১৯ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মরমে ধাক্কা দেয়া কবিতা

নকশিকাঁথার বুনন যেন সৌন্দর্যবোধের সুঁইয়ে, প্রতিটা শব্দই ব্যঞ্জনাময়; আত্মার মরমে ধাক্কা দেয়া শুরু করে। শীতজরায় শুকিয়ে যাওয়া মাঠের পর মাঠে হঠাৎ বৃষ্টির জল নয়ত বসন্তে হঠাৎ জোয়ারের পানিতে ছলকে ওঠে অদ্বৈত মারুতের প্রতিটা কবিতার শব্দরাজি। ভাষার অভূতপূর্ব সারল্যতা অথচ সুগভীর স্নায়ুবিক চাপ টানাগদ্যে ফেরি করে পাঠককে পৌঁছে দেয় তৃপ্ততার কূলে;

সমাজ ও মানবিক টানাপোড়েন খুব সুচারুরূপে বর্ণিত হয় কবিতায়, পাঠকরা ভাবতেই পারেন তাদের চোখের সম্মুখে এসব ঘটে যাচ্ছে বিলকুল; এই যে, পাঠককে বুঝিয়ে নিতে পারা এটাই অদ্বৈত মারুতের কবিতার শক্তি।

এমন সৌন্দর্যচেতনা উৎকর্ষ কারুকার্যে গদ্যময়তার অতলে গীতিময়ী কবিতার সমাহার অদ্বৈত মারুতের ‘স্বর ভাঙার গান’ কবিতার বইটি। এ গীতিময়তা পাঠককে সহজে ধাবিত করে পীড়ার মর্মমূলে, কখনও স্বপ্নের ফুলের বাগিচায় সুবাসিত হয় ভাবিত ঘোর;

‘স্বর ভাঙার গান’ বইটির মাধ্যমে নিজেকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়েছেন কবিতার রাজ্যে। সে রাজ্যে অদ্বৈত মারুত চিত্রকল্পের দক্ষ কবিতাকথক। মাটিসংলগ্ন উপমায় কবিতাকে করে তুলেন জীবন্ত মানব-মানবীর হৃদয়ঘেঁষা; দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি শিল্পিত হয়ে ওঠে কবিতার পর কবিতায়। তখন অদ্বৈত মারুতকে আমাদের কবি বলে বলে কোরাস চলে; যাঁরা গৃহের মায়াজালে অন্তত সংসার জীবন সাজিয়ে রেখেছেন, এখনও সংসারধর্মে বিশ্বাস রাখেন। মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন এমনকি প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্ককে এখনও শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় আঁকড়ে আছেন। আমি বলি, এ শ্রেণীরা পৃথিবীকে আজও বাসযোগ্য করে রেখেছে, সেখানে অদ্বৈত মারুত নিঃসন্দেহে পূজনীয় ও বরনীয়; এখানে অদ্বৈত মারুতের কবিতা লেখার সার্থকতা। গ্রামীণ জীবনের তাড়িত নিসর্গ-আরাধনায়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সঙ্কটে কেবল মানুষের মনে সত্য আর সুন্দরের লালিত বোধ জাগানোর জন্য স্বরকে বিশেষিত করে নতুন জয়গানে লেখা ‘স্বর ভাঙার গান’...

এ বইটি থেকে কিছু পঙ্ক্তি আওড়ালে হয়ত ধরে নিতে পারবেন, অদ্বৈত মারুতের কবিতা লেখার মাহাত্মকথা -

ক. বিষাদ বুকে নিয়ে গলে পড়ছে দুধ-কুয়াশা। অন্ধ তীরন্দাজ যেন;/ মনজুড়ে শুধুই খুনী হওয়ার বাসনা।

- উৎকণ্ঠা; ১০ পৃ.)

খ. জন্মসূত্র না জেনেই লাল পিঁপড়ার নিমন্ত্রণপত্রে দেখেছিলাম ময়ূর পাখনার / আঁচড়

- বড্ড লাগে ; ১৫ পৃ.)

গ. বন্যা উপদ্রুত অঞ্চল পরিদর্শনে

চিন্তাদেবী রায়,

আপনার সুডৌল স্তন দেখে ভুলে গিয়েছিলাম

অভুক্ত থাকা সাতটি দিন কীভাবে কেটে গেল।

- সমীপে চিন্তাদেবী রায় ; ৩০ পৃ.)

ঘ.

ভারী নিতম্বে বিজ্ঞাপিত হতে গিয়ে একবারও ভাবলে না তুমিও রসপণ্য;/ কোটি চোখে টুকরো টুকরো হয়ে অবলীলায় চলে যাচ্ছ লালসার প্লেটে!

- বিল বোর্ডের সুহাসিনী; ২৯ পৃ.)

ঙ.

গ্লাস ভাঙা টুকরো কাচের মতোই এই যে প্যান্টের ভাঁজে গেঁথে দিলে/ সুষমা রোদ, তা পকেটে নিয়েই আমি হেঁটে যাব অফিসপাড়া। ঢুকে/ যাব কর্পোরেট ঘরে!/

যে যা- ই ভাবুক, মনটা ফুরফুরে থাকলে মোটেও বাঁকা কথা তিতা/ লাগে না আর!

-কর্পোরেট ;২৭ পৃ.)

০২.

এখনকার কবিতায় কবিরা কবিতাকে সরাসরি বলতে চায় না। সরাসরি ভালবাসি না বলে, আকারে-ইঙ্গিতে অর্থাৎ উপমায় রূপকে বুঝিয়ে দেয় ভালবাসার সূক্ষ্ম অনুভূতিও। আমরা সেটাকে সুয়ারিয়ালিজম বা পরাবাস্তব যাই বলি, এখনকার কবিতা লেখার অন্যতম মাধ্যম এটা। হয়ত এটার মাধ্যমে অন্য রকম রহস্যঘেরা সৌন্দর্যের উদ্যান তৈরি হয়। এরপরে এ উদ্যানে যে যত উপস্থাপনার ঢঙে, শব্দের ব্যবহারে ও নয়া স্বরে কথা বলতে বলতে পারে, পাঠকের কাছে তত গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। হয়ত কবিরা পাঠকের কথা চিন্তা করে কবিতা লেখে না। মনের ভেতরে হরদম খচখচানিতে কিছু একটা লিখে আর সেটাই পাঠকরা কবিতা বলে তকমা দিয়ে দেয়। কবিরা মূলত ভালবাসা চাই, কবিরা চায় তাঁদের কেউ বুঝুক। কখনও সমাজ, রাষ্ট্রের বা ব্যক্তিমনের বিকলঙ্গতা কবিমনে কষ্ট দেয়, তখন লিখে-

অতি বর্ষণে প্রবল বন্যা হওয়া ভাল। পলিতে জন্ম নেয়া ফসল/ বেশি পুষ্ট হয়।

-বন্যা হওয়া ভাল; ২৩ পৃ.)

এ বন্যা ভালবাসা জাগায়। বর্তমানকে নিয়ে এমনভাবেই বলেন ও ভাবেন অদ্বৈত মারুত। ইতিহাস-ঐতিহ্যের রসায়নে ঘাঁটাঘাঁটি কম হলেও স্মার্ট শব্দে সহজাত বোধে কিছু কবিতায় অতীতের বিহাগ সুর; গহীনে ডুব দিতে বাধ্য করে পাঠককে। অন্ত্যমিলের দ্যোতনাময় কয়েকটা কবিতা পাঠককে দিবে তৃপ্তিকর কথন। হারানো বেদনার্তে অদ্বৈত মারুত বলে ওঠেন-

পরিযায়ী পাখি এলে বলবেন, তিনি যেন বেদনার একটি নাম বলে দেন!

-পরিযায়ী পাখি এলে; ৩৫ পৃ.)

বেদনার নাম জিজ্ঞাসা আদতে এ জগতে সকল কবির জিজ্ঞাসা। হয়ত জীবদ্দশায় অদ্বৈত মারুতের এ জিজ্ঞাসায় উত্তর নাও পেতে পারেন। তবে কবিতার মাঝে এ জিজ্ঞাসা অন্তত সৌন্দর্যবোধসম্পন্ন সকল পাঠকের কাছে পৌঁছুক এ কামনা আমার।

মাহমুদ নোমান

নির্বাচিত সংবাদ