল না। তবে খুব ভালো পাঠক ছিলেন। তার বিশাল পড়ালেখা ছিল সমকালীন দেশী-বিদেশীদের গল্প উপন্যাস। বলতে গেলে নাক ডুবিয়ে এই সমস্ত উপন্যাস পাঠে বিমল কর নিজেও বেশি উপকৃত হয়েছেন। আর তরুণরাই ছিল তার সার্বক্ষণিক বন্ধু। তবে এর পর নানা জায়গায় জীবিকার পথে পাড়ি দিয়ে বিখ্যাত দেশ পত্রিকার সহ-সম্পাদক হিসেবে চাকরির সুবাদে ‘দেশ’, ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকায় আমৃত্যু নিয়মিতভাবে গল্প উপন্যাস লিখে গেছেন।

তবে সাম্প্রতিককালে তার অনুজ লেখক সমরেশ মজুমদার লিখেছেন-

‘একথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই, ছোট গল্পে বিমল কর যে শীর্ষ বিন্দুতে পৌঁছেছিলেন- উপন্যাসে সেটা সম্ভব হয়নি। তার হাতে ছোট গল্প বিশেষ মাত্রা পেয়েছে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। চুপচাপ বয়ে যাওয়া নদীর নীচে পাথরের ঠোকাঠুকির যে সব শব্দ শোনা যায় তার গল্পে।’ (কথা কইতে বাধে : সমরেশ মজুমদার)

একেবারে নির্ভার নিরপেক্ষ ও নির্মোহ মন্তব্য। একজন সৃজনশীল লেখকের ওপর অপর একজন সৃজনশীল লেখকের এই মতামতের কোন তুলনা হয় না। আজকের সাহিত্য এই রকম খুব কমই পাওয়া যায়। বলে রাখা ভালো আমি আশৈশব বিমল করের অনুরাগী পাঠক। আমার কাছে তার এক একটি গল্প মানেই একটি মনোবাস্তবতার রহস্যময় অপার জগত। প্রকৃতি ও সংবেদনশীল ভাষা ও মানব মনের নিখুঁত সংবেদনশীল আচরণ এত সুন্দরভাবে তাঁর গল্পে তাতে প্রমাণ করে তিনি একজন প্রকৃত গল্প-শিল্পী। আমাদের একজন সমসাময়িক গল্পকার মঈন শেখ বিমল করের একজন দারুণ ভক্ত; বিমল করের প্রসঙ্গ উঠলেই বলেন, ‘বিমল কর হয়তো কোন দুর্বল লিখতে পারেন- কিন্তু কোন সময় বাজে গল্প লেখেননি।’ আজ ক্যানো জানি এই প্রবন্ধ লিখতে গিয়েই সেই স্বচ্ছ মন্তব্যটি অকারণে বারবার মনে পড়ছে। আমি আলোচনার জন্য শেষমেষ ‘সুধাময়’ গল্পটি বেছে নিলাম। ক্যানো বেছে নিলাম তার কারণ হলো এই গল্পটির মধ্যে দিয়ে তিনি সর্ব প্রথম সৃষ্টিশীলতার স্বাতন্ত্র্যময় জগত খুঁজে পান। বিমল করের এর আগের গল্পগুলোতে স্পষ্টতঃ সুবোধ ঘোষ কিংবা প্রেমেন্দ্র মিত্র শুধু নয় তার আরেকজন প্রিয় গল্পকার জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর প্রভাবিত ছিলেন। অথবা এই সমস্ত পূর্বজ গল্পকাররা তাদের গল্পমালা দিয়ে বিমল করকে এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করছিলেন। কিন্তু ‘সুধাময়’ গল্পে বিমল কর যেন আপন খোলস খুলে বেরিয়ে এলেন। গল্পকার বিমল কর এই গল্পটিকে যতটা গুরুত্ব দিয়েছেন, তাঁর আগের গল্পমালাকে তেমন গুরুত্ব দেবার পক্ষপাতী নয়। আমরা আবার এও ভুলে না যায়- এই গল্প সৃজনের আগে বিমল কর ‘আংগুর লতা’র মতো পিলে চমকানো ও প্রতিনিধি স্থানীয় গল্প লিখেছেন। নানাভাবেও আলোচিত হয়েছেন। বিমল কর তার আত্মজীবনী ‘উড়ো খই’ এ জানাচ্ছেন-

‘আর ‘দেশ’ পত্রিকায় শারদীয়া সংখ্যায় যে গল্পটা লিখেছিলাম তার নাম ‘সুধাময়’। যতই সময় লাগুক পরিশ্রম করতে হোক, যতই নাভার্স হয়ে পড়তে থাকি লিখতে লিখতে তবু জানি এই গল্পটিই আমার নিজস্বতা আর মানসিকতাকে প্রথমবারের মতো ধরতে পেরেছিলোম। বলা যেতে পারে ওখানেই আমার শুরু। নিজস্ব মনোভঙ্গি বলে কিছু থাকে তবে সেই মনোভঙ্গি আমার। সেটা ভালো হোক, আর মন্দ হোক- কিছু যায় আসে না। (সূত্র : উড়ো খই-২য় খ- : বিমল কর)’

আমরা বিমল করের এই বক্তব্যকেই কেবলই সমর্থন করি না; উপরন্তু আমরা এই সূত্রে আরও একটি সূত্র যোগ করতে চাই। সেটি হলো এই যে, বিমল করের পরবর্তী প্রায় গল্পমালায় ‘সুধাময়’ গল্পের বৈশিষ্ট্য ব্যবহার হয়েছে।

অনুজ গল্পকার সমরেশ মজুমদার মনে করতেন প্রতিভা না থাকলে কেবল মাত্র ঘরে বসে ক্রমাগত গল্প উপন্যাস লিখতে পারতেন না।

সেই দিক থেকে ‘সুধাময়’ বিমল করের একটি প্রতিনিধিত্ব স্থানীয় গল্প তা এক-বাক্যে বলাই যায়। পরবর্তীতে প্রকাশিত প্রতিনিধিত্বশীল গল্পগ্রন্থতে এই ‘সুধাময়’ গল্পটি ঠাই করে নিয়েছে।

‘সুধাময়’ গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ‘দেশ’ শারদীয়া ১৯৫৭ সালে। পরে এই গল্পটি বিমল কর গ্রন্থিত করে তার বাছাই গল্পে, যার সর্বশেষ সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল বাংলা ১৩৯৩ সালে। আলোচনার জন্য আমি সেই বাছাই গল্পসংকলনটি ব্যবহার করেছি।

এই গল্পের মূল নায়ক হলো সুধাময়। সেটা গল্পের নামকরণ থেকেই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। সুধাময় এক অভিজাত হিন্দু পরিবারের সন্তান। বড় হওয়ার সঙ্গে তার আত্ম উপলব্ধির পরিধি বেড়ে যেতে থাকে। অবশ্য সুধাময় এটা পেয়েছিল তার শ্রদ্ধেয় পিতার কাছ থেকে। অনেকটা উত্তরাধিকার সূত্রে। ফলশ্রুতিতে দেখা গ্যালো সুধাময়ের অনীহা জন্মাচ্ছে প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতির ব্যাপারে। সুধাময়-এর লেখাপড়া ব্যাপারে তার পিতামাতার মধ্যেও বিরোধ দেখা দিচ্ছে। কারণ সুধাময়ের মায়ের ইচ্ছে ছিল সুধাময় লেখাপড়া শিখে সরকারের বড় কর্মকর্তা হোক।

তার পিতা অবশ্য মনে করতেন সুধাময় ইচ্ছামত বড় হোক। এরই মধ্যে সুধাময়ের পিতা হঠাৎ করে মারা গেলে সুধাময়ের নিজের অস্তিত্বের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। কারণ সুধাময় মনে করতো এই রকম হওয়ার কোন কারণ ছিল না। তবে পিতার মৃত্যু তাকে বুঝিয়ে দ্যায়, ‘আমরা যে জগতে বসবাস করি সে জগতে অনিত্যের এক নিষ্ঠুর নিয়ম আছে।’

এতে সুধাময় আবার মৃত্যুভয় জনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। স্বামীর মৃত্যুর পর সুধাময়ের মাতা যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত মারা হয়ে যায়। মায়ের মৃত্যু সুধাময়কে আরও দুর্বল করে ছাড়ে। এরপর সুধাময়ের আর বাড়ি থাকা চলে না। সে কলকাতার উদ্দেশে রওনা হয়। এখানে রাজেশ্বরী বলে সুন্দরী এক মহিলার সঙ্গে আলাপ; ক্রমশ ঘনিষ্ঠতায় রূপান্তরিত হয়। কিন্তু এই ভালোবাসা সুধাময়ের দার্শনিক মনকে তৃপ্ত করে না। কারণ তার মনে হতে থাকে সে রাজেশ্বরীকে ভোগ করবার বন্যপ্রকৃতি জেগে ওঠে। কিন্তু সুধাময় কোন রকমে নিয়ন্ত্রণ করলেও; রাজেশ্বরীর সঙ্গে তার ভালোবাসার পর্ব শেষ হয়। তবে সুধাময়ের মনে আবার সন্দেহ এবং দ্বন্দ্ব দেখা দিল, সে দ্বন্দ্ব আর সহজে নিরসন হলো না।

আবার সুধাময় দুই বছর বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ালো। পরে মিহিরপুর টিবি স্যানোটারিয়াম- এ যোগ দেয়। উদ্দেশ্য ছিল অসহায় মানুষদের সেবা শুশ্রƒষা করা। সেখানে তার সঙ্গে শীর্ণকায় এক মহিলার সঙ্গে আলাপ হয়, সেই আলাপও তাকে ভালোবাসার দিকে নিয়ে যায়। হৈমন্তি ছিল যক্ষ্মার রোগী, স্যানোরাটেরিয়ামের চিকিৎসায় ভালো হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলেও সুধাময়কে দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে হৈমন্তি মারা যায়।

এই ঘটনার পর সুধাময় আর মিহিরপুর টিবি স্যানারোটিয়ামে থাকেনি। আবার চিরাচরিত সুধাময় ভবঘুরে হয়ে যায়। মোটামুটি এই হলো বিমল করের ‘সুধাময়’ গল্পের সারাৎসার।

সাম্প্রতিক কালের একজন সমালোচক (অসিৎ ভট্টাচার্য) তাঁর এক লেখায় আমাদের জানিয়েছেন যে, সুধাময় গল্পটি একার্থে একটি আত্মজৈবনিক-মূলক রচনা। আমরা সেই মতামতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ না করেও বলতে পারি- গল্প রচনার সময় লেখকের নিজের জীবন সংকট প্রভাবিত করতে পারে তাও অস্বীকার করতে পারি না। আমাদের করা ঠিক হবে না। সুধাময় গল্পটি এমন এক সময় লেখা হচ্ছে যখন স্বয়ং গল্পকার তাঁর (বিমল কর) সাহিত্যিক জীবন সম্পর্কে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েছেন। এক সময় গল্পকার বিমল করের মনে হয়েছিল তার লেখার পুঁজি ও বিষয়বস্তু ক্রমশ শেষ হয়ে আসছে। আর গল্পকার হিসেবে অন্যদের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসারও চেষ্টা করছেন। বলা বাহুল্য এই গল্পের সঙ্গে বিমল করের এক জীবন মরণ সংগ্রাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে।

সে দিক থেকে বিবেচনা করলে এই গল্প বাংলা সাহিত্যে এক তুলনা রহিত উদাহরণ। এই রকম মনোবিশ্লেষণধর্মী গল্প তাঁর পরে আর কোন কথাশিল্পী লিখতে পারবে কিনা সন্দেহ থেকে যায়। আগেই উল্লেখ করেছি, এই গল্পের ভেতর দেশে কিছুটা হলেও গল্পকারের আত্মজীবনীর উপাদান রয়েছে। যেভাবে পাওয়া যাবে মার্কিন নোবেল লরিয়েট আর্নেস্ট হামিংওয়ের গল্পমালায়। তবে তুলনা কেবলই তুলনা। এই গল্পের প্রধান চরিত্র সুধাময়। তার জীবন কাহিনী জীবন-যন্ত্রণা ও দর্শন কেন্দ্রিক ভাবনার বিন্যাসকে গল্পকার বিমল কর বেশি প্রাধান্য দেবেন সেটিই স্বাভাবিক।

তবে সেই দার্শনিক ভাবনা-চিন্তা অনেক সময় এককেন্দ্রিক মনে হলেও, গল্পের ভাষার গুনে সেটা আমাদের খারাপ লাগে না। আসলে এটাকে প্রেমের স্বপ্ন ভঙ্গের গল্প বললে বেশি বলা হবে না। কারণ গল্পের শুরুতে আমরা দেখতে পাচ্ছি, লেখক বন্ধু পরিমলকে চিঠিতে জনাচ্ছেন- সে একটা প্রেমের গল্প লিখেছে বটে, কিন্তু প্রেম কি বলে আসলে জানে না। গল্পের অন্যান্য চরিত্রের মধ্যে সুধাময়ের পিতার চেয়ে মাতার চরিত্র অনেক বেশি উজ্জ্বল হলেও অনেক পাঠকের মনে ভীতির সঞ্চার করে। আর এখানেই আমাদের আপত্তি, কারণ তাহলে কি আমাদের ধরে নিতে হবে জীবনের সবকিছুই অন্ধকারে পরিপূর্ণ। আসলে তাই নয়, এই গল্পটি পড়তে পড়তে আমাদের মনে হয়েছে গল্পকার বিমল কর নিজেই গল্পের কোন কোন জায়গায় বেশি উত্তেজিত, তার হৃদয়ের সংশয়ের ছায়া পাঠকের মনে ছড়িয়ে দিতে চান। বিশেষ করে রাজেশ্বরীর বর্ণনায়, যেমন-

“রাজেশ্বরী যেন অগ্নিশখা। রূপের এত দীপ্তি সুধাময় আগে দেখেনি। ওর মা সুন্দরী ছিলেন- অসাধারণ সুন্দরী- তাঁর রূপ ফেটে পড়তো, কিন্তু রাজেশ্বরীর রূপ নিশ্চল হয়ে আছে। মনে হয় কোন, কি যেন এক সৌন্দর্য ওর শরীরের মধ্যে জ্বলছে, ভীষণ উজ্জ্বল। স্ফুলিঙ্গের মতন দীপ্ত, দাহ্য। চোখ আছন্ন হয়ে আসে- ওর দিকে তাকালে। বোধের ¯œায়ুগুলো ঘোলাটে হয়ে যায়।’

সত্যি বলতে এই বর্ণনা অনেকটা কবির মতন। যেন সুবোধ ঘোষ আবার নতুন করে অবিভূত হচ্ছে বিমল করের গল্পমালায়। বাংলা আর অন্য কোন গল্পে নারীর রূপের এমন রাজকীয় ভাষা আছে বলে আমার জানা নেই।

তবে গল্পের অন্যান্য চরিত্রাবলীর মধ্যে সুধাময়ের পিতার চরিত্রটা অনেকটা বাস্তবধর্মী বলে মনে হয়। গল্পকার ভারি মনোহর করে পিতাকে এঁকেছেন। অনেকটা দার্শনিকের মতন। তবে তার একথার মধ্যে কৌতুকও আছে, যা পড়লে আমাদের মনে ভাবনার সঞ্চার করে দ্রুত। যেমন-

‘শোন সুবর্ণ-! আপনার বাবা ডাকলেন পিসিকে, হাত দিয়ে জ্যোৎ¯œা আকুল-নদী চর আকাশ দেখিয়ে দিয়ে বললেন, এই কোথাও থেকে ও এসেছে কিনা- তাই বড় লেগেছে। অত কান্না? ভাবছে বুঝি কত আনন্দ এতে সুধা থেকে কেউ তাকে কেড়ে নিয়ে এসেছে। বড় হলে বুঝতে পারবে এসবের সঙ্গেই সে আছে। এখন আর কাঁদবে না।’

তবে এই গল্পের সবচেয়ে ট্র্যাজিক চরিত্র হলো হৈমন্তী। এই হৈমন্তী যেন রবীন্দ্রনাথের ‘হৈমন্তী’ গল্পের আরেক রূপ। আমার ক্যানো জানি মনে হয় এই হৈমন্তীকেই সুধাময় সত্যিকারভাবে ভালোবেসেছিল।

হৈমন্তী যক্ষ্মারোগী। সে ভালো হলে আর দশটা বাঙালী রমণীর মতন সুধাময়ের সঙ্গে ঘর সংসারে মগ্ন হতেন। কিন্তু এক অতি আধুনিক গল্পকার বলেই বিমল কর হৈমন্তীকে মৃত্যুর সীমানায় ঠেলে দিয়েছেন। কারণ সুধাময় তার লেখক বন্ধু পরিমলকে জানাচ্ছেন-

‘আমার আনন্দ শতখান হয়ে ভেঙে পড়লো। পরিমল আমি বৃথায় বলেছিলাম, আর আমার সংশয় নেই- বিরাট সংশয় আমাকে কাটার মতন বিধছে।’

বলাবাহুল্য সুধাময়ের বেদনা, পাঠকের অন্তর চেতনাকে দীপ্র আঘাত করে বসে। আর এটা তো স্মরণীয় বিমল কর তার পরবর্তী সমস্ত গল্পমালায় এই সুধাময় গল্পের প্রভাব পড়তে আরম্ভ করল। সমালোচক উজ্জ্বল মজুমদার লিখেছেন-

’শেষ পর্যন্ত সুধাময় গল্পের নায়কের আত্ম-অন্বেষণের ভঙ্গিটি কিন্তু বিমল করের অনেক উপন্যাসের নায়ক নায়িকার মতন। মৃত্যু কিংবা বিচ্ছেদ পেরিয়ে মানুষ কোথায় কিভাবে পৌঁছবে সেই সমস্যার সমাধানে সুধাময়ের শুরু হলো নিরুদ্দেশ যাত্রা। এখন থেকে মৃত্যুই বড় হানা দিচ্ছে জীবনের পরীক্ষায়’ (বিমল কর-উজ্জ্বল কুমার মজুমদার, দেশ পত্রিকা)

এই প্রজ্ঞাবান সমালোচকের মতামতের সঙ্গে আমাদের কেবল দ্বিমত নেই, কারণ পরবর্তী গল্পমালাই তার প্রমাণ; যেমন- ‘সোপান,’ ‘আমরা তিন প্রেমিক ও ভুবন’ ইত্যাদি গল্পের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।

বাংলা কথাসাহিত্যে বিশেষ করে কয়েকজন গল্পকার আছেন, যাদের গল্পের বিষয়বস্তুর চেয়ে গল্পের ভাষা ও বর্ণনা ভঙ্গি নিয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে। বিমল কর তাঁদের মধ্যে বোধকরি অন্যতম। বিমল কর অত্যন্ত সংবেদনশীল কথাশিল্পী বলেই তাঁর গল্পের ভাষা অত্যন্ত চিন্তাশীল। যদিও এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন- রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্রাবলী’ তার ভাষাকে প্রভাবিত করেছে। বিমল করের এই মন্তব্য আমরা সাদরে গ্রহণ করতে পারি। পাঠক মিলিয়ে নিন-

‘আপনাদের দেশের বাড়ির গাঁ ছুয়ে নদী বয়ে গিয়েছিল। এ পাশে তিন মহলা বাড়ি, ওপাশে ধুধুকর আর সবুজ গাছপালা। কোজাগরী পূর্ণিমার রাত্রে সেই ফিনকি ছোটা জোছনায় নদীর জল যখন রূপোর পাতার মতন ঝকঝক করছে, কলকল একটা শব্দ উঠে বাতাসে মিল খেয়ে গেছে, ঝিঝি ডাকছে, জোনাকী উড়ছে, কেমন এক আশ্চর্য গন্ধ, চর আর বুনো লতাপাতা ফুটফুটে আলোয় ঘুমিয়ে পড়ে স্বপ্নের ঘোরে ফিস ফিস করে উঠেছে, বিশ্ব চরাচর শান্ত- স্তব্ধ ও সমাহিত।’

আমি সুধাময় গল্পের গদ্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল জায়গা থেকে উদাহরণ তুলে দিলাম। তাঁর গল্পের গদ্যের এই মনোটোনাস ভঙ্গি; যা আমাদের মতো অজ¯্র মুগ্ধ পাঠকদের বারবার ভাবায়। একটি সফল কবিতার মতন তার গল্পও গুণমুগ্ধ পাঠকদের বারংবার পাঠ পক্রিয়ার মধ্যে রাখতে বাধ্য করে। কখনো সংক্ষিপ্তভাবে ভাষায় কমা, ড্যাস- প্রয়োজনে আবার লম্বা বাক্যও ব্যবহার করেছেন। যদিও বিমল কর তাঁর ভাষাকে বুদ্ধদেব বসু ও সুবোধ ঘোষের পাঞ্চ বলেছেন, সত্যের খাতিরে স্বীকার করা ভালো তাদের তুলনায় বিমল করের গদ্য অনেক বেশি পরিণত সাবলীল ও সংযত, প্রতীক উপমা বিন্যাসের মাধ্যমে তার গদ্যকে আবার করে তুলেন স্বাতন্ত্র্যময়। ক্ষেত্রবিশেষে লাবণ্যময়; যা আমাদের কথাসাহিত্যে আগে ছিল না। বলা বাহুল্য এটা উপার্জিত হয়েছে বিমল করের অবিরাম ও অবিশ্রাম স্বাতন্ত্রিক অজ্ঞিতার অন্য নয়নের মাধ্যমে। উজ্জ্বল মজুমদার সত্যই লিখেছেনÑ ‘তবে বাস্তব ও অবাস্তবের বা অনুভবের মিশ্রণ বেশি আছে বিমল করের গদ্যের খুব বৈচিত্র্য আরও ব্যাপক।’

বলা এই মন্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায়। সুধাময় গল্প পড়লে তাতে কোন সন্দেহ নেই।